Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:১২ পূর্বাহ্ণ

কনটেম্পোরারি আর্ট: ধারণা, দর্শন, প্রকাশভঙ্গি ও সমকালীন সমাজ

শিল্পকে আমরা সাধারণত দেয়ালে ঝোলানো ছবি বা বেদির ওপর দাঁড়ানো ভাস্কর্য হিসেবে চিনি। কিন্তু একটি গ্যালারির মেঝেতে সাজানো ইট, অন্ধকার ঘরে চলতে থাকা ভিডিও, কিংবা নীরবে বসে থাকা একজন মানুষও আজ শিল্পকর্ম হয়ে উঠতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এটা কি আদৌ শিল্প? কনটেম্পোরারি আর্ট এই প্রশ্নটিকেই তার কেন্দ্রীয় অবস্থানে রেখেছে। এই শিল্প আমাদের সুন্দর দেখার অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে, ভাবতে শেখায়, কখনো অস্বস্তিতে ফেলে। সমকালের রাজনীতি, পরিবেশ, যুদ্ধ, পরিচয় ও প্রযুক্তি এখানে শিল্পের উপাদান হয়ে ওঠে। এই প্রবন্ধে কনটেম্পোরারি আর্টের স্বরূপ, দর্শন, মাধ্যম ও সামাজিক ভূমিকা এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

"কনটেম্পোরারি" শব্দের অর্থ সমকালীন। শিল্প-ইতিহাসে এটি বোঝায় মোটামুটি ১৯৬০-এর দশকের শেষ বা ১৯৭০-এর দশক থেকে আজ পর্যন্ত বিস্তৃত শিল্পচর্চাকে। তবে এর কোনো সর্বসম্মত সীমারেখা নেই। শিল্পসমালোচক টেরি স্মিথ তাঁর What Is Contemporary Art? (২০০৯) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সমকালীনতা কোনো একক শৈলী নয়। এটি বহু ধারা, বহু ভূগোল ও বহু মতের সহাবস্থানের একটি অবস্থা। এখানে কোনো একটি "ইজম" প্রভাবশালী নয়, আর সেটিই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক শিল্প থেকে পার্থক্য

আধুনিক শিল্প (Modern Art) মোটামুটি ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত। ইমপ্রেশনিজম, কিউবিজম, এক্সপ্রেশনিজম ও সুররিয়ালিজম এর উল্লেখযোগ্য ধারা। আধুনিক শিল্পীরা প্রচলিত একাডেমিক রীতি ভেঙে নতুন রূপ খুঁজেছেন, কিন্তু রং, রেখা, আকার ও গঠনের প্রতি তাঁদের মনোযোগ ছিল বড়।

এই ভাঙনের সবচেয়ে সাহসী পূর্বসূরি মার্সেল দুশাঁ। ১৯১৭ সালে তিনি একটি সাধারণ মূত্রপাত্র "R. Mutt" নামে স্বাক্ষর করে Fountain শিরোনামে প্রদর্শনীতে পাঠান। এতে প্রথম প্রশ্ন ওঠে, শিল্পকর্ম কি হাতের দক্ষতা, নাকি শিল্পীর সিদ্ধান্ত ও ধারণা? পরবর্তীকালের কনটেম্পোরারি আর্টের অনেক চিন্তার বীজ এখানেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পের কেন্দ্র ইউরোপ থেকে নিউ ইয়র্কে সরে আসে। ষাটের দশকে পপ আর্ট, মিনিমালিজম, ফ্লাক্সাস ও কনসেপচুয়াল আর্ট ছবি ও ভাস্কর্যের চিরাচরিত সীমা ভেঙে দেয়। একই সময়ে পৃথিবীজুড়ে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন, নারীবাদ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ শিল্পীদের নতুন বিষয় ও নতুন ভাষার দিকে ঠেলে দেয়।

আধুনিক ও সমকালীন শিল্পের পার্থক্য সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়:

• কেন্দ্রবিন্দু: আধুনিক শিল্পে প্রধান বিষয় রূপ ও নিরীক্ষা; সমকালীন শিল্পে প্রধান বিষয় ধারণা ও প্রেক্ষাপট।
• মাধ্যম: আধুনিক শিল্পে ক্যানভাস ও ভাস্কর্য প্রধান; সমকালীন শিল্পে যেকোনো মাধ্যম, যেমন শরীর, শব্দ, ভিডিও, কোড বা পরিবেশ।
• দর্শক: আধুনিক শিল্পে দর্শক মূলত নিরীক্ষক; সমকালীন শিল্পে অনেক সময় দর্শকই কর্মের অংশ।
• দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক শিল্পে ইউরোপ ও আমেরিকা-কেন্দ্রিক ধারা প্রবল; সমকালীন শিল্পে বৈশ্বিক ও বহুকেন্দ্রিক ধারা।

দর্শন ও নান্দনিকতা

শিল্পদার্শনিক আর্থার ড্যান্টো The Artworld (১৯৬৪) প্রবন্ধে বলেন, কোনো বস্তুকে শিল্প করে তোলে একটি তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ। পরে After the End of Art (১৯৯৭) গ্রন্থে তিনি যুক্তি দেন, শিল্পের একক ও অনিবার্য ইতিহাসের ধারা শেষ হয়েছে। এখন শিল্পী যেকোনো পথে চলতে স্বাধীন। অর্থাৎ সমকালীন শিল্পের নান্দনিকতা কেবল সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে অসুন্দর, অস্বস্তিকর, ক্ষণস্থায়ী বা অদৃশ্যও অর্থবহ হতে পারে।

এই শিল্পে অর্থ তৈরি হয় কয়েকটি স্তরে। প্রথমত ধারণা, অর্থাৎ শিল্পী কী ভাবছেন। দ্বিতীয়ত উপকরণ: বরফ, চুল, কাঁটাতার বা সূর্যমুখীর বীজ প্রত্যেকেরই নিজস্ব সামাজিক ও প্রতীকী ভার আছে। তৃতীয়ত স্থান, কারণ একই কাজ জাদুঘরে এক অর্থ বহন করে, রাস্তায় আরেক। চতুর্থত দর্শকের অংশগ্রহণ, যেখানে দর্শকের উপস্থিতি, স্পর্শ বা সিদ্ধান্ত কর্মটিকে সম্পূর্ণ করে। আর সবশেষে সামাজিক প্রেক্ষাপট, যা কর্মটিকে তার সময়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
প্রকাশভঙ্গি ও মাধ্যম
কনসেপচুয়াল আর্ট। এখানে ধারণাই মুখ্য, বস্তুরূপ গৌণ। সল লিউইট ১৯৬৭ সালে লেখেন, ধারণাই এই শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, আর বাস্তবায়ন একটি যান্ত্রিক পর্যায় মাত্র। জোসেফ কসুথের One and Three Chairs (১৯৬৫)-এ একটি আসল চেয়ার, তার আলোকচিত্র এবং "চেয়ার"-এর অভিধানিক সংজ্ঞা পাশাপাশি রাখা হয়েছে। এতে প্রশ্ন ওঠে, "চেয়ার" বলতে আমরা আসলে কোনটিকে বুঝি?

ইনস্টলেশন। ইনস্টলেশনে শিল্পী একটি পুরো স্থানকে শিল্পে রূপান্তর করেন। ইয়ায়োই কুসামার Infinity Mirror Rooms দর্শককে আয়না ও আলোর অসীমতায় ডুবিয়ে দেয়। ওলাফুর এলিয়াসনের The Weather Project (টেট মডার্ন, ২০০৩) একটি কৃত্রিম সূর্য ও কুয়াশায় বিশাল টারবাইন হলকে বদলে দেয়। আই ওয়েইওয়েই-এর Sunflower Seeds (২০১০)-এ লক্ষ লক্ষ হাতে-আঁকা চীনামাটির বীজ গণউৎপাদন, ব্যক্তি ও সমষ্টির প্রশ্ন তোলে।

পারফরম্যান্স আর্ট। এখানে শিল্পীর শরীরই মাধ্যম। ইয়োকো ওনোর Cut Piece (১৯৬৪)-এ দর্শকেরা শিল্পীর পোশাক কেটে নিয়েছেন, যা সহিংসতা, নারীদেহ ও সম্মতির প্রশ্ন সামনে আনে। মেরিনা আব্রামোভিচের Rhythm 0 (১৯৭৪)-এ তিনি নিজেকে দর্শকদের হাতে ছেড়ে দেন। এই কাজ দেখায়, অনুমতি পেলে সাধারণ মানুষ কতদূর যেতে পারে। তাঁর The Artist Is Present (মোমা, ২০১০)-এ নীরব মুখোমুখি বসে থাকাই ছিল পুরো কাজ।

ভিডিও আর্ট। নাম জুন পাইক-কে ভিডিও আর্টের পথিকৃৎ ধরা হয়। তিনি টেলিভিশনকে ভোগের যন্ত্র থেকে শিল্পের মাধ্যমে রূপান্তরিত করেন। বিল ভায়োলার ভিডিও কাজ ধীরগতির দৃশ্যের মধ্য দিয়ে জন্ম, মৃত্যু ও অধ্যাত্মের প্রশ্ন তোলে।

ডিজিটাল আর্ট। কম্পিউটার, অ্যালগরিদম, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শিল্পীর হাতিয়ার। রেফিক আনাদোলের ডেটা-ভিত্তিক দৃশ্যচিত্র তার উদাহরণ। ২০২১ সালে ডিজিটাল শিল্পী বিপলের একটি এনএফটি-ভিত্তিক কাজ ক্রিস্টিজে প্রায় ৬৯ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়, যা ডিজিটাল শিল্পের বাজার ও মালিকানা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করে।

মিক্সড মিডিয়া। চিত্র, কোলাজ, বস্তু, শব্দ ও আলো একসঙ্গে ব্যবহার করে একাধিক স্তরের অর্থ গড়ে তোলা সমকালীন শিল্পীর স্বাভাবিক চর্চা। এতে কোনো একক মাধ্যমের সীমাবদ্ধতা থাকে না।

সমকালীন সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক

সমকালীন শিল্প সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং সে প্রায়ই সমাজের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো তোলে।
• রাজনীতি ও প্রতিবাদ: গেরিলা গার্লস ১৯৮৫ সাল থেকে মুখোশ পরে পোস্টার-প্রচারণার মাধ্যমে শিল্পজগতে নারীর অনুপস্থিতি ও বৈষম্য উন্মোচন করেছে।
• পরিবেশ: ওলাফুর এলিয়াসন ২০১৪ সালে কোপেনহেগেনে ও ২০১৫ সালে প্যারিসে (জলবায়ু সম্মেলনের সময়) গ্রিনল্যান্ডের হিমবাহের বরফখণ্ড এনে Ice Watch সাজিয়েছিলেন। শহরের মানুষ চোখের সামনে বরফ গলতে দেখেছে।
• পরিচয় ও বর্ণবৈষম্য: কারা ওয়াকার কাগজ-কাটা সিলুয়েটের মাধ্যমে দাসত্ব ও বর্ণবাদের ইতিহাস মুখোমুখি করেছেন।
• যুদ্ধ ও মানবিক সংকট: যুদ্ধের শিল্প-প্রতিক্রিয়ার সবচেয়ে পরিচিত আধুনিক উদাহরণ পিকাসোর Guernica (১৯৩৭)। সমকালীন শিল্পীরা এই ঐতিহ্য এগিয়ে নিয়েছেন। দোরিস সালসেদোর Shibboleth (টেট মডার্ন, ২০০৭) গ্যালারির মেঝে চিরে একটি দীর্ঘ ফাটল তৈরি করে বর্জন ও বিভাজনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
• পুঁজিবাদ ও শিল্পবাজার: ড্যামিয়েন হার্স্টের ফর্মালিনে রাখা হাঙর (১৯৯১) কিংবা মরিৎসিও কাত্তেলানের দেয়ালে টেপ-সাঁটা কলা Comedian (২০১৯) প্রশ্ন তোলে, শিল্পের মূল্য কে নির্ধারণ করে? বিশ্লেষণে এসব কাজ আবার শিল্পবাজারের সমালোচনা ও তার অংশ হয়ে ওঠার দ্বন্দ্বও প্রকাশ করে।
• প্রযুক্তি: নজরদারি, ডেটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভার্চুয়াল জগৎ নিয়ে সমকালীন শিল্পীরা নতুন নৈতিক প্রশ্ন তুলছেন।

সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

কনটেম্পোরারি আর্টের সম্ভাবনা বিশাল। সে শিল্পের পরিসর বিস্তৃত করেছে, প্রান্তিক কণ্ঠকে মঞ্চ দিয়েছে, এবং রাজনীতি, পরিবেশ ও প্রযুক্তির মতো জরুরি বিষয়কে সংবেদনশীল ভাষায় সামনে এনেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল জগৎ ও বিশ্বজোড়া সংযোগ ভবিষ্যতে শিল্পের মাধ্যম ও দর্শকের সম্পর্ক আরও বদলে দেবে।

সাগর কর্মকার
সহকারী শিক্ষক
বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল, হবিগঞ্জ। 

মন্তব্য করুন

ব্লগ