সহকারী শিক্ষক
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৪ অপরাহ্ণ
কেন শূন্য দিয়ে ভাগ করলে পুরো লজিক মুহূর্তেই ধসে পড়ে?
কেন শূন্য দিয়ে ভাগ করলে পুরো লজিক মুহূর্তেই ধসে পড়ে?
গণিত হলো এই মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে একমাত্র ভাষা। গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ - এই সাধারণ নিয়মগুলোর ওপর ভর করেই মহাকাশযান থেকে শুরু করে আধুনিক সভ্যতার সমস্ত প্রযুক্তিগত ইমারত দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই নিখুঁত মৌলিক কাঠামোর ভেতরে এমন একটি ছোট্ট খাদ রয়েছে, যার কারনে পুরো গাণিতিক লজিক মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে। আর সেই খাদ হলো 'কোন কিছুকে শূন্য দিয়ে ভাগ করা'।
ভাগের মূল অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণকে কতগুলো সমান অংশে ভাগ বা বিভাজন করা বা কোনো একটি সংখ্যা থেকে অন্য একটি সংখ্যাকে বারবার বিয়োগ করে শূন্যে পৌঁছানো। যেমন বারো সংখ্যাটি থেকে চার কতবার বিয়োগ করা যায়। উত্তর হলো তিনবার। কিন্তু এখন যদি প্রশ্ন করা হয় যে বারো সংখ্যাটি থেকে শূন্য কতবার বিয়োগ করলে আমরা শেষ পর্যন্ত কিছুই আর অবশিষ্ট পাব না। হিসাব করলে দেখা যাবে, শূন্য যতবারই বিয়োগ করা হোক না কেন, বারো কখনোই কমবে না। বিয়োগের এই প্রক্রিয়া অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকবে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট উত্তরে পৌঁছানো যাওয়া যাবে না।
গাণিতিকভাবে বিষয়টি আরও অনেক বেশি ভয়ংকর। ধরা যাক, বারো সংখ্যাটিকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে ফলাফল হিসেবে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া গেল। ভাগের চিরন্তন বিপরীত নিয়ম অনুযায়ী, সেই প্রাপ্ত ফলাফলকে আবার শূন্য দিয়ে গুণ করলে সেই সংখ্যা অর্থাৎ সেই বারো ফিরে আসার কথা। কিন্তু আমরা সবাই জানি যে, পৃথিবীর যেকোনো সংখ্যার সাথে শূন্য গুণ করলে ফল সবসময় শূন্যই হয়। ফলে ফলাফল হিসেবে পাওয়া মানটিকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে কখনোই আবার বারো ফিরে আসবে না। এই মৌলিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটার অর্থ হলো গণিতের মূল ভিত্তি বা লজিকটাই ভুল প্রমাণ হয়ে যাওয়া। শূন্য ছাড়া কোন সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করার এই অসম্ভব রূপকে গণিতের ভাষায় বলা হয় অসংজ্ঞায়িত।
তবে শূন্য দিয়ে শূন্যকে ভাগ করার গল্পটি আবার একটু ভিন্ন। সেখানে যেকোনো সংখ্যাকেই উত্তর হিসেবে বসানো সম্ভব। কারণ যেকোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে শূন্যই পাওয়া যায়। অর্থাৎ এর কোনো একক বা সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই, বরং অগণিত উত্তর হতে পারে। গণিতের ভাষায় এই রূপটিকে বলা হয় অনির্দিষ্ট বা অনির্ণেয়। সুতরাং শূন্য দিয়ে ভাগ করার এই দুটি ভিন্ন রূপই গণিতের সুনির্দিষ্টতাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেয়।
যদি শূন্য দিয়ে ভাগ করাকে কোনোভাবে বৈধ ধরে নেওয়া হয়, তবে গণিতের সমস্ত সূত্র ও সমীকরণ ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। যেমন খুব সহজে গাণিতিক মারপ্যাঁচে প্রমাণ করে দেওয়া সম্ভব যে, ১=২। দুটি সমান সংখ্যা ধরে নিয়ে তাদের বীজগণিতীয় সমীকরণ সমাধান করার সময় যদি ভুলবশত শূন্য দিয়ে ভাগ করার ধাপটি ভেতরে ঢুকে পড়ে, তবে দেখা যাবে পৃথিবীর যেকোনো সংখ্যা অন্য যেকোনো সংখ্যার সমান হয়ে গেছে। এর মানে দাঁড়ায় দুই আর দুই যোগ করলে পাঁচ হয় কিংবা একটি বিশালাকার বস্তু আর একটি বিন্দুর মান তখন সমান হয়ে যায়। লজিক যখন এভাবে ভেঙে পড়ে, তখন সত্য ও মিথ্যের গাণিতিক পার্থক্য বলে আর কিছু থাকে না।
শূন্য বা শূন্যের হিসাব-নিকাশ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক দারুণ বিপ্লব এনেছিল। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে সপ্তম শতকে ভারতের মহান গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্রহ্মগুপ্ত শূন্যকে প্রথম স্বাধীন সংখ্যা হিসেবে জোরালোভাবে স্বীকৃতি দেন এবং এর হিসাব-নিকাশের নিয়মগুলো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত" তে লিপিবদ্ধ করেন। তিনি শূন্যের যোগ, বিয়োগ ও গুণের নিয়ম নিখুঁতভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এবং শূন্য দিয়ে ভাগের প্রক্রিয়াটি প্রথম গাণিতিকভাবে আলোচনার রূপ দেন। তবে পরবর্তীতে আধুনিক গণিতবিদরা রিং ও ফিল্ড থিওরির মতো কঠোর কাঠামোর মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, শূন্যের কোনো গুণাত্মক বিপরীত বা ইনভার্স নেই। ফলে গণিতের পুরো যুক্তি কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে শূন্য দিয়ে ভাগকে কঠোরভাবে গাণিতিক নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে।
গণিতবিদরা শূন্য দিয়ে ভাগের এই রহস্যময় নিয়মটিকে চিরকালের জন্য আটকে দিয়েছেন একে অসংজ্ঞায়িত ও অনির্দিষ্ট ঘোষণা করে। কারণ তারা জানতেন যে, এই একটিমাত্র নিয়ম শিথিল করা মানে মানবচিন্তার সমস্ত সত্য ও লজিকের মূলে কুড়াল মারা। তাই শূন্য দিয়ে ভাগ করার চেষ্টা করা মানে বাস্তবতার সাথে যুক্তির সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করে দেওয়া।
৪
৭ মন্তব্য