সহকারী শিক্ষক
০৭ নভেম্বর, ২০২৪ ০৩:১১ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
কাচিরগাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবার প্রিয় শিক্ষক মো: লিয়াকত আলী স্যার এর অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের বক্তব্য
বিসমিল্লাহি রহমানের রাহিম,
আসসালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়ারাকাতুহু।
আজকের এই বিদায় অনুষ্ঠানের মঞ্চে উপস্থিত আছেন সম্মানিত প্রধান অতিথি, মাননীয় সভাপতি ও আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং আমার শ্রদ্ধেয় সকল শিক্ষকবৃন্দ, কমিটির সদস্যবৃন্দ, অভিভাবকবৃন্দ এবং আমারসামনে উপবিষ্ট অত্র প্রতিষ্ঠানের সকল ছাত্র ছাত্রী ভাই ও বোনদেরকে আমার পক্ষ হতে সালাম এবং আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
আপনারা সবাই জানেন আজকের এই বিদায় অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের শিক্ষক গনের মধ্য থেকে একজন শিক্ষক অবসর নিতে যাচ্ছেন। তিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জনাব মোঃ লিয়াকত আলী সাহেব ।
অত্যান্ত দুঃখ ওভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলতে হচ্ছে আজ আমাদের প্রিয় শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠান। যদিও আমরা মনে করি এটা একটা বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কারণ মন থেকে চিরতরে বিদায় দেওয়া সম্ভব হবে না।
তাই
কবির চরণে বলতে হয়,
যেতে নাহি দিব হায়,
তবু যেতে দিতে হয়,
তবু চলে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই প্রতিষ্ঠানে পড়েছি এবং এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শিক্ষক শিক্ষিকাবৃন্দ আমাদেরকে বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পড়িয়েছেন তা আমরা কখনোই ভুলবো না। আপনি সবসময় আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন। এজন্য আমরা আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আপনি আমাদের জন্য দোয়া করবেন যেন ভবিষ্যত শিক্ষাজীবনে আমরা আরো উন্নতি করে দেশ ও জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে পারি। আমাদের কোনো আচরণের যদি আপনি কোনো কষ্ট পেয়ে থাকেন বা ছোট কিংবা বড় কোনো ভুল করে থাকি তাহলে আমাদেরকে ক্ষমা করবেন। সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকেআমি বিনীতভাবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
আপনার এই দীর্ঘ শিক্ষক জীবনের যে উজ্জ্বল ছোঁয়া দিয়ে আমাদের সকলকে আলোকিত করেছেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। আপনার জ্ঞানের আলোয় আমরা যেমন আলোকিত হয়েছি, ঠিক তেমন ভাবে সেই জ্ঞানের আলো হারানোর বেদনায় আজ আমরা সবাই শোকাহত হয়ে যাচ্ছি। আপনাকে আমাদের বিদায় দিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে আমার ভারাক্রান্ত মন চাচ্ছে আপনি আরো দীর্ঘদিন আমাদের শিক্ষা প্রদান করুন। তবে এর সাথে আমাদের সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
হে আমাদের প্রিয় শিক্ষক,
আপনি শুধু আমাদের শিক্ষকের ছিলেন না। আপনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক ও বন্ধুর মতো। আমাদের যে কোন সমস্যার সমাধান আপনার কাছে পেয়ে যেতাম। আপনি সবসময় আমাদের পড়াশোনার বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করতেন। বিশেষ করে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে আমাদের পরীক্ষায় কিভাবে ভালো ফলাফল অর্জন করা যায় তা নিয়ে অনেক উপদেশ দিয়েছেন। যে উপদেশগুলো আমরা কেউ সঠিকভাবে গ্রহণ করেছি আবার কেউ গ্রহণ করিনি। যারা আপনার উপদেশ সঠিকভাবে মেনেছে তারাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করতে পেরেছি।
এছাড়াও আপনার উদারতা ও ক্লান্তি হীন জ্ঞানচর্চা আমাদের অনেক উৎসাহিত করে তুলেছে। আপনি সব সময় সত্যবাদী ও সত্যের পক্ষে কথা বলতেন। আমাদের সব সময় সত্য কাজে উৎসাহিত করতেন। যা আমাদের সকল শিক্ষার্থীর মনে এখনো গেঁথে আছে ও ভবিষ্যতে গেঁথে থাকবে। একজন শিক্ষকের মধ্যে যে এত গুণাবলী থাকতে পারে,আপনাকে না দেখে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। কারণ আপনি ছিলেন বিশেষ কয়েকটি গুনে গুণান্বিত। যা আমাদের শিক্ষক মহলে খুবই কম দেখা যায়।
আপনি ছিলেন আমাদের আদর্শের শিরোমনি। যাকে দেখে শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে আদর্শবান হওয় যায়। তার প্রকাণ্ড প্রমাণ হলেন আপনি। যার মাধ্যমে আমি সহ আমার সহপাঠীরা আদর্শবান হতে পেরেছে। শুধু আমি বা আমার সহপাঠী নয়, বিগত প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও আপনার আদর্শকে ধারণ করে,এখন পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
সুন্দর
বিদায় হলো:
ক্ষতি না করে বিদায় নেয়া,
সুন্দর ক্ষমা হলো;
বকা না দিয়ে ক্ষমা করা,
সুন্দর ধৈর্য হলো:
অভিযোগ না রেখে ধৈর্য্য ধারণ করা।
আপনার গুনে গুণান্বিত না হয়ে কোন উপায় নেই। কারণ আপনি আমাদের যে বাস্তব শিক্ষা দিয়েছেন তা কখনো ভুলবার মতো না। আপনার থেকে আমরা যে শিক্ষা অর্জন করেছি তা দিয়ে ইনশাল্লাহ এ জীবন পার করে দিতে পারবো। একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি অবশ্যই ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করা দায়িত্ব। একসময় আমরা এই শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আপনার অবদান ছিল এখানে অতুলনীয়।
আমরা যখন ধর্মীয় শিক্ষা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে শুরু করি। তখন আপনি আমাদের ধর্মীয় শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে বলেন। তখন আপনি আমাদের জন্য বিদ্যালয়ের টিফিন টাইমে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে নিয়ে যেতেন। শুধু ছেলেদের জন্যই নয়, আপনি মেয়েদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক রুমে একটি নামাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যা থেকে একজন মুমিন মুসলমানের পরিচয় প্রকাশ পায়। আপনার এই অবদান শোধ করার মত ক্ষমতা বা অর্থ আমাদের কিছুই নেই। আশা করি,আপনার এই অবদান আমাদের প্রতিষ্ঠানে আজীবন থেকে যাবে।
আমাদের ছোট এই শিক্ষা জীবনে আপনার থেকে যে সকল শিক্ষা অর্জন করেছি তা দিয়ে ইনশাল্লাহ একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারব। শুধু যে আমরা আপনার সকল কাজের প্রশংসা করি তা নয়। আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন যে সকল ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে তারাও আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এছাড়াও আমাদের সকল সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ ও অভিভাবক গণ আপনাকে খুবই পছন্দ ও অনুসরণ করেন। বিশেষ করে আমাদের পুরো এলাকায় আপনি খুবই সম্মানী একজন ব্যক্তি। এর সবগুলো অবদান শুধু আপনার প্রতিভা ও সুন্দর আচার ব্যবহারের জন্য।
আপনার দায়িত্বশীলতার কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে আপনার বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকার কথা। আপনি দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু আপনি কখনো বিদ্যালয় অনুপস্থিত থাকেননি। আমাদেরর জীবনে আমরা আপনাকে কখনো বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতে দেখি নি।
অর্থাৎ এটা থেকে প্রমাণ হলো আপনি খুবই দায়িত্বশীল একজন শিক্ষক ছিলেন। আপনার এই গুণের কারণে আমরা অনেক শিক্ষার্থী মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, আমরাও কখনো অহেতুক কোন কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকবো না। যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ।
বিদায় প্রধানত দুই প্রকার চিরস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী। আপনি আমাদের মাঝ থেকে শুধু ক্ষণস্থায়ী বিদায় নিচ্ছেন। এই কারণে আমাদের সকলের আপনার কাছে অনেক কিছু চাওয়ার রয়েছে। বিশেষ করে আমি আপনার কাছে একটি জিনিস চাই। তা হল অবসরপ্রাপ্ত সময়ের পর,আপনি অবশ্যই আমাদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসবেন। আপনার যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন। মাসে একবার হলেও আমাদের বিদ্যালয়ে এসে আমাদের জ্ঞানকে আরো উজ্জীবিত করে তুলবেন। আশা করি, আমার এই অনুরোধ আপনি অবশ্যই রাখবেন।
সত্যিকার অর্থে আজকে শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার্থে এই বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আমরা বিষন্ন চিত্রে এবং অশ্রুসজল নয়নে আপনাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আপনার মত আদর্শবান ও প্রতিভাবান শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়ে আমরা নিজেকে ধন্য মনে করি। আপনার আদর্শ মনে লালন করে আমরা যেন আদর্শিত হতে পারি। দেশ ও সমাজকে সুষ্ঠুভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি,সেই দোয়া কামনা করছি। আমাদের এই শিক্ষাজীবনে আপনার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো স্মৃতিতে অম্লান ও অক্ষয় হয়ে থাকবে।
আমার সংক্ষিপ্ত আলোচনা আর বাড়াতে চাই না। আপনার সাথে আমরা অজস্র সময় কাটিয়েছি। আমাদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত আচরণের কারণে আপনি যদি কোন কষ্ট পেয়ে থাকেন। তাহলে আমাদেরকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে, নিজের সন্তান মনে করে আমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। সেই সাথে আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে, আমাদের ভবিষ্যত যেন উজ্জল ,সুখী ও সমৃদ্ধময় হয় তা কামনা করার জন্য দোয়া চাচ্ছি ।
আমাদের সকলের পক্ষ হতে আপনার জন্য ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সুস্থ সুন্দর জীবন এবং মহান আল্লাহ তাআলা আপনাকে যেন নেক হায়াত দান করেন সেই কামনা করছি।
যাই হোক, বিদায়ী মুহূর্তে আর বেশিকিছু বলতে চাই না। আপনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ওদীর্ঘায়ু কামনা করছি।
আসসালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।
জাজাকাল্লাহ খাইরান।
আমার বক্তব্যের মধ্যে যদি কোন ভুলত্রুটি হয়ে থাকে,অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আবারো বিদায়ী শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে জানাই শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।
এতক্ষণ আমার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ ।
৮
১৪ মন্তব্য