সহকারী শিক্ষক
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:০৩ অপরাহ্ণ
হেমন্তের পদ্মবিলে একদিন
হেমন্তের পদ্মবিলে একদিন
একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, কিছু প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য আর প্রকৃতির বুকে হারিয়ে যাওয়ার গল্প যেন নতুন করে রাঙিয়ে দেয়
হেমন্তের প্রথম ভাগে। হেমন্ত আমার ভীষণ প্রিয় ঋতু। কী যে ভালো লাগে এই ঋতুটাকে, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন! মনে হয়, প্রতিটি হেমন্তে আমি যেন নতুন করে জীবন ফিরে পাই। বাতাসে ধানের গন্ধ ভেসে আসে, মাঠে মাঠে পাকা ধানের সোনালি আভা, কৃষকের মুখে ফসল ঘরে তোলার আনন্দ। মনে হয়, এই তো ধান উঠবে, এই তো নবান্নের উৎসব শুরু হবে, আর কিছুদিন পরেই ঘরে ঘরে পিঠা পায়েসের ধুম পড়বে। গ্রামবাংলার প্রকৃতি তখন তার নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়। চারদিকে এক মায়াময় আবেশ, এক অনির্বচনীয় ভালো লাগা।
আর এই হেমন্তেই আমার বহুদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হলো—পদ্মবিল ভ্রমণ।
২০১৯ সাল থেকে পদ্মবিল দেখার ইচ্ছেটা মনের মধ্যে লালন করে আসছি। কত বছর পেরিয়ে গেল! সময়ের স্রোতে কত কিছু বদলে গেল, কত ইচ্ছা পূরণ হলো, কত ইচ্ছা আবার অপূর্ণই থেকে গেল। কিন্তু পদ্মবিল দেখার সেই ইচ্ছেটা মনের গভীরে ঠিকই বেঁচে ছিল। অবশেষে একদিন সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল। তিনজন যাত্রী আর একজন মাঝিকে সঙ্গী করে আমরা চেপে বসলাম একটি ডিঙিনৌকায়। আমাদের গন্তব্য পদ্মবিল।
এই ভ্রমণকে ঘিরে আনন্দটা শুধু পদ্মবিল দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রিয় মানুষের সঙ্গ, পরিচিত মুখের আন্তরিকতা আর নতুন করে কিছু স্মৃতি জমিয়ে রাখার আনন্দও ছিল এর সঙ্গে জড়িয়ে। ঝিনাইদহ থেকে এসেছিলেন টুটুল ভাই। দূর থেকে ছুটে আসার মধ্যেই তাঁর আন্তরিকতার পরিচয় মেলে। ভ্রমণে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের উপস্থিতি পুরো আয়োজনটাকে অন্য রকম করে তোলে। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটালে পথের ক্লান্তি কমে যায়, আনন্দ বেড় হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
আর ছিলেন বিপ্লব ভাই—যাঁর প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা রয়েছে। ভালো হাতের লেখা যে মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি সুন্দর প্রকাশ হতে পারে, বিপ্লব ভাই যেন তারই উদাহরণ। সুন্দর হস্তাক্ষর কেবল অক্ষরের সৌন্দর্য নয়; এর মধ্যে থাকে যত্ন, ধৈর্য, রুচি আর একধরনের নান্দনিক বোধ। প্রতিটি অক্ষরকে যত্ন করে সাজিয়ে তোলার মধ্যে যে মনোযোগের পরিচয় পাওয়া যায়, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ডিজিটাল সময়ে যখন কলমের ব্যবহার ক্রমেই কমে আসছে, তখন সুন্দর হাতের লেখার প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখা নিঃসন্দেহে বিশেষ গুণের পরিচয়। বিপ্লব ভাইয়ের এই গুণের প্রতি রইল আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁর মতো মানুষেরা আমাদের মনে করিয়ে দেন, সৌন্দর্য সব সময় বড় কোনো আয়োজনের মধ্যে থাকে না; কখনো কখনো কয়েকটি অক্ষরের মধ্যেও সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।
নৌকা যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল, তখন মনে হচ্ছিল, প্রতিদিনের চেনা পৃথিবীটাকে পেছনে ফেলে আমরা যেন অন্য কোনো জগতে প্রবেশ করছি। চারদিকে থইথই জল। কোথাও জল শান্ত, কোথাও হালকা ঢেউয়ের দোল। মাঝির বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বিলের নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছিল। বৈঠা যখন জলে ডুবছিল, তখন ছোট ছোট ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। সেই ঢেউ গিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছিল পদ্মপাতার গোড়া। আবার কোথাও পানির ওপর ভেসে থাকা পাতাগুলো নৌকার গায়ে এসে ঠেকছিল, যেন তারাও আমাদের এই ভ্রমণের সঙ্গী হতে চায়।
নৌকা যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল, তখন মনে হচ্ছিল, প্রতিদিনের চেনা পৃথিবীটাকে পেছনে ফেলে আমরা যেন অন্য কোনো জগতে প্রবেশ করছি। চারদিকে থইথই জল। কোথাও জল শান্ত, কোথাও হালকা ঢেউয়ের দোল। মাঝির বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বিলের নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছিল। বৈঠা যখন জলে ডুবছিল, তখন ছোট ছোট ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। সেই ঢেউ গিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছিল পদ্মপাতার গোড়ায়। আবার কোথাও পানির ওপর ভেসে থাকা পাতাগুলো নৌকার গায়ে এসে ঠেকছিল, যেন তারাও আমাদের এই ভ্রমণের সঙ্গী হতে চায়।
যতই সামনে এগোচ্ছিলাম, ততই পদ্মবিল তার রূপ মেলে ধরছিল। বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পদ্মপাতা। কোথাও সবুজ পাতার সমারোহ, কোথাও পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে পদ্মফুল। বাতাসে পাতাগুলো মৃদু দুলছে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজের হাতে সবুজের এক বিশাল চাদর বিছিয়ে রেখেছে জলের বুকে। তার ওপর ছড়িয়ে দিয়েছে সৌন্দর্যের ছোট ছোট উপহার।
কোথাও পদ্মফুল ফুটে আছে নিঃশব্দে, কোথাও কুঁড়ি হয়ে অপেক্ষা করছে প্রস্ফুটনের। কোনো কোনো ফুলের পাপড়িতে রোদের আলো এসে পড়েছে। সেই আলোয় ফুলগুলোকে আরও মায়াবী মনে হচ্ছিল। আবার কোথাও পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ফুল চোখে পড়তেই মন আনন্দে ভরে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, আহা! প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য এত দিন চোখের আড়ালে ছিল কীভাবে!
নৌকায় বসে চারদিকে আর ভাবছিলাম, জীবনে কত কিছু দেখার বাকি থেকে যায়! কত পরিচিত পথ পেরিয়ে যাই, অথচ পাশেই অপেক্ষা করে থাকে এমন সুন্দর ও নান্দনিক রূপ! দূর আকাশ পানে তাকিয়ে ছিলাম! আকাশের মাঝে রূপা ছিল! তাকে খুজে ফিরেই সন্ধ্যা এলো!
৪
৭ মন্তব্য