সিনিয়র শিক্ষক
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:১৭ অপরাহ্ণ
শিক্ষকের সম্মাণ সবার আগে
একটি ছোট ও মনোরম গ্রাম, নাম আনন্দপুর। সেই গ্রামের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক রফিক সাহেব। জীবনভর সততা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সাথে তিনি গ্রামের শত শত সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। শিক্ষকতাকে তিনি কখনো কেবল জীবিকা মনে করেননি, মনে করেছেন জীবন গড়ার এক পবিত্র ব্রত।
বয়সের ভারে রফিক সাহেবের শরীর এখন অনেকটাই নুয়ে পড়েছে, চুলে ধরেছে শুভ্রতা। অবসর নেওয়ার পর সংসারের অভাব-অনটন তাঁকে আঁকড়ে ধরেছিল। তাঁর বড় ছেলেটি ভালো কোনো চাকরি জোগাড় করতে পারেনি, আর ছোট মেয়েটির সামনের মাসে বিয়ে। মেয়ের বিয়ের আয়োজন নিয়ে রফিক সাহেব খুবই দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
একদিন সকালে রফিক সাহেব গ্রামের হাটে যাচ্ছিলেন সামান্য কিছু কেনাকাটা করতে। ঠিক সেই সময় রাস্তা দিয়ে কালো রঙের চকচকে একটি বিলাসবহুল গাড়ি ধীরগতিতে পার হচ্ছিল। গাড়িটি হঠাৎ রফিক সাহেবের সামনে এসে থেমে গেল।
গাড়ির দরজা খুলে দ্রুত নেমে এলেন এক সুপুরুষ যুবক। গায়ে দামি স্যুট, চোখে নম্রতা। রফিক সাহেব কিছু বুঝে ওঠার আগেই যুবকটি এসে সোজা তাঁর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন এবং বিনয়ের সাথে দাঁড়িয়ে রইলেন।
রফিক সাহেব একটু অবাক হয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে শুধালেন, "বাবা, তোমাকে ঠিক চিনতে পারলাম না তো!"
যুবকটি মৃদু হেসে বলল, "স্যার, আমি সোহেল। আজ থেকে পনেরো বছর আগে আপনার স্কুলে পড়া সেই ডানপিটে সোহেল, যাকে আপনি দরদ দিয়ে শিখিয়েছিলেন—'সত্য কথা বলা এবং জ্যেষ্ঠদের সম্মান করা মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ'।"
রফিক সাহেবের স্মৃতিপটে ভেসে উঠল সেই ছোট সোহেলের মুখ। দারিদ্র্যের কারণে যার পড়াশোনা প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। রফিক সাহেব নিজে উদ্যোগ নিয়ে সোহেলের বই-খাতা কিনে দিয়েছিলেন, দিনের পর দিন বিনামূল্যে কোচিং করিয়েছিলেন।
আজ সেই সোহেল দেশের এক নামকরা শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD)। অফিসের কাজে এই এলাকা দিয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু গাড়ির কাচ দিয়ে পুরনো শিক্ষককে চিনতে পেরে একমুহূর্তও দেরি না করে নেমে এসেছেন।
সোহেল স্যারের হাত দুটি জড়িয়ে ধরে বলল, "স্যার, আমি আজ সমাজে যেটুকু স্থান পেয়েছি, তার সবটুকুই আপনার দেওয়া শিক্ষার বদৌলতে। কিন্তু আপনাকে এভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।"
রফিক সাহেব শান্ত কণ্ঠে বললেন, "না রে বাবা, আমার কোনো কষ্ট নেই। তোদের মতো ছাত্ররা যখন সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, সেটাই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় উপার্জন।"
সোহেল লক্ষ্য করল স্যারের মলিন পোশাক আর চিন্তিত মুখচ্ছবি। কথা প্রসঙ্গে গ্রামের এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে সে জানতে পারল স্যারের ছোট মেয়ের বিয়ের কথা এবং আর্থিক সমস্যার কথা।
পরদিন সকালে আনন্দপুর গ্রামে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। রফিক সাহেবের বাড়িতে এসে হাজির হলো কয়েকটি গাড়ি। সোহেল নিজে এসে স্যারের হাতে একটি বড় খাম এবং বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটার তালিকা তুলে দিল।
রফিক সাহেব ইতস্তত করে বললেন, "সোহেল, এসব কী বাবা? আমি তো কারো কাছে সাহায্য নিতে পারি না।"
সোহেল রফিক সাহেবের হাত দুটি ধরে শ্রদ্ধাভরা কণ্ঠে বলল, "স্যার, এটা সাহায্য নয়, এটা আপনার পাওনা উপহার। আপনার কৃপায় আজ আমি শত কোটি টাকার মালিক হতে পেরেছি, কিন্তু আপনার সেই অবদান কোনো টাকা দিয়ে শোধ করা সম্ভব নয়। আমার এই অর্থ ও ক্ষমতা বৃথা, যদি না তা আমার শিক্ষকের কোনো কাজে আসে। সমাজে শত কাজের মাঝেও আমার কাছে 'শিক্ষকের সম্মান সবার আগে'।"
স্যারের চোখ দুটি অশ্রুতে ছলছল করে উঠল। তিনি সোহেলের মাথায় হাত রেখে বুকভরা আশীর্বাদ করলেন।
সেদিন শুধু রফিক সাহেবই আনন্দিত হননি, পুরো আনন্দপুর গ্রাম প্রত্যক্ষ করেছিল যে—একজন প্রকৃত শিক্ষকের স্থান সমাজের সবার ওপরে, আর সৎ ছাত্রের কাছে শিক্ষকের সম্মানই পরম ধর্ম।
গল্পের শিক্ষা:
শিক্ষকরাই জাতির মেরুদণ্ড এবং আলোকিত সমাজ গড়ার কারিগর। জীবনের যে উচ্চতাতেই আমরা পৌঁছাই না কেন, আমাদের লালন করা শিক্ষকদের মর্যাদা ও শ্রদ্ধা সবার ওপরে রাখা উচিত।
৩
৩ মন্তব্য