Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ

র ও ড় এর সঠিক ব্যবহার:

র ও ড় এর সঠিক ব্যবহার:


কেউ বলতেই পারে আমরা 'র, ড়, ঢ়'-তে তফাত করতে 'ব-য়ে বিন্দু, ড-য়ে বিন্দু, ঢ-য়ে বিন্দু' বলে থাকি। তবু তিনটি উচ্চারণ সম্পূর্ণ আলাদা। এর কারণ খুব সম্ভবত অনেক বাঙালিই নিজস্ব উপভাষার প্রভাবে এই তিনটি বর্ণের শুদ্ধ উচ্চারণ গুলিয়ে ফেলে। লক্ষ করবেন, এই নামগুলো কিন্তু উচ্চারণভিত্তিকও নয়, বরং একান্তই আকারভিত্তিক।


'পড়' ও 'পর' বিভ্রাট:

১. পড়াশোনা অর্থে পড় শব্দটি ব্যবহার করা হয়। আমি আমার ছেলেকে কতবার যে বলেছি, 'অনেক হয়েছে খেলা এবার পড়'। রবীন্দ্রনাথের 'শিশু' কবিতার বইতে একটি কবিতায় আছে, 'মাগো আমায় ছুটি দিতে বল, সকাল হতে পড়েছি যে মেলা। এখন আমি তোমার ঘরে বসে করব শুধু পড়া পড়া খেলা।'


যদি বলি, 'পড়বি তো পড় তুই আমার ওপরেই পড়লি?' এখানে 'পড়া' মানে উপর থেকে পড়া।


আবার 'পর' শব্দটি নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতায় (গানে) আছে, 'মেঘের পরে মেঘ করেছে আঁধার করে আসে।' এখানে 'পরে' শব্দটি ক্রমশ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মানে ক্রমশ মেঘ করে আসছে।


যদি বলি, 'তুমি তো আমার আপন নও, তুমি আমার পর।' এখানে 'পর' মানে 'অন্যজন'। কোকিলকে বলা হয় পরভৃত কারণ কোকিল পরের বাসায় ডিম পেড়ে থাকে। আবার, কাক পরের বাচ্চাকে পালন করে তাই কাকও পরভৃৎ।


'পর' শব্দ দিয়ে 'পরদিন' শব্দ তৈরি হয়েছে আবার 'পর' দিয়ে হয়েছে পরশু। শচিনদেব বর্মণের গানে শুনতে পাই, 'তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসনি?'


আবার যদি বলি, 'একটু পরেই বৃষ্টি হবে' এর মানে হলো 'একটু বাদেই বৃষ্টি হবে।'


পূজোতে খুব ব্যস্ত ছিলাম। তাই অনেক 'পরেই' (দেরিতে) উত্তর লিখলাম।


পড়া'র ব্যবহার:


১. ক্রিয়া পদ পতিত হওয়া (খাট থেকে পড়লেন); ঢলা (গায়ে পড়া স্বভাব); মন্দ অবস্থা হওয়া (কষ্টে পড়া, অতলান্তে পড়া); অঙ্গের বিশেষ ভঙ্গি করা (শুয়ে বা বসে পড়া.); অনাবাদি থাকা (জমি পড়ে থাকা, শূন্য থাকা বাড়িটা পড়ে আছে); অনাদায় থাকা (টাকা পড়ে থাকা);


আক্রান্ত হওয়া (রোগে পড়া); ধৃত হওয়া (জালে পড়া); জমা হওয়া (মরচে পড়া); স্মরণ হওয়া (মনে পড়া); ব্যয় হওয়া (ছয় টাকা পড়েছে); ঝরা (বক্ত পড়া); সৃষ্টি হওয়া (টাক পড়া অবসানপ্রাপ্ত হওয়া, বেলা পড়া); প্রযুক্ত হওয়া (হাত পড়া); শান্ত হওয়া (রাগ পড়া);


আকৃষ্ট হওয়া (চোখে পড়া); অভ্যন্তরে যাওয়া (পেটে পড়া); বিবাহিত হওয়া (বড়ো ঘরে পড়েছে)।


২. বিশেষ্য পদ ঐ সকল অর্থে; পতন।


৩. বিশেষণ পদ পতিত, পরিত্যক্ত, পড়ো।


পরা'র ব্যবহার:


১. ক্রিয়া পদ:

পরিধান করা, অঙ্গে আবরণ নেওয়া, (কাপড় পরা)।


২. বিশেষ্য পদ:

পরিধান, পরন, অঙ্গে ধারণ।


৩. বিশেষণ পদ:

পরিহিত: কাপড় পরা অবস্থা, জুতা-মোজা পরা পা।


আশা করি বুঝে গেছেন যে 'পড়' ও 'পরা' দুটো আলাদা ক্রিয়াপদ। পরিধান করা অর্থে 'র' হবে পতিত হওয়া ও পাঠ করা সহ অন্য সকল ক্ষেত্রে 'ড়' হবে।


চলুন কিছু উদাহরণ দেখে আসি- করিম গতকাল শার্ট পরেছিল, আজ পাঞ্জাবি পরেছে, আগামীকাল ব্লেজার পরবে।


রহিম ইউনিফর্ম পরে স্কুলে পড়তে গেল, যাওয়ার পথে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেল, ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্ত পড়ল।


মেয়েটি প্রেমে পড়েছে, তাই এখন সে কামিজ না পরে শাড়ি পরে। গরমে কেউ মোটা কাপড় পরতে চায় না।


আমি আজ পাঞ্জাবি পরেছি, কাল শার্ট পরব।


ঝুম বৃষ্টি পড়লেই তোমার কথা মনে পড়ে।


বাজারে মাছের দাম পড়ে গেছে।


বাবা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে পত্রিকা পড়তে লাগলেন। খুনখারাবির খবর সামনে পড়লেই তার চোখ থেকে পানি পড়ে।


কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে।


সংক্ষেপে বলতে গেলে, পড়ালেখা করার পড়া আর যত পড়ে যাওয়া অর্থাৎ হোঁচট খেয়ে পড়া, খাট থেকে পড়া, আকাশ থেকে পড়া যতভাবে পড়ে যাওয়া যায় সবগুলোতে এই 'পড়' হবে।


বাকিগুলোতে 'পর'। কবিতায় এই সূত্র অনেক কাজে লাগে। বি. দ্র. বিভিন্ন উপভাষায় যারা কথা বলেন, তারা অনেক সময়ই পড়া স্থানে পরা ব্যবহার করেন।


মন্তব্য করুন

ব্লগ