Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:৪৫ পূর্বাহ্ণ

কিয়ামতের অবশ্যম্ভাবিতা, মানুষের আত্মসচেতনতা ও আমলের জবাবদিহি -মোঃ মুজিবুর রহমান

কিয়ামতের অবশ্যম্ভাবিতা, মানুষের আত্মসচেতনতা ও আমলের জবাবদিহি

(পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কিয়ামাহর ৩–১৫ নম্বর আয়াতের আলোকে)

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জীবনের প্রতিটি কর্মের পরিণতি সুদূরপ্রসারী। পৃথিবীর জীবনই মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং মৃত্যুর পর রয়েছে পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, বিচার ও প্রতিদানের অনিবার্য অধ্যায়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কিয়ামাহর ৩–১৫ নম্বর আয়াতে মানুষের পুনরুত্থান সম্পর্কে সন্দেহ, পাপাচারে অবিচল থাকার প্রবণতা, কিয়ামতের ভয়াবহতা এবং নিজের কর্ম সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার বিষয়গুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন। এসব আয়াত মানুষকে আত্মসমালোচনা, তওবা, নৈতিক সংশোধন ও আখিরাতের প্রস্তুতির দিকে আহ্বান জানায়।

পুনরুত্থান মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রমাণ

মানুষের মৃত্যুর পর তার দেহ মাটিতে মিশে গেলেও মহান আল্লাহর কাছে তাকে পুনরায় জীবিত করা কোনো কঠিন বিষয় নয়। সূরা আল-কিয়ামাহর ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, মানুষ কি মনে করে যে তিনি তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারবেন না? পরবর্তী আয়াতে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, তিনি মানুষের আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত যথাযথভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম।

এই বক্তব্য মানুষের সামনে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও নিখুঁত সৃষ্টিশৈলীর পরিচয় তুলে ধরে। যে মহান স্রষ্টা মানুষকে প্রথমবার অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর পক্ষে মৃত্যুর পর তাকে পুনরায় জীবিত করা অসম্ভব নয়। মানুষের দৃষ্টিতে দেহের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিংবা মাটিতে মিশে যাওয়া পুনরুত্থানের পথে কোনো বাধা নয়। আল্লাহর জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইচ্ছা সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে।

অতএব, পুনরুত্থানকে অসম্ভব মনে করা মানুষের সীমিত উপলব্ধির পরিচায়ক। একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে পুনরায় জীবিত করে তাঁর সামনে উপস্থিত করা হবে।

পাপাচারে অবিচল থাকার মানসিকতা

পবিত্র কুরআনের ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ ভবিষ্যতেও পাপাচার করতে চায়। অর্থাৎ, অনেক মানুষ আখিরাতের জবাবদিহি অস্বীকার করে নিজেদের প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে চায়। তারা এমন জীবন কামনা করে, যেখানে অন্যায়ের জন্য জবাবদিহি করতে হবে না, পাপের পরিণতি নিয়ে ভাবতে হবে না এবং নিজেদের ইচ্ছামতো চলার পথে কোনো বাধা থাকবে না।

এই মানসিকতা মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যখন কেউ নিজের স্বার্থ, অহংকার ও প্রবৃত্তিকে সত্যের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তখন সে ভুলকে ভুল হিসেবে স্বীকার করতে চায় না। নিজের অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়, অপরাধকে তুচ্ছ মনে করে এবং সংশোধনের পরিবর্তে আত্মপক্ষসমর্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

কিন্তু মানুষের ইচ্ছা সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না। অন্যায়কে ন্যায়, মিথ্যাকে সত্য কিংবা পাপকে পুণ্যে পরিণত করার ক্ষমতা মানুষের নেই। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো, প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা এবং ভুল হয়ে গেলে আন্তরিকভাবে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসা।

কিয়ামতের দিন: এক অনিবার্য বাস্তবতা

৬ নম্বর আয়াতে মানুষের প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে—কিয়ামতের দিন কখন আসবে? এই প্রশ্নের পেছনে কখনো অবিশ্বাস, কখনো বিদ্রূপ, আবার কখনো প্রকৃত জানার আগ্রহ থাকতে পারে। তবে আলোচ্য প্রসঙ্গে কিয়ামতকে অস্বীকার করে পাপাচারে অবিচল থাকার মানসিকতাই বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে, তার নির্দিষ্ট জ্ঞান একমাত্র মহান আল্লাহর কাছে। মানুষের দায়িত্ব কিয়ামতের সময় নির্ধারণ করা নয়; বরং তার আগমনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

মানুষ সাধারণত ভবিষ্যতের অনেক পরিকল্পনা করে, অথচ নিজের মৃত্যুর সময় সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানে না। আজ যে মানুষ সুস্থ, কর্মক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী, আগামীকাল তার জীবনেও নেমে আসতে পারে মৃত্যুর পর্দা। তাই আখিরাতের প্রস্তুতিকে অবহেলা করা আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল।

কিয়ামত কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়; এটি ইসলামের মৌলিক আকিদার অংশ। সুতরাং একজন মুমিনের জীবন হওয়া উচিত এমন, যাতে প্রতিটি দিন তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকালের প্রস্তুতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

মহাপ্রলয়ের ভয়াবহ দৃশ্য ও মানুষের অসহায়ত্ব

সূরা আল-কিয়ামাহর ৭–৯ নম্বর আয়াতে কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেদিন মানুষের দৃষ্টি আতঙ্কে স্থির হয়ে যাবে, চাঁদের আলো নিভে যাবে এবং সূর্য ও চাঁদকে একত্র করা হবে।

পৃথিবীর মানুষ প্রতিদিন সূর্য ও চাঁদের আলো দেখে অভ্যস্ত। এই মহাজাগতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই তারা সময় নির্ধারণ করে, জীবন পরিচালনা করে এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সাজায়। কিন্তু যে সৃষ্টিজগৎ আজ মানুষের কাছে নিয়মতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বলে মনে হয়, কিয়ামতের সময় মহান আল্লাহর নির্দেশে সেই ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটবে।

এই বর্ণনা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবী ও মহাবিশ্বের বর্তমান ব্যবস্থা চিরস্থায়ী নয়। সৃষ্টিজগতের প্রত্যেকটি বিষয় মহান আল্লাহর অধীন। তাঁর নির্দেশেই সবকিছুর অস্তিত্ব, পরিচালনা ও পরিণতি নির্ধারিত হয়।

কিয়ামতের সেই ভয়াবহ মুহূর্তে মানুষের পার্থিব শক্তি, সম্পদ, প্রভাব, প্রতিপত্তি কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নতি তাকে আল্লাহর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না। তখন মানুষের প্রকৃত অসহায়ত্ব প্রকাশিত হবে এবং সে উপলব্ধি করবে যে, দুনিয়ার জীবনে যে সত্যকে অবহেলা করেছে, তা-ই ছিল তার চূড়ান্ত প্রস্তুতির বিষয়।

পালানোর পথ থাকবে না, আশ্রয় হবে একমাত্র আল্লাহর কাছে

১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সেদিন মানুষ বলবে, ‘পালানোর স্থান কোথায়?’ এর পরের আয়াতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো আশ্রয়স্থল থাকবে না। ১২ নম্বর আয়াত অনুসারে, সেদিন প্রত্যাবর্তন ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে মহান রবের কাছেই।

পৃথিবীতে মানুষ বিপদে পড়লে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। কেউ সম্পদের ওপর নির্ভর করে, কেউ ক্ষমতাবান ব্যক্তির সাহায্য চায়, আবার কেউ নিজের সামাজিক অবস্থানকে নিরাপত্তার অবলম্বন মনে করে। কিন্তু কিয়ামতের দিন এসব পার্থিব অবলম্বন মানুষকে আল্লাহর বিচার থেকে মুক্তি দিতে পারবে না।

সেদিন প্রত্যেক মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়াতে হবে। সেখানে আত্মীয়তার পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পার্থিব ক্ষমতা দিয়ে ন্যায়বিচার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। প্রত্যেকের পরিণতি নির্ধারিত হবে মহান আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী।

তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ারও কোনো কারণ নেই। জীবিত অবস্থায় আন্তরিক তওবা, ঈমান, সৎকর্ম ও আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে মানুষ তাঁর ক্ষমা ও দয়া লাভের আশা করতে পারে। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ হলো, বিপদ উপস্থিত হওয়ার অপেক্ষা না করে সুস্থ ও সচেতন অবস্থায় আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।

প্রতিটি কর্মের হিসাব সংরক্ষিত থাকবে

১৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সেদিন মানুষকে জানিয়ে দেওয়া হবে, সে আগে কী পাঠিয়েছে এবং পেছনে কী রেখে গেছে। এই বক্তব্য মানুষের ব্যক্তিগত আমল এবং তার কর্মের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে গভীর শিক্ষা দেয়।

মানুষ জীবনে অসংখ্য কাজ করে। কিছু কাজের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হয়ে যায়, আবার কিছু কাজের প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে অন্য মানুষের জীবন ও সমাজকে প্রভাবিত করে। একটি ভালো শিক্ষা, একটি উপকারী উদ্যোগ, একটি কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি সৎ আদর্শ মানুষের মৃত্যুর পরও সমাজের উপকারে আসতে পারে। অন্যদিকে, অন্যায়ের প্রচলন, ক্ষতিকর শিক্ষা, প্রতারণার পদ্ধতি কিংবা মানুষকে বিপথে পরিচালিত করার উদ্যোগও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষের সৎকর্মের পাশাপাশি তার রেখে যাওয়া কল্যাণকর বা ক্ষতিকর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের জীবনকে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং এমন কাজ করে যেতে হবে, যা অন্য মানুষের উপকারে আসে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক হয়।

প্রতিটি কথা, কাজ, সিদ্ধান্ত ও আচরণের নৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই কোনো কাজ করার আগে বিবেচনা করা উচিত—এটি কি ন্যায়সংগত, মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং আল্লাহর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই সচেতনতাই মানুষকে দায়িত্বশীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তোলে।

মানুষ নিজেই নিজের সম্পর্কে অবগত

১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ নিজের সম্পর্কে সম্যক অবগত। অর্থাৎ, মানুষ নিজের কাজ, উদ্দেশ্য ও আচরণ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে। সে বাইরে নিজেকে যতই নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করুক, নিজের বিবেকের কাছে তার প্রকৃত অবস্থান সম্পূর্ণ গোপন থাকে না।

একজন মানুষ হয়তো অন্যের সামনে নিজের ভুল আড়াল করতে পারে, নিজের অপরাধ অস্বীকার করতে পারে কিংবা পরিস্থিতিকে নিজের পক্ষে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু সে যদি নিজের অন্তরের সঙ্গে সৎ থাকে, তবে বুঝতে পারবে কোথায় সে অন্যায় করেছে, কোথায় দায়িত্বে অবহেলা করেছে এবং কোথায় নিজের স্বার্থকে সত্যের ওপর প্রাধান্য দিয়েছে।

এই আত্মসচেতনতা মানুষের নৈতিক উন্নতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কারণ, নিজের ভুল স্বীকার করতে না পারলে সংশোধনের পথও উন্মুক্ত হয় না। যে ব্যক্তি সর্বদা অন্যের দোষ অনুসন্ধান করে, কিন্তু নিজের ত্রুটি পর্যালোচনা করে না, সে আত্মশুদ্ধির সুযোগ হারায়।

ইসলাম মানুষকে আত্মসমালোচনা, তাকওয়া ও জবাবদিহির চেতনায় জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়। তাই প্রতিদিন নিজের কাজ পর্যালোচনা করা, ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সংশোধনের সংকল্প গ্রহণ করা একজন সচেতন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

অজুহাত নয়, সত্যের স্বীকৃতি ও আত্মসংশোধন

১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ নানা অজুহাত পেশ করলেও নিজের প্রকৃত অবস্থা তার অজানা নয়। এই বক্তব্য আত্মপ্রবঞ্চনা ও অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে বৈধ প্রমাণ করার প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি গভীর সতর্কবার্তা।

মানুষ ভুল করলে অনেক সময় নিজের দোষ স্বীকার না করে অন্যের ওপর দায় চাপায়। কখনো পরিস্থিতিকে দায়ী করে, কখনো নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত বানায়, আবার কখনো এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করায়, যার মাধ্যমে নিজের অন্যায়কে ছোট করে দেখানো যায়। এভাবে সে সাময়িকভাবে অন্যের সমালোচনা এড়াতে পারলেও নিজের ভুলের প্রকৃত সমাধান করতে পারে না।

তবে সব ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষসমর্থনই যে মিথ্যা, তা নয়। কখনো মানুষ সত্যিই অন্যায়ের শিকার হয়, কখনো তার বক্তব্যে গ্রহণযোগ্য কারণ থাকে। ইসলামের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বাস্তব পরিস্থিতি, প্রমাণ, উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি। কিন্তু জেনেশুনে অন্যায় করা, সত্য গোপন করা কিংবা নিজের দোষ আড়াল করতে মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করানো কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

সুতরাং প্রকৃত মহত্ত্ব নিজের ভুলকে জোর করে সঠিক প্রমাণ করার মধ্যে নয়; বরং সত্যকে স্বীকার করা, অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে সংশোধিত জীবনযাপনের মধ্যে নিহিত।

যে ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, সে সংশোধনের পথ খুঁজে পায়। আর যে ব্যক্তি অহংকারের কারণে সত্য প্রত্যাখ্যান করে, সে নিজের উন্নতির পথ নিজেই সংকুচিত করে ফেলে। তাই আত্মসমালোচনা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটি নৈতিক সাহস, প্রজ্ঞা ও আত্মশুদ্ধির নিদর্শন।

আত্মসমালোচনা, তওবা ও নৈতিক জীবনের গুরুত্ব

সূরা আল-কিয়ামাহর আলোচ্য আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, মানুষের প্রকৃত সাফল্য কেবল পার্থিব অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থ, সম্পদ, পদমর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা মানুষের জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে পারে; কিন্তু এগুলো আখিরাতের মুক্তির নিশ্চয়তা নয়।

একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক ঈমান, সৎকর্ম, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি, সত্যবাদিতা, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি আনুগত্য। একই সঙ্গে নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, আন্তরিকভাবে তওবা করা এবং মানুষের সঙ্গে আচরণে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাও অপরিহার্য।

আত্মসমালোচনার অর্থ নিজেকে ঘৃণা করা নয়; বরং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়া। অন্যের ভুল দেখলে যেমন সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া উচিত, তেমনি নিজের ভুল ধরা পড়লে তা আন্তরিকভাবে সংশোধন করাও জরুরি। কারণ, যে সমাজে মানুষ নিজের দায়িত্ব স্বীকার করে, সত্যকে সম্মান করে এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করে, সেই সমাজেই ন্যায়, শান্তি ও পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় হয়।

ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক সম্পর্ক ও পেশাগত দায়িত্ব—সব ক্ষেত্রেই এই শিক্ষা প্রযোজ্য। কোনো ব্যক্তি ক্ষমতাবান হলেই তার কাজ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যায় না; আবার কেউ দুর্বল হলেই তার অধিকার উপেক্ষা করা যায় না। প্রত্যেককে নিজের অবস্থান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায়কে বেছে নিতে হবে।

উপসংহার

সূরা আল-কিয়ামাহর ৩–১৫ নম্বর আয়াত মানুষের সামনে এক চিরন্তন সত্য তুলে ধরে: মহান আল্লাহ মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত করতে সক্ষম, কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী এবং প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মের হিসাব দিতে হবে। সেদিন কোনো পার্থিব আশ্রয়, মিথ্যা অজুহাত কিংবা আত্মপ্রবঞ্চনা মানুষকে আল্লাহর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না। মানুষ নিজের কর্ম সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং তার জীবনের সৎ ও অসৎ কাজের পরিণতির মুখোমুখি হবে।

অতএব, আসুন, আমরা পাপাচারে অবিচল থাকার পরিবর্তে তওবা ও আত্মসংশোধনের পথ বেছে নিই; অন্যের দোষ অনুসন্ধানের আগে নিজেদের ত্রুটি পর্যালোচনা করি; অজুহাতের আড়ালে অন্যায় লুকানোর পরিবর্তে সত্যকে স্বীকার করি; এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করে ন্যায়, সততা ও কল্যাণের পথে জীবন পরিচালনা করি। দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করে এমন সৎকর্ম রেখে যাই, যার সুফল আমাদের মৃত্যুর পরও মানুষের উপকারে আসে।

হে মহান আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে ঈমানের আলোয় আলোকিত করুন, আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির তাওফিক দিন, অন্যায় ও আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে রক্ষা করুন, আন্তরিক তওবা ও নেক আমলের মাধ্যমে আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ দিন এবং কিয়ামতের কঠিন হিসাবের দিন আমাদের ক্ষমা করে আপনার রহমত ও জান্নাত নসিব করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ