Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:৪৩ পূর্বাহ্ণ

সূরা আর-রাহমান: আল্লাহর অসীম রহমত ও অগণিত নিয়ামতের মহিমান্বিত বর্ণনা- মোঃ মুজিবুর রহমান

সূরা আর-রাহমান: আল্লাহর অসীম রহমত ও অগণিত নিয়ামতের মহিমান্বিত বর্ণনা

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

পবিত্র কুরআনের ৫৫তম সূরা আর-রাহমান ইসলামের এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ সূরা। এটি ২৭তম পারায় অবস্থিত এবং এতে ৭৮টি আয়াত রয়েছে। ‘আর-রাহমান’ অর্থ পরম করুণাময়, যা আল্লাহ তাআলার অসীম দয়া ও ব্যাপক রহমতের পরিচয় বহন করে। এ সূরায় মহান আল্লাহর অগণিত নিয়ামত, সৃষ্টিজগতের বিস্ময়কর নিদর্শন, মানুষ ও জিনের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ, কিয়ামতের বাস্তবতা এবং জান্নাত-জাহান্নামের পরিণতি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। সূরাটি মানুষকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, তাঁর আনুগত্য এবং পরকালীন জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণের শিক্ষা দেয়।

আল্লাহর রহমত ও কুরআনের মর্যাদা

সূরাটির সূচনায় মহান আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন ‘আর-রাহমান’ নামে। এরপর তিনি কুরআন শিক্ষা দেওয়া, মানুষ সৃষ্টি করা এবং তাকে মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা দানের কথা উল্লেখ করেছেন। সূরার প্রথম চারটি আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, কুরআন মানবজাতির জন্য আল্লাহর এক মহান অনুগ্রহ এবং মানুষের জ্ঞান, বোধশক্তি ও ভাষাগত দক্ষতাও তাঁর দান। মানুষের যথার্থ মর্যাদা নিহিত রয়েছে আল্লাহর নির্দেশনা গ্রহণ, সত্য উপলব্ধি এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জীবন পরিচালনার মধ্যে।

মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা ও সৃষ্টির নিদর্শন

মহান আল্লাহ সূর্য ও চন্দ্রকে সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন করেছেন। নক্ষত্ররাজি ও বৃক্ষলতা তাঁর নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করে। তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং পৃথিবীতে ন্যায়ের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব বর্ণনা মানুষকে সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা, ভারসাম্য ও সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। একই সঙ্গে ন্যায়বিচার, সততা ও অধিকার রক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখার শিক্ষা দেয়।

পৃথিবী, জীবিকা ও অগণিত নিয়ামত

পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করা, তাতে ফলমূল, খেজুর, শস্যদানা ও সুগন্ধি উদ্ভিদ সৃষ্টি করা মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের নিদর্শন। সমুদ্রের পানি, নৌযান চলাচল, খাদ্য ও জীবিকার উপকরণ—সবকিছুই তাঁর কুদরতের পরিচয় বহন করে। মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেসব নিয়ামত ভোগ করে, সেগুলোর প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করলে তার হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা, বিনয় ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়। তাই আল্লাহর নিয়ামত যথাযথভাবে ব্যবহার করা, অপচয় পরিহার করা এবং সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা মুমিনের কর্তব্য।

মানুষ ও জিনের প্রতি আল্লাহর আহ্বান

সূরা আর-রাহমানে মানুষ ও জিন উভয় জাতিকে সম্বোধন করে মহান আল্লাহ তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ দুই সৃষ্টিই আল্লাহর বিধানের অধীন এবং উভয়কেই নিজ নিজ কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। বারবার প্রশ্ন করা হয়েছে—‘অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?’ এই প্রশ্ন মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার না করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানায়।

সূরাটিতে এই আয়াতটি মোট ৩১ বার পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহর নিয়ামত, ক্ষমতা ও নিদর্শন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার এবং অকৃতজ্ঞতা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। একজন সচেতন মুমিনের উচিত শুধু মুখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটানো।

দুই সমুদ্রের বিস্ময়কর নিদর্শন

সূরার ১৯–২২ নম্বর আয়াতে দুটি সমুদ্রের মিলন, তাদের মধ্যবর্তী অন্তরাল এবং সেখান থেকে মুক্তা ও প্রবাল আহরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি ও প্রাকৃতিক জগতের বিস্ময়কর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সমুদ্রের বিভিন্ন জলরাশির মধ্যে লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে কিছু ক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্যগত সীমারেখা তৈরি হতে পারে। তবে এসব আয়াতের তাফসির নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য ইসলামী ব্যাখ্যার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে; আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কুরআনের বক্তব্যকে কোনো অনিশ্চিত বৈজ্ঞানিক দাবির ওপর নির্ভরশীল করে তোলা সমীচীন নয়।

কিয়ামত, জবাবদিহি ও পরকাল

সূরা আর-রাহমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, পৃথিবীর জীবন চিরস্থায়ী নয়। একদিন সব সৃষ্টিই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে এবং প্রত্যেককে তার কর্মের হিসাব দিতে হবে। অপরাধীদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তির সতর্কবাণী, আর আল্লাহভীরু ও সৎকর্মশীলদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান। এ বর্ণনা মানুষকে অন্যায়, অহংকার, অবাধ্যতা ও পাপাচার থেকে দূরে থাকতে এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে উদ্বুদ্ধ করে।

জান্নাতের অনুপম পুরস্কার

সূরার শেষাংশে মুত্তাকি বান্দাদের জন্য জান্নাতের অপরূপ সৌন্দর্য, প্রবহমান ঝরনা, ফলমূল, প্রশান্তি ও নানা নিয়ামতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এসব বর্ণনা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্মের পথে অবিচল থাকার প্রেরণা জোগায়। জান্নাতের প্রতিশ্রুতি মুমিনের অন্তরে আশা জাগায়, আর জাহান্নামের সতর্কবাণী তাকে অন্যায় ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে। এভাবে সূরাটি মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, আত্মশুদ্ধি ও নেক আমলের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে।

সূরা আর-রাহমানের শিক্ষা ও আমাদের করণীয়

সূরা আর-রাহমান আমাদের শেখায়, আল্লাহর রহমত ও নিয়ামত অসংখ্য; তাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, তাঁর নির্দেশ পালন এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার রক্ষা, অপচয় পরিহার, সত্যবাদিতা, দয়া ও পরোপকারের চর্চা এ সূরার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে আল্লাহর নিয়ামতকে তাঁর অবাধ্যতার কাজে ব্যবহার না করে কল্যাণকর পথে ব্যয় করা উচিত।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, সূরা আর-রাহমান আল্লাহর অসীম রহমত, সৃষ্টিজগতের বিস্ময়, মানুষ ও জিনের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ এবং পরকালীন জবাবদিহির এক হৃদয়স্পর্শী স্মারক। এ সূরা মানুষকে অকৃতজ্ঞতা থেকে কৃতজ্ঞতায়, অবহেলা থেকে সচেতনতায় এবং অবাধ্যতা থেকে আনুগত্যের পথে আহ্বান জানায়। তাই এর শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা, আল্লাহর নিয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং আখিরাতের কল্যাণ অর্জনে সচেষ্ট হওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়, সৎকর্ম সম্পাদন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ