অধ্যক্ষ
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৩০ অপরাহ্ণ
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়
আমরা অনেকেই প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করি। কেউ ফজরের নামাজের পর, কেউ মাগরিবের পর, আবার কেউ ঘুমানোর আগে কয়েক পৃষ্ঠা কুরআন পড়ি। কুরআন তিলাওয়াত করা নিঃসন্দেহে অনেক সওয়াবের কাজ। কিন্তু কখনো কি আমরা নিজেদের প্রশ্ন করেছি, কুরআন কি শুধু পড়ার জন্যই নাজিল হয়েছে, নাকি এর প্রতিটি আয়াত আমাদের জীবন পরিবর্তনের জন্যও এসেছে?
একটু ভেবে দেখুন, আমাদের কাছে যদি এমন একটি চিঠি আসে, যেখানে আমাদের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা লেখা আছে, তাহলে কি আমরা শুধু চিঠিটি পড়েই রেখে দেব? নাকি এর ভেতরে কী বলা হয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করব এবং সেই অনুযায়ী কাজ করব?
নিশ্চয়ই আমরা চিঠির অর্থ বুঝতে চাইব এবং নির্দেশনা অনুযায়ী চলার চেষ্টা করব। তাহলে যে কুরআন আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে, সেই কুরআন পড়ার পাশাপাশি তার অর্থ বোঝা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা কি আমাদের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?
কুরআন আমাদের জীবনের পথনির্দেশিকা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
“নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথের নির্দেশনা দেয়, যা সবচেয়ে সরল।” (সুরা আল-ইসরা, ১৭:৯)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কুরআন শুধু তিলাওয়াতের একটি গ্রন্থ নয়। এটি আমাদের জীবনের পথ দেখায়। কীভাবে সত্য কথা বলতে হবে, কীভাবে মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে বিপদে ধৈর্য ধরতে হবে, কীভাবে অন্যের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং কীভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে, কুরআন আমাদের এসব বিষয়ে শিক্ষা দেয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, কখনো কখনো আমরা কুরআন পড়ি, অথচ তার শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে ভুলে যাই।
আমরা কুরআন থেকে ধৈর্যের কথা পড়ি, কিন্তু সামান্য সমস্যায় হতাশ হয়ে পড়ি। আমরা ক্ষমার কথা পড়ি, কিন্তু কেউ আমাদের কষ্ট দিলে তাকে ক্ষমা করতে পারি না। আমরা সত্যের গুরুত্ব জানি, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য মিথ্যা বলি।
তাহলে আমাদের ভাবতে হবে, কুরআন পড়ার পরও কেন আমাদের আচরণে পরিবর্তন আসছে না?
কুরআন পড়ুন, বুঝুন এবং আমল করুন
কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হওয়া উচিত তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে: তিলাওয়াত, উপলব্ধি এবং আমল।
প্রথমত, কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। কারণ কুরআন পড়া নিজেই একটি ইবাদত।
দ্বিতীয়ত, এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রতিদিন কয়েকটি আয়াতের বাংলা অনুবাদ পড়লেও আমরা আল্লাহর বাণী সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি।
তৃতীয়ত, যা শিখব, তা জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করতে হবে। কারণ জ্ঞান তখনই আমাদের জীবনে প্রকৃত প্রভাব ফেলে, যখন আমরা সেই জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সুরা সাদ, ৩৮:২৯)
এই আয়াত আমাদের কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা করতে এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে।
দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের শিক্ষা
ধরুন, আপনি আজ এমন একটি আয়াত পড়লেন, যেখানে রাগ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করার গুণের কথা বলা হয়েছে। সেদিনই কেউ আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করল। আপনি চাইলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশোধ নিতে পারেন। আবার মনে করতে পারেন, আমি তো একটু আগেই কুরআনে ক্ষমার শিক্ষা পড়েছি। তাহলে আজ আমি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি।
এটাই কুরআনের শিক্ষা জীবনে প্রয়োগ করা।
আবার ধরুন, আপনি এমন একটি আয়াত পড়লেন, যেখানে বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাহলে শুধু আয়াতটি পড়ে শেষ করবেন না। বরং বাবা-মায়ের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলুন, তাঁদের খোঁজ নিন এবং তাঁদের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান।
কুরআন আমাদের সততা শেখায়। তাই ব্যবসায়, চাকরিতে কিংবা দৈনন্দিন লেনদেনে সৎ থাকার চেষ্টা করুন। কুরআন অন্যের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। তাই কাউকে ঠকাবেন না, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করবেন না এবং নিজের কথায় ও কাজে মানুষের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন।
এভাবেই কুরআনের শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং সমাজকে সুন্দর করে তুলতে পারে।
প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট দিয়ে শুরু করুন
আপনি যদি মনে করেন, কুরআন বোঝার জন্য অনেক সময় দরকার, তাহলে আজ থেকেই ছোট একটি অভ্যাস গড়ে তুলুন।
প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট সময় দিন।
- প্রথম ৩ মিনিট: মনোযোগ দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করুন।
- পরের ৪ মিনিট: পড়া আয়াতগুলোর বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বুঝুন।
- শেষ ৩ মিনিট: নিজেকে প্রশ্ন করুন, আজকের শিক্ষা আমি কীভাবে জীবনে কাজে লাগাব?
একদিনে অনেক কিছু শেখার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন একটি ভালো শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং তা অনুসরণ করার চেষ্টা করুন।
ধীরে ধীরে আপনি বুঝতে পারবেন, কুরআন শুধু আপনার ঠোঁটে উচ্চারিত হচ্ছে না, বরং আপনার চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছে।
আসুন, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ি
প্রিয় ভাই ও বোন, আমরা যেন কুরআনকে শুধু রমজান মাসের জন্য সীমাবদ্ধ না রাখি, শুধু ঘরে সাজিয়ে না রাখি কিংবা শুধু বিশেষ উপলক্ষে তিলাওয়াত করে দায়িত্ব শেষ মনে না করি।
কুরআনকে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গী করে তুলি। নিয়মিত তিলাওয়াত করি, অর্থ বোঝার চেষ্টা করি, নির্ভরযোগ্য তাফসির থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করি।
মনে রাখবেন, কুরআন পড়ার উদ্দেশ্য শুধু কত পৃষ্ঠা পড়লাম, তা গণনা করা নয়। বরং এর মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয় জানা, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং নিজের জীবনকে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী গড়ে তোলার চেষ্টা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজ নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন: আমি প্রতিদিন কুরআন পড়ি, কিন্তু কুরআনের শিক্ষা কি আমার জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে?
যদি উত্তর হয়, ‘এখনো পুরোপুরি নয়’, তাহলে হতাশ হবেন না। আজ থেকেই পরিবর্তনের চেষ্টা শুরু করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন তিলাওয়াত করার, তা বোঝার, এর শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমাদের অন্তরকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কুরআনকে আমাদের জন্য হেদায়েতের মাধ্যম বানিয়ে দিন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
৪
৭ মন্তব্য