সহকারী শিক্ষক
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:২২ পূর্বাহ্ণ
ভীতিহীন শৈশব, দূরদর্শী কৈশোর: 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' ও জীবনমুখী বাস্তবতার মেলবন্ধন
শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘদিন যাবৎ বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান পড়াচ্ছি, একজন শিক্ষক হিসাবে প্রতিদিন চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ চিত্র। খুব কাছ থেকে দেখেছি, কীভাবে আমাদের শিক্ষার্থীরা কেবল ভালো জিপিএ এবং পরীক্ষার নম্বরের নির্মম চাপে পিষ্ট হচ্ছে। বিষয়গুলোর গভীরতা অনুধাবন না করে কেবল মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভর করে বৈতরণী পার হওয়ার এই যে অমানবিক প্রতিযোগিতা, তা শেষ পর্যন্ত আমাদের এক যান্ত্রিক ও আত্মাকেন্দ্রীক প্রজন্ম উপহার দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাঙ্গনে সবচেয়ে বেশি চর্চিত পরিভাষা হলো "লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস" বা "আনন্দময় শিক্ষা"। কিন্তু এই আনন্দময় শিক্ষা বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? এটি কি কেবল শ্রেণিকক্ষের বাইরে নাচগান বা হইচই করে খেলাধুলা করা? মোটেও তা নয়। আনন্দময় শিক্ষা হলো এমন একটি ভীতিহীন, মুক্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশ, যেখানে শিক্ষার্থী কৌতূহল নিয়ে যেকোনো জটিল বিষয়কে আনন্দের সাথে বুঝে নেওয়ার সুযোগ পায়।
জীববিজ্ঞানের কথাই যদি ধরি—এটি যেমন অঙ্কের মতো নিছক ধাপে ধাপে সূত্র মেলানোর বিষয় নয়, তেমনি এটি কেবল সাহিত্যের মতো মানসিকভাবে বানিয়ে লেখার বিষয়ও নয়; এটি হলো প্রকৃতি ও জীবনকে অনুধাবনের বিজ্ঞান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের বেশিরভাগ গ্রামীণ বা প্রান্তিক স্কুলে আধুনিক ল্যাবরেটরি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা রক্তরসের উপাদান আলাদা করে দেখানোর মতো দামি যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। এমন বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করার একমাত্র উপায় হলো শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষ ভিত্তিক কৌশল। জটিল জৈবিক পরিভাষা বা প্রক্রিয়াগুলোকে ছন্দ ও ছড়ার মাধ্যমে তুলে ধরা, ভিডিও বা ছবির সাহায্যে বিমূর্ত বিষয়কে চাক্ষুষ করা কিংবা উদ্ভিদের রস উত্তোলন ও পানি শোষণের মতো ঘটনাগুলো ছোট প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি দেখানো—এটাই হলো আসল 'গ্যামিফিকেশন' ও আনন্দময় শিক্ষা। গণিত বা বিজ্ঞান বোঝাতে শিক্ষককে ফুটবল নিয়ে মাঠে দৌড়াতে হয় না, বরং ক্লাসরুমের ভেতরেই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আনন্দের উপাদান তৈরি করতে হয়।
তবে বয়সের সাথে সাথে শিক্ষার রূপরেখাতেও পরিবর্তন আবশ্যক। প্রাথমিক স্তরে কোমলমতি শিশুদের ওপর পরীক্ষার অমানুষিক খড়্গ না ঝুলিয়ে খেলাধুলার ছলে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এসে শিক্ষার্থীদের পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করতেই হবে। বিশ্বজুড়ে যেসব দেশ আধুনিক শিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়েছে, তারা প্রাথমিক স্তরে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি মজবুত করার পর মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের উচ্চমানের প্রযুক্তি, বিশ্বমানের গণিত এবং কঠোর কারিগরি শিক্ষার ভেতর দিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে সম্পদ সীমিত। তাই এই সীমিত সম্পদ দিয়ে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে মাধ্যমিক স্তরে এসে কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা, কারিগরি দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের পড়াশোনা যেন কেবল সনদপত্র অর্জনের হাতিয়ার না হয়, বরং তা যেন দৈনন্দিন জীবনে কাজে আসে। একটি শিশু যখন জীববিজ্ঞান পড়ছে, তখন তার পাঠ্যক্রমে কেবল কোষের অঙ্গাণু মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভেষজ ও ঔষধি উদ্ভিদের জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সামান্য ঠান্ডা লাগলে বা সাধারণ শারীরিক সমস্যায় কৃত্রিম ওষুধের পেছনে না ছুটে তুলসী পাতা, নিম বা স্থানীয় ঔষধি গাছ ব্যবহার করার প্রাথমিক জ্ঞান যদি তারা বিদ্যালয় থেকে পায়, তবে তারা শারীরিকভাবে যেমন উপকৃত হবে, তেমনি প্রাকৃতিক উপায়ে সুস্থ থাকতে শিখবে। একইভাবে ফুল চাষ, বৃক্ষরোপণ, নার্সিং বা কৃষির মতো বাস্তবমুখী দক্ষতাগুলো শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী হতে শেখায়। শিক্ষা মানুষকে কেবল "চাকরিপ্রার্থী" বানাবে না, বরং একজন উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হলো নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, শিক্ষকের প্রতি সম্মান এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আজ ধূলিসাৎ হতে বসেছে। শুধু বাহ্যিক আনন্দ দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। শিক্ষাক্রমে সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তব কার্যকারিতার জ্ঞান যুক্ত করতে হবে। কীভাবে দেশের সম্পদ রক্ষা করতে হয়, কীভাবে সচেতন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়—এই বাস্তব পাঠগুলোই শিক্ষার্থীদের একজন সত্যিকারের সুনাগরিক করে তুলবে।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা কোনো যান্ত্রিক কারখানা নয়, যেখানে কেবল মেকি গ্রেড আর জিপিএ উৎপাদন করা হবে। প্রথাগত পরীক্ষার ভীতি দূর করে প্রাথমিক স্তরে আনন্দের সাথে শিখন নিশ্চিত করতে হবে, আর মাধ্যমিক স্তরে যুক্ত করতে হবে প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা, কঠোর পরিশ্রম এবং জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতার পাঠ। আনন্দ এবং বাস্তবতার এই ভারসাম্যপূর্ণ মেলবন্ধনই পারে বাংলাদেশকে এমন একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপহার দিতে, যারা মানসিকভাবে সুস্থ হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
৩
৩ মন্তব্য