Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:১৪ পূর্বাহ্ণ

জীবনসঙ্গী বেঁচে থাকতে দোষারোপ, চলে গেলে প্রশংসা—কেন এই দ্বিমুখী মূল্যায়ন? -মোঃ মুজিবুর রহমান

জীবনসঙ্গী বেঁচে থাকতে দোষারোপ, চলে গেলে প্রশংসা—কেন এই দ্বিমুখী মূল্যায়ন?

(জীবদ্দশায় পারস্পরিক মর্যাদা, ক্ষমা ও ভালোবাসাই হোক দাম্পত্যের প্রকৃত সৌন্দর্য)

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

জীবনসঙ্গী বেঁচে থাকতে তাঁর দোষগুলো কেন এত বড় হয়ে দেখা দেয়, আর মৃত্যুর পর সেই মানুষটিই কেন স্মৃতির পাতায় ভালো, মহৎ ও প্রিয় হয়ে ওঠেন? জীবিত অবস্থায় যাঁর আচরণ, কথাবার্তা, সীমাবদ্ধতা ও ভুলত্রুটি নিয়ে প্রতিনিয়ত অভিযোগ, অভিমান, তর্ক-বিতর্ক কিংবা দোষারোপ চলে, তাঁর অনুপস্থিতিতে কেন মুখে মুখে ফিরে আসে—‘মানুষটি খুব ভালো ছিল, তার মতো মানুষ হয় না!’ তাহলে প্রশ্ন জাগে—মানুষটি কি মৃত্যুর পর বদলে যান, নাকি তাঁকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যায়?

এ প্রশ্ন শুধু একটি দাম্পত্যের নয়; এটি মানবিক উপলব্ধি, পারস্পরিক সম্পর্ক, আত্মসমালোচনা ও ভালোবাসার গভীর এক বাস্তবতা।

জীবিত মানুষের দোষ, মৃত মানুষের গুণ

সংসার মানেই দুটি ভিন্ন স্বভাব, চিন্তা, অভ্যাস, প্রত্যাশা ও অনুভূতির মানুষের একসঙ্গে পথচলা। এখানে মতের অমিল থাকবে, ভুল বোঝাবুঝি হবে, কারও আচরণে কেউ কষ্ট পাবেন—এটাই মানবজীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন জীবনসঙ্গীর ভুলকে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে না দেখে অপমানের অস্ত্র বানানো হয়; সীমাবদ্ধতাকে বোঝার চেষ্টা না করে দোষের তালিকা তৈরি করা হয়; আর ভালো কাজগুলোকে স্বাভাবিক কর্তব্য মনে করে অবহেলা করা হয়।

একজন মানুষ সংসারের জন্য কত শ্রম দেন, কত স্বপ্ন বিসর্জন দেন, কত কষ্ট নীরবে সহ্য করেন—তা অনেক সময় তাঁর কাছের মানুষটিও বুঝতে পারেন না। বরং তাঁর একটি ভুল, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কথা কিংবা একটি অপূর্ণ প্রত্যাশাই হয়ে ওঠে দীর্ঘ অভিযোগের কারণ। অথচ মানুষ কখনোই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; প্রত্যেকেরই রয়েছে কিছু দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও সংশোধনের প্রয়োজন।

কিন্তু মৃত্যু যখন চিরবিদায়ের বার্তা নিয়ে আসে, তখন অভিযোগের মানুষটি আর জবাব দিতে পারেন না, অভিমান ভাঙানোর সুযোগ থাকে না, ভুল শুধরে নেওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। তখন তাঁর অনুপস্থিতিই উপস্থিতির চেয়ে বেশি কথা বলে। সংসারের পরিচিত কণ্ঠস্বর, প্রতিদিনের সঙ্গ, ছোট ছোট সহযোগিতা, নীরব ত্যাগ এবং অজস্র স্মৃতি হৃদয়ে গভীরভাবে অনুভূত হয়।

যে মানুষটির সামান্য ভুল একসময় অসহনীয় মনে হতো, তাঁর অসংখ্য ভালো দিক তখন স্মৃতির আকাশে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মনে হয়, মানুষটি তো এত খারাপ ছিলেন না! তাঁরও তো ভালোবাসা ছিল, অবদান ছিল, মমতা ছিল, ত্যাগ ছিল!

মৃত্যুর পর কেন বদলে যায় মূল্যায়ন?

এর পেছনে রয়েছে মানুষের মনস্তত্ত্ব, স্মৃতির স্বাভাবিক প্রবণতা, অনুপস্থিতির বেদনা এবং সামাজিক রীতিনীতি। একসঙ্গে বসবাসের সময় দৈনন্দিন চাপ ও অপূর্ণ প্রত্যাশা মানুষের দোষগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই চাপ ও বিরোধের বাস্তবতা অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়; স্মৃতিতে বেশি জায়গা করে নেয় প্রিয় মুহূর্তগুলো।

কখনো অপরাধবোধ মানুষকে ভাবায়—আরেকটু ভালো ব্যবহার করলে কি পারতাম না? আরেকটু ধৈর্য ধরলে, একটু মন দিয়ে শুনলে, একটু ক্ষমা করলে হয়তো সম্পর্কটি আরও সুন্দর হতে পারত! কখনো শূন্যতা মানুষকে বুঝিয়ে দেয়, যাঁর উপস্থিতিকে একসময় খুব সাধারণ মনে হয়েছিল, তিনিই ছিলেন জীবনের অনেক বড় আশ্রয়।

তবে এটিও মনে রাখা দরকার, সব মানুষ মৃত্যুর পর একইভাবে মূল্যায়িত হন না; সব সম্পর্কের অভিজ্ঞতাও এক নয়। কারও জীবনের কষ্টকর অভিজ্ঞতা মৃত্যুর পরও থেকে যায়। তাই মৃত্যুর পর প্রশংসা করা মানেই জীবদ্দশার সব বিরোধ মিথ্যা ছিল—এমন সিদ্ধান্ত যথার্থ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি মানুষের অনুপস্থিতিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

দোষারোপ নয়, দায়িত্বশীল হোক দাম্পত্য

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু দোষারোপ যেন ভালোবাসাকে গ্রাস না করে। ভুল হলে তা নিয়ে কথা বলতে হবে, তবে অপমান করে নয়; অসন্তোষ প্রকাশ করতে হবে, তবে ব্যক্তিত্বকে আঘাত করে নয়। জীবনসঙ্গীর সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে, কিন্তু অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। ক্ষমা করতে হবে, তবে প্রয়োজনে ন্যায়সংগত সীমারেখাও বজায় রাখতে হবে।

কারণ ভালোবাসা মানে সবকিছু নীরবে সহ্য করা নয়; ভালোবাসা মানে সত্য বলা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, পরস্পরের মর্যাদা রক্ষা করা এবং সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হওয়া। স্বামী-স্ত্রী কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নন; তাঁরা জীবনের সহযাত্রী। একজনের কষ্ট অন্যজনের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেলে সংসারের বন্ধন দুর্বল হয়, আর একজনের অনুভূতি অন্যজনের কাছে মূল্য পেলে সম্পর্কের ভিত মজবুত হয়।

ইসলামের আলোকে জীবনসঙ্গীর মর্যাদা

ইসলাম দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, দয়া, সদাচরণ, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন—

“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।”
—
সূরা আর-রূম, ৩০:২১

এই আয়াত দাম্পত্যের যে আদর্শ তুলে ধরে, তা হলো—সম্পর্কের ভিত্তি হবে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া; অবজ্ঞা, অহংকার ও নিরন্তর অপমান নয়।

মহান আল্লাহ আরও বলেন—

“আর তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
—
সূরা আন-নিসা, ৪:১৯

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।”
—
জামে আত-তিরমিজি, ৩৮৯৫

অতএব, মানুষের প্রকৃত উত্তম চরিত্র শুধু বাইরের মানুষের কাছে ভালো হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার আচরণেও তার প্রমাণ থাকতে হবে। জীবনসঙ্গীর প্রতি সদাচরণ, তাঁর অধিকার রক্ষা, ভুলের ক্ষেত্রে ধৈর্য এবং পারস্পরিক সম্মান—এসবই ইসলামী জীবনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ইসলাম যেমন অন্যায় দোষারোপ ও অপমানকে সমর্থন করে না, তেমনি কোনো পক্ষের অন্যায়, জুলুম বা অধিকারহরণকেও বৈধতা দেয় না। সংসারের শান্তির নামে কারও প্রতি অবিচার মেনে নেওয়া নয়; বরং ন্যায় ও সহমর্মিতার সমন্বয়ই কাম্য।

জীবিত অবস্থায় মূল্য দিন, মৃত্যুর পর আফসোস নয়

একবার ভাবুন—যে মানুষটির সঙ্গে আজ কথা বলার সুযোগ আছে, আগামীকাল হয়তো সেই সুযোগ আর থাকবে না। যে মানুষটি আজ আপনার পাশে বসে আছেন, তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া কিংবা তাঁর কষ্টের কথা মন দিয়ে শোনা—এসবের জন্য কোনো বিশেষ দিনের অপেক্ষা কেন?

একটু প্রশংসা, সামান্য সহযোগিতা, আন্তরিক একটি প্রশ্ন কিংবা ভালোবাসার দুটি কথা অনেক সময় দীর্ঘদিনের অভিমান কমিয়ে দিতে পারে। সংসারের প্রতিটি সমস্যার সমাধান হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু আন্তরিকতা ও সম্মানের মাধ্যমে অনেক সমস্যার তীব্রতা কমানো সম্ভব।

জীবনসঙ্গীর ভালো কাজকে স্বীকৃতি দিন, তাঁর ত্যাগকে মূল্যায়ন করুন, তাঁর সীমাবদ্ধতা নিয়ে অপমান না করে গঠনমূলকভাবে কথা বলুন। নিজের ভুলও স্বীকার করুন। কারণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কেবল একজনের নয়; উভয়েরই রয়েছে নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করার দায়িত্ব।

মনে রাখবেন, মৃত্যুর পর কারও গুণের প্রশংসা করা ভালো; কিন্তু সেই প্রশংসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো জীবিত অবস্থায় তাঁর প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করা, তাঁর ভালো কাজের কদর করা এবং তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু তাঁকে দেওয়া।

উপসংহার

জীবনসঙ্গী বেঁচে থাকতে যদি তাঁর দোষই আমাদের চোখে বড় হয়ে ওঠে, আর মৃত্যুর পর তাঁর গুণাবলি স্মরণ করে চোখ ভিজে যায়, তবে আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। আমরা কি মানুষটিকে যথাযথভাবে বুঝেছিলাম? তাঁর নীরব ত্যাগের মূল্য দিয়েছিলাম? তাঁর ভুলের পাশাপাশি তাঁর ভালো দিকগুলোও দেখেছিলাম? নাকি অভিমান, অহংকার, অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও পারস্পরিক দোষারোপের ভিড়ে ভালোবাসার মানুষটিকেই অবহেলা করেছিলাম?

মানুষের মৃত্যু অনিবার্য; কিন্তু মৃত্যুর আগেই সম্পর্কের মৃত্যু ঘটতে দেওয়া উচিত নয়। একই ছাদের নিচে থেকেও যেন কেউ একাকী, অবহেলিত কিংবা অসম্মানিত বোধ না করেন। জীবনসঙ্গীর উপস্থিতিকে অভ্যাস ভেবে অবমূল্যায়ন না করে নিয়ামত হিসেবে উপলব্ধি করতে শিখতে হবে। কারণ হারিয়ে যাওয়ার পর শূন্যতা অনুভব করার চেয়ে পাশে থাকতে ভালোবাসা প্রকাশ করা অনেক বেশি মূল্যবান।

হে মহান আল্লাহ! আমাদের দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, সম্মান, ধৈর্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তাওফিক দিন। অহংকার, অবহেলা, অন্যায় দোষারোপ ও জুলুম থেকে আমাদের রক্ষা করুন। জীবিত অবস্থায় একে অপরের মর্যাদা বুঝতে, ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে এবং ন্যায়সংগতভাবে অধিকার আদায় করতে সাহায্য করুন। মৃত্যুর পর শুধু আফসোস নয়, জীবিত অবস্থায়ই যেন ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি—সেই তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ