Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১৩ অপরাহ্ণ

মানুষ আসলে এক বিস্ময়ের নাম


মানুষ আসলে এক বিস্ময়ের নাম!


খুব ছোটবেলা থেকেই পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন আর বইপত্র পড়ার সুযোগ হয়েছে। ঠিক কত ছোটবেলা থেকে, তা আজ আর মনে করতে পারি না। তবে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই প্রতিদিন পত্রিকা পড়ার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিল বলে মনে হয়। সেই থেকে একটু একটু করে পৃথিবীকে চেনা, পৃথিবীর মানুষকে জানা, মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর অসংখ্য বিস্ময়কর গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়া।

সময় যত গড়িয়েছে, পড়ার পরিধি যত বেড়েছে, ততই মনে হয়েছে—এই পৃথিবী বড় বিচিত্র! এখানে কত মানুষ কত কিছু নিয়েই বেঁচে থাকে। কারও জীবনে প্রাচুর্য আছে, কারও জীবনে অভাব। কেউ সুস্থ শরীরে পৃথিবীটাকে আপন করে পায়, আবার কেউ জন্ম থেকেই কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেলে শরীরের অমূল্য কোনো অঙ্গ। কারও হাত নেই, কারও পা নেই, কেউ চোখে দেখতে পান না। কারও দুটি হাত-পা কোনোটিই নেই। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই মানুষগুলোর মধ্য থেকেই কেউ কেউ এমন অসাধারণ সাফল্যের গল্প লেখেন, যা আমাদের মতো সুস্থ-সবল মানুষদেরও নতুন করে ভাবতে শেখায়।

পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা ইন্টারনেটের ছবিতে যখন তাঁদের দেখি, তখন সত্যিই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। বিশেষ করে প্যারালিম্পিক গেমসের দৃশ্যগুলো! পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো যখন প্রতিযোগিতার মাঠে নামেন, তখন সেখানে শুধু খেলা হয় না—সেখানে লড়াই হয় স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার, ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে প্রতিকূলতার, আর নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যাওয়ার।

কারও দুটি পা নেই, অথচ তিনি দৌড়াচ্ছেন। কারও হাত নেই, অথচ তিনি সাঁতরে চলেছেন জলের বুক চিরে। কেউ চোখে দেখতে পান না, অথচ তাঁর লক্ষ্যভেদে বিস্মিত হয় পৃথিবী। কেউ আবার হুইলচেয়ারে বসেই এমন গতিতে এগিয়ে যান, যেন পৃথিবীর সমস্ত বাধাকে পেছনে ফেলে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন। তাঁদের কেউ যখন সোনার পদক গলায় পরেন, তখন সেই পদকটি কি শুধুই সোনার তৈরি একটি ধাতব বস্তু থাকে? আমার মনে হয়, না। সেই পদকের প্রতিটি ঝিলিকে মিশে থাকে কত রাতের কান্না, কত দিনের পরিশ্রম, কতবার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়ানোর গল্প, আর বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্নের পূর্ণতা।

হয়তো কোনো একদিন কেউ তাঁকে বলেছিল, ‘তুমি পারবে না।’ হয়তো তাঁকে করুণার চোখে দেখেছে পৃথিবী। হয়তো কত মানুষ তাঁর সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ করেছে। অথচ একদিন সেই মানুষটিই যখন বিজয়ের মঞ্চে দাঁড়ান, তখন তাঁর সাফল্যের সামনে পৃথিবীর সমস্ত অবিশ্বাস যেন নীরবে মাথা নত করে।

ভাবতে অবাক লাগে, আমরা যাঁরা দুটি হাত, দুটি পা, দুটি চোখ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি, তাঁরাই কত সামান্য বাধায় থেমে যাই! একটু ব্যর্থতা এলে হতাশ হই, একটু প্রতিকূলতা এলে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিই। অথচ যাঁদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, তাঁরাই কখনো কখনো আমাদের শিখিয়ে দেন—জীবন মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, জীবন মানে বারবার ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়ানো। জীবন মানে হারিয়ে যাওয়া সামর্থ্যের জন্য সারাজীবন কাঁদা নয়, বরং যা আছে, তা নিয়েই অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করা।

তাঁদের দিকে তাকালে আমার মনে হয়, মানুষকে বিচার করার জন্য তার শরীরের দিকে তাকানোর চেয়ে তার স্বপ্নের দিকে তাকানো অনেক বেশি জরুরি। তার হাত-পা কতটা সক্ষম, তার চোখ কতটা দেখতে পায়—সেটা হয়তো জীবনের একটা বাস্তবতা; কিন্তু তার মন কতটা দৃঢ়, তার স্বপ্ন কতটা গভীর, আর সে কতটা দূর যেতে চায়—সেখানেই লুকিয়ে থাকে মানুষের প্রকৃত পরিচয়।

পৃথিবী বড় অদ্ভুত! কখনো কখনো যাঁদের আমরা অসহায় ভাবি, তাঁরাই আমাদের সবচেয়ে বড় সাহসের উৎস হয়ে ওঠেন। যাঁদের দিকে আমরা করুণার চোখে তাকাই, তাঁরাই একদিন আমাদের চোখে জল এনে দেন—দুঃখের নয়, গভীর শ্রদ্ধা আর আনন্দের জল।

সত্যিই, তাঁদের সাফল্য দেখে বারবার মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা কাউকে হয়তো কিছু দেননি, কিন্তু মানুষ নিজের ভেতরে এমন এক শক্তি নিয়ে জন্মায়, যার গভীরতা আমরা অনেক সময় কল্পনাও করতে পারি না।

তাই আজকাল কাউকে দেখলে তাঁর সীমাবদ্ধতা দিয়ে বিচার করতে ইচ্ছে করে না। বরং ভাবি, এই মানুষটির ভেতরেও হয়তো এমন কোনো স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে, যা একদিন পৃথিবীকে বিস্মিত করবে।

সত্যিই, মানুষ এক বিস্ময়ের নাম। শরীরের কিছু অঙ্গ হারিয়েও মানুষ জয় করতে পারে পৃথিবী; কিন্তু স্বপ্ন দেখার সাহস হারিয়ে ফেললে, সুস্থ-সবল শরীর নিয়েও মানুষ অনেক সময় নিজের কাছেই হেরে যায়।

পৃথিবীর এই অসাধারণ মানুষগুলোর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা। তাঁরা শুধু নিজেদের জয় করেন না, তাঁরা আমাদেরও শিখিয়ে যান—জীবনকে ভালোবাসতে, স্বপ্ন দেখতে, আর কোনো প্রতিকূলতার কাছেই সহজে হার না মানতে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ