Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:২৯ পূর্বাহ্ণ

পুরুষ নির্যাতন: নীরব কান্না লেখক: -মোঃ মুজিবুর রহমান

পুরুষ নির্যাতন: নীরব কান্না

লেখক: মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

নির্যাতনের কোনো লিঙ্গ নেই, কান্নার কোনো পরিচয় নেই, আর অন্যায়ের শিকার হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। নারী যেমন নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, তেমনি পুরুষও পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। অথচ সমাজের প্রচলিত ধারণায় পুরুষকে প্রায়ই শক্তিশালী, সহনশীল ও সব পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে তাঁর কষ্ট, অপমান, অসহায়ত্ব ও নীরব কান্না অনেক সময় মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

একজন পুরুষও রক্তমাংসে গড়া মানুষ; তাঁরও অনুভূতি আছে, আত্মসম্মান আছে, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজন আছে। সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হতে পারেন, অপমানিত হয়ে ভেঙে পড়তে পারেন, প্রিয়জনের আচরণে গভীরভাবে আহত হতে পারেন। কিন্তু সামাজিক লোকলজ্জা, পুরুষত্ব নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা এবং অবিশ্বাসের আশঙ্কায় অনেকেই নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন না। তাই পুরুষ নির্যাতনকে উপেক্ষা না করে মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও ইসলামের নৈতিক শিক্ষার আলোকে বিষয়টি উপলব্ধি করা জরুরি।

পুরুষ নির্যাতন বলতে কী বোঝায়?

কোনো পুরুষের প্রতি শারীরিক আঘাত, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অপমান, মানসিক চাপ সৃষ্টি, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক শোষণ কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মতো আচরণ যখন তাঁর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, মর্যাদা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন পরিস্থিতি ও ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী তা নির্যাতনের পর্যায়ে পড়তে পারে।

এ ধরনের নির্যাতন শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবার, আত্মীয়স্বজন, কর্মক্ষেত্র কিংবা সমাজের অন্যান্য সম্পর্কেও ঘটতে পারে। তবে পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক সময় গভীর হয়, কারণ যে মানুষটির কাছ থেকে একজন ব্যক্তি ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মানসিক আশ্রয় প্রত্যাশা করেন, সেই মানুষের আচরণ থেকেই যখন কষ্ট আসে, তখন তা সহজে কাটিয়ে ওঠা যায় না।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, মতবিরোধ, সাময়িক রাগ, পারিবারিক ঝগড়া কিংবা যুক্তিসংগত অভিযোগের সবকিছুকেই নির্যাতন বলা যায় না। আচরণের ধরন, পুনরাবৃত্তি, উদ্দেশ্য, প্রভাব এবং ঘটনার প্রমাণ বিবেচনা করে বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হয়। ন্যায়বিচারের স্বার্থে যেমন নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি যথাযথ যাচাই ছাড়া কাউকে নির্যাতনকারী হিসেবেও চিহ্নিত করা উচিত নয়।

পুরুষ নির্যাতনের বিভিন্ন রূপ

১. মানসিক নির্যাতন ও আত্মসম্মানে আঘাত

শারীরিক আঘাতের ক্ষত চোখে দেখা যায়, কিন্তু মানসিক আঘাতের ক্ষত অনেক সময় অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকে। বারবার অপমান করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, অন্যের সামনে হেয় করা, ব্যক্তিত্ব নিয়ে কটূক্তি করা, পুরুষত্ব নিয়ে বিদ্রূপ করা কিংবা প্রতিনিয়ত অযোগ্য বলে মনে করানো একজন পুরুষের আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে দিতে পারে।

বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনে যখন জীবনসঙ্গী পরস্পরের অনুভূতি ও সীমাবদ্ধতাকে সম্মান না করে কটুবাক্য, অবজ্ঞা কিংবা অপমানজনক আচরণ করেন, তখন ভালোবাসার সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ হতাশা, নিদ্রাহীনতা, উদ্বেগ কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হতে পারেন।

কথার আঘাত সব সময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তার প্রভাব গভীর হতে পারে। তাই সুন্দর সম্পর্ক গড়তে হলে কথার মধ্যে কোমলতা, আচরণে সম্মান এবং মতবিরোধের মধ্যেও সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন।

২. শারীরিক নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতা

পুরুষের শরীর শক্তিশালী—এমন ধারণা থেকে কেউ কেউ মনে করেন, পুরুষকে আঘাত করলে তা তেমন গুরুতর বিষয় নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুরুষও শারীরিক আঘাতে আহত হন, ভয় পান এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

মারধর, বস্তু নিক্ষেপ করে আঘাত করা, আটকে রাখা কিংবা অন্য কোনোভাবে শারীরিক নিরাপত্তা বিপন্ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্যাতনকারীর পরিচয় নারী না পুরুষ, স্বামী না স্ত্রী, আত্মীয় না অপরিচিত—তা দিয়ে অন্যায়ের প্রকৃতি বদলে যায় না।

কোনো পুরুষ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে তাঁকে লজ্জা না পেয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়া, বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা ও আইনগত প্রতিকার গ্রহণ করা উচিত।

৩. আর্থিক নির্যাতন ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

পরিবারের ভরণপোষণ ও প্রয়োজন পূরণে অনেক পুরুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করেন। কেউ চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা করেন, কেউ দিনরাত শ্রম দিয়ে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর উপার্জনকে জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করা, প্রয়োজনীয় অর্থ থেকে বঞ্চিত করা, ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করা কিংবা আর্থিক বিষয়ে অবমাননাকর আচরণ করা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অন্যদিকে, পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব ভাগাভাগি করার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আলোচনা ও ন্যায়সংগত সমঝোতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়, ব্যয়, ঋণ, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ সঞ্চয়—সব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকলে ভুল বোঝাবুঝি কমে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা নিজে কোনো নির্যাতন নয়। একইভাবে স্বামী বা স্ত্রীর ন্যায্য প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা করাও নির্যাতন নয়। কিন্তু অর্থকে ভয় দেখানো, অপমান করা বা অন্যকে অসহায় করে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

৪. মিথ্যা অভিযোগ ও সামাজিক অপমান

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে; আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে নির্দোষ ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

কোনো পুরুষকে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসম্মানজনক প্রচারণা চালানো কিংবা যাচাই না করা তথ্যের মাধ্যমে তাঁর সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা অন্যায় হতে পারে।

তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা সামাজিক প্রচারণার নয়; বরং নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা নির্ধারিত হওয়া উচিত। একই নীতি নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

৫. সন্তানকে কেন্দ্র করে মানসিক চাপ

সন্তান বাবা-মা উভয়ের কাছেই গভীর ভালোবাসা ও আবেগের বিষয়। দাম্পত্য বিরোধের সময় সন্তানকে অন্য অভিভাবকের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করা, যোগাযোগে অযৌক্তিক বাধা সৃষ্টি করা কিংবা সন্তানকে প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বাবার যেমন সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা রয়েছে, তেমনি মায়েরও রয়েছে। তাই দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েনের দায় সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। সন্তানের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও মানসিক স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

কেন পুরুষ নির্যাতনের কথা আড়ালে থেকে যায়?

পুরুষ নির্যাতনের একটি বড় বাধা হলো সমাজের প্রচলিত মানসিকতা। অনেকেই মনে করেন, পুরুষ কাঁদবেন না, দুর্বলতা প্রকাশ করবেন না, সব অপমান নীরবে সহ্য করবেন। অথচ মানুষ হিসেবে তাঁরও কষ্ট পাওয়ার অধিকার আছে, সহায়তা চাওয়ার অধিকার আছে এবং অন্যায় থেকে মুক্ত থাকার অধিকার আছে।

অনেকে ভাবেন, নির্যাতনের কথা প্রকাশ করলে মানুষ তাঁকে দুর্বল বলবে। কেউ আবার সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় মুখ খোলেন না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সম্মান কিংবা সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন নীরবে কষ্ট সহ্য করেন।

কিন্তু নীরবতা সব সময় সমস্যার সমাধান নয়। কখনো কখনো দীর্ঘদিনের অব্যক্ত কষ্ট মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, পারিবারিক সম্পর্ককে বিষিয়ে দেয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কঠিন করে তোলে। তাই নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি।

ইসলামের দৃষ্টিতে নির্যাতন ও মানবিক মর্যাদা

ইসলাম ন্যায়বিচার, দয়া, সদাচরণ, আমানতদারি ও মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। ইসলামি নৈতিকতার আলোকে কাউকে তার দুর্বলতা, অসহায়ত্ব কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে অপমান করা সমর্থনযোগ্য নয়। নারী ও পুরুষ উভয়েই আল্লাহর সৃষ্টি; প্রত্যেকের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়সংগত অধিকার রক্ষা করা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন—

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন নিষেধ করেন।”
—
সুরা আন-নাহল, আয়াত ৯০-এর ভাবার্থ।

এই আয়াতের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায় ও সদাচরণ শুধু ইবাদতের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; পারিবারিক ও সামাজিক আচরণেও তার বাস্তব প্রয়োগ থাকা প্রয়োজন।

দাম্পত্য জীবনের বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—

“আর তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
—
সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৯-এর ভাবার্থ।

এই নির্দেশ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে সদাচরণ, দায়িত্বশীলতা ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরে। দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ থাকতে পারে, চাহিদার পার্থক্য থাকতে পারে, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা পারিবারিক চাপও থাকতে পারে। কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান অপমান, হুমকি, প্রতিশোধ কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে নয়; বরং ন্যায়সংগত আলোচনা, ধৈর্য, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে খুঁজতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।”
—
জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫।

এই হাদিসের শিক্ষা হলো, মানুষের উত্তম চরিত্রের অন্যতম প্রকাশ ঘটে তার পারিবারিক আচরণে। তাই একজন পুরুষের দায়িত্ব যেমন স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সদাচরণ করা, তেমনি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও তাঁর প্রতি সম্মানজনক ও ন্যায়সংগত আচরণ করা উচিত।

ইসলাম ধৈর্যের শিক্ষা দেয়, কিন্তু ধৈর্য মানে অন্যায়ের অনুমোদন নয়। ক্ষমা মহৎ গুণ, কিন্তু ক্ষমার কথা বলে নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়া যায় না। একইভাবে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে প্রতিশোধ, অপবাদ কিংবা সীমালঙ্ঘনও গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে প্রমাণ, সংযম ও শরিয়তের নীতির আলোকে।

পরিবার মানুষের প্রথম আশ্রয়স্থল। এই আশ্রয় যদি অপমান, ভয় ও অবিশ্বাসের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে মানুষের মানসিক প্রশান্তি নষ্ট হয়ে যায়। তাই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উচিত একে অন্যের অনুভূতি, সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করা।

স্বামীকে বুঝতে হবে, সংসারের দায়িত্ব পালনে স্ত্রীর শ্রম, ত্যাগ ও মানসিক চাহিদার গুরুত্ব রয়েছে। একইভাবে স্ত্রীকেও বুঝতে হবে, স্বামীর ওপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের চাপ থাকতে পারে; তাঁরও বিশ্রাম, সম্মান, স্নেহ ও মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন।

পরিবারে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলে একে অপরকে দোষারোপ না করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা দরকার। মতবিরোধ দেখা দিলে সন্তানদের সামনে অপমানজনক বাক্য ব্যবহার না করে শান্তভাবে আলোচনা করা উচিত। কোনো সমস্যা জটিল হয়ে উঠলে বিশ্বস্ত, বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

মানসিক সুস্থতা ও সহায়তা গ্রহণ

পুরুষ নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর মানসিক কষ্টকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। দীর্ঘদিনের অপমান, ভয়, অনিশ্চয়তা ও পারিবারিক অশান্তি মানুষের ঘুম, মনোযোগ, কর্মক্ষমতা এবং সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ অবস্থায় বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সহানুভূতিশীল সদস্য, প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং নিজের নিরাপত্তা ও সুস্থতার প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

ধর্মীয় অনুশীলন, দোয়া, ইবাদত ও আত্মসংযম মানসিক শক্তি জোগাতে সহায়ক হতে পারে। তবে গুরুতর মানসিক কষ্ট বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পেশাগত সহায়তাও গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার পাশাপাশি বৈধ ও বাস্তবসম্মত উপায় অবলম্বন করাও দায়িত্বশীলতার অংশ।

উপসংহার

পুরুষ নির্যাতন কোনো হাসি-তামাশার বিষয় নয়; এটি মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পারিবারিক শান্তি ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। একজন পুরুষ যখন পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন, দায়িত্বের ভার বহন করেন কিংবা আপনজনের সুখের জন্য নিজের অনেক চাওয়া বিসর্জন দেন, তখন তাঁরও প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান, সহমর্মিতা ও মানসিক আশ্রয়। তাঁর সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিদ্রূপ নয়, প্রয়োজন সহযোগিতা; তাঁর কষ্টকে অস্বীকার নয়, প্রয়োজন মনোযোগ দিয়ে শোনা।

তবে এই আলোচনার উদ্দেশ্য নারীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো নয়, কিংবা পুরুষের প্রতিটি অভিযোগকে যাচাই ছাড়াই সত্য বলে ধরে নেওয়াও নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হলো—অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো, অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা এবং পরিবারে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা।

ইসলামের ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও মানবিকতার শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শক্তি মানে কাউকে দমন করা নয়, দায়িত্ব মানে কারও অনুভূতিকে অস্বীকার করা নয়, আর ধৈর্য মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। নারী-পুরুষ উভয়েই সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অধিকারী। তাই আসুন, অপমানের পরিবর্তে সম্মান, নির্যাতনের পরিবর্তে সহমর্মিতা, প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচার এবং অবিশ্বাসের পরিবর্তে দায়িত্বশীল বোঝাপড়ার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজকে সুন্দর করে তুলি।

হে মহান আল্লাহ! আমাদের পরিবারগুলোকে জুলুম, নির্যাতন, অবিচার ও অশান্তি থেকে রক্ষা করুন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক নির্যাতিত মানুষকে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানসিক প্রশান্তি দান করুন। আমাদের অন্তরে দয়া, আচরণে ন্যায়, কথায় সংযম এবং পারস্পরিক সম্পর্কে ভালোবাসা ও সম্মান প্রতিষ্ঠার তাওফিক দিন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ