Loading..

ব্লগ

রিসেট

২০ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:৩৪ অপরাহ্ণ

প্রতিদানের বদলা ✍️*লেখা–Khalid Muhammad Saifullah*

প্রতিদানের বদলা

✍️*লেখা–Khalid Muhammad Saifullah*

 

প্রথম বেতন হাতে পাওয়ার সময় আমার বয়স ছিল তেইশ বছর। বাবা আমাকে বললেন, “প্রতি মাসে আমাকে একশ টাকা করে পাঠাবে।” আমি বললাম, “কেন, বাবা?”

 

তিনি বললেন, “তোমাকে মানুষ করার খরচ।”

 

আমি হাসলাম। কিন্তু বাবা হাসলেন না।

 

সেই দিন থেকে প্রতি মাসের সাতাশ তারিখে, বেতন জমা হওয়ার পর, আমি বাবাকে একশ টাকা পাঠাই। আর টাকা পাঠানোর সময় বিবরণে লিখি—‘প্রতিপালনের মূল্য’।

 

প্রতিবার বাবা উত্তর দেন, “পেয়েছি। আল্লাহ তোমার রিজিকে বরকত দিন।”

 

এর বেশি একটি কথাও বলেন না।

 

অবিবাহিত থাকাকালেও টাকা পাঠিয়েছি। বিয়ের মাসেও পাঠিয়েছি, যখন ঋণের বোঝায় আমি জর্জরিত। আমার ছেলের জন্মের মাসেও পাঠিয়েছি—যে মাসে আমার ব্যাংক হিসাবে অবশিষ্ট ছিল মাত্র একশ চল্লিশ টাকা।

 

আমার স্ত্রী ও বন্ধুরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, বাবা এই একশ টাকা দিয়ে কী করেন?

 

আমি বলতাম, “বাবা এমনই। তাঁর কিছু নিজস্ব স্বভাব আছে।”

 

একবার টাকা পাঠাতে এক দিন দেরি হয়ে গেল। পরদিন সকাল সাতটায় বাবা ফোন করে বললেন, “তোমার কোনো বিপদ হয়নি তো?”

 

আমি হেসে হেসে টাকা পাঠালাম আর মনে মনে বললাম, লোকটা টাকাপয়সার ব্যাপারে সত্যিই ভীষণ হিসাবি!

 

এভাবে বারো বছর কেটে গেল।

 

তিন মাস আগে কোম্পানি আমাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করল। কাউকে জানালাম না, এমনকি স্ত্রীকেও নয়।

 

প্রতিদিন সকাল সাতটায় পোশাক পরে বাড়ি থেকে বের হতাম। দুপুর পর্যন্ত একটি ক্যাফের কাছে গাড়িতে বসে থাকতাম। তারপর এমনভাবে বাড়ি ফিরতাম, যেন অফিস থেকে ফিরছি।

 

একদিন সাতাশ তারিখ এল। কিন্তু সেদিন বেতন জমা হলো না।

 

বারো বছরের মধ্যে এই প্রথম বাবাকে কিছু পাঠাতে পারলাম না।

 

রাতের খাবারের পর ফোন বেজে উঠল। বাবা ফোন করেছেন।

 

তিনি বললেন, “আমার কাছে তো কিছু এসে পৌঁছায়নি।”

 

আমি বললাম, “ভুলে গেছি, বাবা। ইনশা আল্লাহ, কাল পাঠিয়ে দেব।”

 

কিছুক্ষণ নীরব থেকে বাবা বললেন, “এখনই চলে এসো। আমি অপেক্ষা করছি।”

 

বাবার বৈঠকখানায় ঢুকে দেখলাম, তিনি বসে আছেন। সামনে একটি পুরোনো খাতা আর একটি খাম।

 

তিনি খাতাটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, “খোলো।”

 

খাতার প্রতিটি লাইনে একটি তারিখ, একশ টাকার হিসাব আর আমার নাম লেখা। আর প্রতিটি হিসাবের পাশে উল্লেখ করা—টাকাটি কোথায় ব্যয় করা হয়েছে।

 

কোথাও লেখা, ‘এতিমের ভরণপোষণ’; কোথাও, ‘রমজানের খাদ্যসামগ্রী’; আবার কোথাও, ‘শ্রমিকদের পানির ব্যবস্থা’।

 

এভাবে মোট একশ চুয়াল্লিশটি হিসাব।

 

বাবা বললেন, “তোমার পাঠানো একটি টাকাও আমার পকেটে ঢোকেনি।”

 

এরপর তিনি আমাকে একটি পানির কুলারের ছবি দেখালেন। একটি মসজিদের পাশে স্থাপন করা হয়েছে সেটি। কুলারের গায়ে ছোট্ট একটি ফলকে লেখা—

 

‘আমার সন্তানের পক্ষ থেকে সদকা। আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন।’

 

আমি সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলাম।

 

এ তো সেই পানির কুলার, যেখান থেকে আমি প্রতিদিন দুপুরে পানি পান করতাম!

 

কত বছর ধরে বাবার পক্ষ থেকে আমার নামে করা সদকার পানি পান করে এসেছি, অথচ কিছুই জানতাম না।

 

এরপর বাবা খামটি আমার হাতে দিলেন।

 

খাম খুলে দেখি, তার ভেতরে বাহাত্তর হাজার টাকা।

 

বাবা বললেন, “তোমার প্রথম বেতন পাওয়ার পর থেকেই প্রতি মাসে আমি এখানে পাঁচশ টাকা করে জমিয়েছি। মনে মনে ভাবতাম, একদিন এমন সময় আসবে, যেদিন তুমি আমাকে টাকা পাঠাতে পারবে না। আর সেদিন তোমার আমার সাহায্যের প্রয়োজন হবে।”

 

আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না।

 

বাবা বললেন, “আমি কোনো দিনই ওই একশ টাকা চাইনি। আমি শুধু প্রতি মাসে নিশ্চিত হতে চেয়েছি যে তুমি ভালো আছ।”

 

দুই মাস পর আমি নতুন একটি চাকরি পেলাম।

 

এরপর প্রথম সাতাশ তারিখেই বাবাকে একশ টাকা পাঠালাম। বিবরণে লিখলাম—‘প্রতিপালনের মূল্য’।

 

বাবা উত্তর দিলেন, “পেয়েছি। আল্লাহ তোমার রিজিকে বরকত দিন।”

 

এক মিনিট পর তাঁর আরেকটি বার্তা এল— “এরপর থেকে আর কখনো আমার কাছে কিছু লুকাবে না।”

মন্তব্য করুন

ব্লগ