Loading..

ব্লগ

রিসেট

২০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:০৪ পূর্বাহ্ণ

বিরোধিতার কালো মেঘ, প্রতিকূলতার ঝড় ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম -মোঃ মুজিবুর রহমান


বিরোধিতার কালো মেঘ, প্রতিকূলতার ঝড় ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম

মোঃ মুজিবুর রহমান সহকারী অধ্যাপক মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানবজীবন কখনো শান্ত নদীর মতো প্রবাহিত হয়, আবার কখনো উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ে বিপর্যস্ত হয়। কখনো চারপাশে আশার আলো জ্বলে ওঠে, কখনো বিরোধিতা, শত্রুতা, অবহেলা, অপবাদ ও নানা প্রতিকূলতার কালো মেঘ এসে জীবনের আকাশ ঢেকে দেয়। মানুষ তখন আশ্রয় খোঁজে, একটু স্বস্তি চায়, বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে চায়। কিন্তু এক বিপদ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই যখন আরেকটি ঝড় এসে আঘাত হানে, তখন তার সাহস ভেঙে পড়ে, মন ক্লান্ত হয়ে যায়, আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। তবু জীবনের অদৃশ্য এক আহ্বান তাকে বারবার বলে—থেমে যেয়ো না, এখনো তোমার পথচলা বাকি।

বিরোধিতার কালো মেঘে অসহায় হৃদয়ের আর্তনাদ

হে আমার প্রতিপালক! যখন বিরোধিতার কালো মেঘ আমার জীবনের আকাশে ঘনিয়ে আসে, যখন মানুষের শত্রুতা ও অবিচারের ভারে আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, তখন তোমার কাছেই আশ্রয় চাই। তুমি আমাকে রক্ষা করো, বিপদের অন্ধকারে পথ দেখাও, ভেঙে পড়া মনকে আবার সাহস দাও।

কিন্তু হে প্রভু! আমি তো মানুষ—আমারও ভয় হয়, বুক কাঁপে, চোখে অশ্রু আসে। কখনো প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। তোমার ওপর ভরসা রেখেও মানুষের আচরণে আমি ব্যথিত হই, অন্যায়ের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হই, অবিরাম সংগ্রামের চাপে কখনো দুর্বল হয়ে পড়ি।

একটি বিপদ থেকে যখন একটু স্বস্তি পাই, তখনই যেন অন্য দিক থেকে আরেকটি তীব্র ঝড় এসে আঘাত করে। যে ক্ষত শুকাতে শুরু করেছিল, সেখানে আবার নতুন আঘাত লাগে। যে হৃদয় একটু শান্তি খুঁজছিল, সেখানে আবার অস্থিরতা ফিরে আসে। মনে হয়, চারপাশের প্রতিকূলতা যেন আমাকে বারবার মাটিতে নামিয়ে দিতে চায়। আমি উঠে দাঁড়াতে চাই, অথচ নতুন কোনো আঘাত এসে আমার দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও কেড়ে নিতে উদ্যত হয়।

তবু বিস্ময়করভাবে আমি বেঁচে থাকি, আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, নতুন করে পথ চলার স্বপ্ন দেখি। হয়তো আমার শক্তি সীমিত, সামর্থ্য অল্প, কিন্তু আমার রবের রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি জানি, আমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটি অশ্রুবিন্দু এবং প্রতিকূলতার মধ্যে ধৈর্য ধারণের প্রতিটি প্রচেষ্টা আল্লাহর অজানা নয়।

দুর্বলকে আঘাত করার নিষ্ঠুর বাস্তবতা

পৃথিবীর একটি নির্মম বাস্তবতা হলো, অনেক সময় দুর্বল মানুষের সরলতা, নীরবতা ও অসহায়ত্বকে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। যে মানুষটি কাউকে কষ্ট দিতে চায় না, তাকেই কখনো অন্যের কষ্টের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যে মানুষটি বিরোধ এড়িয়ে চলতে চায়, তাকেই বারবার বিরোধের কেন্দ্রে ঠেলে দেওয়া হয়। যে মানুষটি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে, তার সীমাবদ্ধতাকেই কখনো উপহাসের বিষয় বানানো হয়।

কখনো বড় প্রতিপক্ষের আঘাত সামলে উঠতে না উঠতেই ছোট কেউ এসে অবজ্ঞা করে, অপমান করে কিংবা দুর্বলতার সুযোগ নেয়। যেন বড় ঝড়ের পর ছোট ছোট ঢেউও এসে বিপর্যস্ত মানুষটিকে আরও অসহায় করে তুলতে চায়। এখানে ব্যাঙের লাথির উপমাটিও একটি গভীর জীবনবাস্তবতার প্রতীক—যে মানুষ ইতিমধ্যে আঘাতে জর্জরিত, তার ওপরও কখনো এমন কেউ আঘাত হানে, যার কাছ থেকে সে অন্তত সহমর্মিতা প্রত্যাশা করেছিল।

তবে এই বাস্তবতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন: দুর্বল হওয়া মানেই মূল্যহীন হওয়া নয়, নীরব থাকা মানেই পরাজিত হওয়া নয়, আর সহনশীল হওয়া মানেই অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়।

ইসলাম মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়, কিন্তু অপমানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শেখায় না। ক্ষমাশীল হতে উৎসাহিত করে, কিন্তু ন্যায়বিচারের পথ বন্ধ করে দেয় না। ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দেয়, কিন্তু নিজের অধিকার রক্ষার বৈধ প্রচেষ্টাকে নিষিদ্ধ করে না।

জীবন যখন নিরন্তর সংগ্রামের নাম

জীবন মানেই শুধু সুখ, স্বস্তি ও সাফল্যের সমাহার নয়; জীবনে দায়িত্ব আছে, পরীক্ষা আছে, ব্যর্থতা আছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন আছে এবং কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজনও আছে। প্রত্যেক মানুষই তার সামর্থ্য, পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কোনো না কোনো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করব। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”

—আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৫।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, দুনিয়ার জীবনে প্রতিকূলতা আসতে পারে এবং সেই প্রতিকূলতার মুখে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। তবে প্রতিটি দুঃখের কারণ আমরা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে পারি না; সব কষ্টকে কোনো নির্দিষ্ট পাপের শাস্তি কিংবা বিশেষ মর্যাদার নিশ্চিত প্রমাণ বলাও ঠিক নয়।

জীবনের সংগ্রাম তাই কেবল অন্যকে পরাজিত করার লড়াই নয়। এটি নিজের ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করার সংগ্রাম, হতাশার মধ্যেও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখার সংগ্রাম, অন্যায়ের সামনে ন্যায়নিষ্ঠ থাকার সংগ্রাম এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের মানবিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার সংগ্রাম।

যে মানুষ বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, সে শুধু বাইরের প্রতিকূলতার সঙ্গেই লড়াই করে না; সে নিজের ভেতরের হতাশা, ভয় ও অসহায়ত্বের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করে।

আল্লাহর ওপর ভরসা: দুর্বল হৃদয়ের প্রকৃত আশ্রয়

মানুষের শক্তি সীমিত, কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতা অসীম। মানুষের পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে, পরিচিতজন মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, আপনজনের আচরণেও হৃদয় ভেঙে যেতে পারে। তবু একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর রহমত, প্রজ্ঞা ও সাহায্যের আশা কখনো নিঃশেষ হয়ে যায় না।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।”

—আল-কুরআন, সূরা আত-তালাক, আয়াত ৩।

আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং সঠিক পথ বেছে নেওয়া, প্রয়োজনীয় চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, নিজের ভুল সংশোধন করা, ন্যায়সংগত উপায়ে অধিকার রক্ষা করা এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুলের শিক্ষা।

কখনো মানুষের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে হয়, কখনো অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নিতে হয়, কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হয়। এসব প্রচেষ্টা আল্লাহর ওপর ভরসার বিরোধী নয়। বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে আল্লাহর সাহায্য কামনা করাই একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্বশীল আচরণ।

হে আল্লাহ! আমি যখন ভয়ে দুর্বল হয়ে পড়ি, তখন আমাকে সাহস দাও। যখন অন্যায়ের আঘাতে মন ভেঙে যায়, তখন আমাকে ন্যায় ও সত্যের পথে অবিচল রাখো। যখন চারপাশের মানুষ আমাকে অবহেলা করে, তখন নিজের মর্যাদা ও আত্মসম্মান রক্ষা করার প্রজ্ঞা দাও। আর যখন কোনো পথ খুঁজে পাই না, তখন সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দাও।

ধৈর্য মানে নীরবে সবকিছু সহ্য করা নয়

ধৈর্য এমন একটি মহৎ গুণ, যা মানুষকে বিপদের মুখে স্থির থাকতে শেখায়। কিন্তু ধৈর্যের অর্থ এই নয় যে, কেউ অন্যায় করবে আর আমি প্রতিবার নীরবে তা মেনে নেব। কেউ আমার অধিকার নষ্ট করবে আর আমি প্রতিকার চাইব না। কেউ আমার সরলতার সুযোগ নেবে আর আমি আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব না।

ইসলাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হিসেবে; যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা অথবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।”

—আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৩৫।

অতএব, প্রতিকূলতার মোকাবিলায় আবেগের চেয়ে প্রজ্ঞাকে, প্রতিশোধের চেয়ে ন্যায়বিচারকে এবং উত্তেজনার চেয়ে সংযমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারও অন্যায়ের জবাবে নিজে অন্যায় করা যাবে না। নিজের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের অধিকার নষ্ট করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

যেখানে ক্ষমা সম্পর্ককে সুন্দর করতে পারে, সেখানে ক্ষমা মহৎ। যেখানে আলোচনা ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে পারে, সেখানে আলোচনা প্রয়োজন। আর যেখানে বারবার অপমান, প্রতারণা কিংবা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, সেখানে যথাযথ সীমারেখা তৈরি করা, দূরত্ব বজায় রাখা এবং ন্যায়সংগত সহায়তা নেওয়াও প্রজ্ঞার পরিচয়।

নিজেকে রক্ষা করা অহংকার নয়; অন্যায়ের প্রতিবাদ করা শত্রুতা নয়; আর ন্যায়বিচার চাওয়া প্রতিশোধপরায়ণতা নয়।

দুর্বলতা থেকে শক্তিতে ফিরে আসার পথ

প্রতিকূলতার চাপে মানুষ কখনো মানসিকভাবে অবসন্ন হয়ে পড়ে। তখন সব সমস্যাকে একসঙ্গে সমাধান করতে গিয়ে সে আরও ক্লান্ত হয়ে যায়। এ অবস্থায় নিজের সামর্থ্য বুঝে ধাপে ধাপে এগোনো জরুরি।

প্রথমত, সব বিরোধের জবাব সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিছু কথার উত্তর নীরবতা, কিছু অভিযোগের উত্তর সত্যনিষ্ঠ আচরণ এবং কিছু সমস্যার সমাধান যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে আসে।

দ্বিতীয়ত, আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। রাগ, ভয় কিংবা গভীর হতাশার মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তাই প্রয়োজন হলে সময় নিতে হবে, বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ মানুষের পরামর্শ নিতে হবে এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তৃতীয়ত, নিজের সামর্থ্যের প্রতি সম্মান রাখতে হবে। সব মানুষকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়, প্রতিটি বিরোধ মিটিয়ে ফেলা সম্ভব নয় এবং সব পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখাও সম্ভব নয়। তাই নিজের দায়িত্বটুকু যথাসাধ্য পালন করে অপ্রয়োজনীয় মানসিক বোঝা কমাতে হবে।

চতুর্থত, ইবাদত, দোয়া, বিশ্রাম এবং সুস্থ সম্পর্কের মাধ্যমে নিজের মনকে শক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। কষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বস্ত ব্যক্তি কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ।

সবশেষে, মনে রাখতে হবে—আজকের দুর্বলতা আগামী দিনের শক্তির নিশ্চয়তা নয়, কিন্তু দুর্বলতা অনুভব করলেই যে জীবনের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়, তা-ও নয়। ধৈর্য, চেষ্টা, সঠিক সিদ্ধান্ত ও আল্লাহর সাহায্য কামনার মধ্য দিয়ে মানুষ আবার নিজের পথ খুঁজে পেতে পারে।

প্রতিকূলতা যেন মানবিকতাকে গ্রাস না করে

বিরোধিতা ও শত্রুতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মানুষের মনকে কখনো কঠোর করে তোলে। বারবার প্রতারিত হলে সে সবাইকে অবিশ্বাস করতে শুরু করে; বারবার অপমানিত হলে অন্যকেও অপমান করতে ইচ্ছা করে; বারবার আঘাত পেলে তার মনেও প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে।

কিন্তু এখানেই মানুষের নৈতিক শক্তির পরীক্ষা। অন্যের নিষ্ঠুরতা যেন আমাকে নিষ্ঠুর না করে, অন্যের মিথ্যাচার যেন আমাকে মিথ্যাবাদী না বানায়, অন্যের অবিচার যেন আমাকে অবিচারী না করে—এই প্রত্যয়ই একজন মানুষের প্রকৃত সাফল্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“মন্দকে প্রতিহত করো তা দ্বারা, যা উত্তম।”

—আল-কুরআন, সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৩৪-এর ভাবার্থ।

এই নির্দেশ অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করার শিক্ষা নয়; বরং যথাসম্ভব উত্তম আচরণ, সংযম ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে মন্দের মোকাবিলা করার শিক্ষা। যেখানে উত্তম আচরণ সম্পর্ক সংশোধন করতে পারে, সেখানে তা গ্রহণ করা উচিত। আর যেখানে নিজের বা অন্যের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্ন আসে, সেখানে ন্যায়সংগত পদক্ষেপ নিতে হবে।

যে মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের বিবেককে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে—সে তার চরিত্রকে অন্যের আচরণের দাস হতে দেয় না।

শেষ কথা: ঝড় আসবে, তবু পথ চলা থামবে না

হে আমার প্রতিপালক! জীবনের আকাশে যখন বিরোধিতার কালো মেঘ জমে, তখন আমার অন্তরে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখো। যখন এক দিকের ঝড় সামলে উঠতে না উঠতেই অন্য দিক থেকে নতুন আঘাত আসে, তখন আমাকে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সাহস দাও। যখন শক্তিশালীর অবিচারে আমি অসহায় বোধ করি, তখন ন্যায়সংগত উপায়ে নিজের অধিকার রক্ষা করার সামর্থ্য দাও।

আমি চাই না অন্যায়ের শিকার হয়ে আমিও অন্যায়কারী হয়ে উঠি। আমি চাই না মানুষের শত্রুতা আমার হৃদয়ের কোমলতা কেড়ে নিক। আমি চাই না বারবারের ব্যর্থতা আমার আশা নিভিয়ে দিক। আমি চাই, আমার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যেন দায়িত্ব পালন করতে পারি, বিপদের মধ্যেও সত্যের পাশে থাকতে পারি এবং কষ্টের মধ্যেও তোমার রহমতের আশা ধরে রাখতে পারি।

জীবন যে সংগ্রামের নাম, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে প্রতিটি সংগ্রামকে শত্রুতা দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে না, প্রতিটি আঘাতের প্রতিশোধ নিতে হবে না, আর প্রতিটি পরাজয়কে জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি ভাবতে হবে না। কখনো সামনে এগোতে হয়, কখনো থেমে পরিস্থিতি বুঝতে হয়, কখনো নিজের পথ পরিবর্তন করতে হয়, আবার কখনো ধৈর্য ধরে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে হয়।

আমার শক্তি সীমিত হতে পারে, কিন্তু চেষ্টা করার অধিকার আমার আছে। আমার পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু সঠিক পথ বেছে নেওয়ার দায়িত্ব আমার আছে। মানুষের আচরণ আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু নিজের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও নৈতিক অবস্থানকে যথাসম্ভব সঠিক রাখার চেষ্টা আমার হাতে রয়েছে।

আমি দুর্বল হতে পারি, কিন্তু দুর্বলতাই আমার পরিচয়ের শেষ কথা নয়। আমি আঘাত পেতে পারি, কিন্তু আঘাতই আমার জীবনের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। আমি পড়ে যেতে পারি, কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা ছেড়ে দেব কেন?

হে আল্লাহ! প্রতিকূলতার ঝড়ে আমাকে ধৈর্যশীল করো, অন্যায়ের সামনে ন্যায়নিষ্ঠ রাখো, হতাশার অন্ধকারে আশাবাদী রাখো এবং জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দাও। আমার হৃদয়কে বিদ্বেষমুক্ত, চরিত্রকে সুন্দর, কর্মকে কল্যাণময় এবং ভরসাকে তোমার প্রতি অবিচল রাখো। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ