Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:৫১ অপরাহ্ণ

শ্যামলের বিবর্ণ জীবন ও নির্বাসন

শ্যামলের বিবর্ণ জীবন ও নির্বাসন


সমাপ্তি, 

কেমন আছো?

হয়তো ভালোই আছো। সব মিলিয়ে নিশ্চয়ই ভালো আছো। তোমাকে একটা কথা লিখব লিখব করে আর লেখা হয়ে ওঠে না। কথাটা একেবারে মনের কাছ থেকে হাতের কাছে এসে দাঁড়ায়, তবু লেখা হয় না। সময় করে উঠতে পারি না। তবু আজ লিখব।

ভালো করে পড়ার মতো সময় হয়তো তোমার নেই। স্বামী, সংসার, বাচ্চাকাচ্চা—সব মিলিয়ে তুমি নিশ্চয়ই বেশ ব্যস্ত। তবু আজ তোমাকে একটা গল্প শোনাই।

তোমাকে কি আমাদের সেই শ্যামলের কথা বলেছি? মনে আছে তোমার? আমার সেই ইয়ারমেট শ্যামল?

শ্যামল ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে, আর কোনো ভাইবোন ছিল না। ছেলে হিসেবে খুবই ভালো—নম্র, ভদ্র, শান্ত স্বভাবের। সব মিলিয়ে একজন ভালো মানুষ।

শ্যামলকে একজনকে পছন্দ করত। তার নাম ত্রিদীপ্তা। ত্রিদীপ্তাও শ্যামলকে চিনত, জানত। কিন্তু শ্যামল তেমন একটা পাত্তা দিত না। সম্পর্কের প্রতি শ্যামলের একসময় তেমন বিশ্বাস ছিল না, ভালো লাগাও ছিল না। অথচ একসময় ত্রিদীপ্তার ডাকে সাড়া দিয়েছিল সে। সেই থেকেই শুরু।

দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ঠিক কত বছর হবে, একটু ভেবে বলি—প্রায় বারো বছর। দীর্ঘ বারো বছরের চেনাজানা, ভালো লাগা আর একসঙ্গে পথ চলার গল্প। তারপর একদিন তাদের বিয়ে হলো।

শ্যামল হয়তো ভেবেছিল, এবার বুঝি জীবনে একটু শান্তি আসবে। এত দিনের ভালোবাসা এবার একটা আপন ঠিকানা পাবে। দুজন মিলে ছোট্ট একটা পৃথিবী গড়ে তুলবে, যেখানে দিনের শেষে ফিরে আসার মতো একজন মানুষ থাকবে।

কিন্তু বিয়ের পর থেকেই যেন গল্পটা অন্য দিকে মোড় নিল।

শুরু হলো ত্রিদীপ্তার কড়া শাসন। শ্যামলের কোনো কিছুই তার ভালো লাগত না, কোনো কিছুই যেন তার মনমতো হতো না। তখনো শ্যামলের ভালো চাকরি হয়নি। সামান্য আয়ে সংসার চলত, অনেক হিসাব করে দিন কাটাতে হতো। একটা সময় শ্যামলের চাকরি হলো। কিন্তু তাতেও ত্রিদীপ্তার মন ভরল না।

এটা হয় না, ওটা হয় না। শাশুড়ি খারাপ, শ্বশুর খারাপ, সংসারের মানুষগুলো খারাপ—সবকিছুতেই যেন অসন্তোষের একটা দীর্ঘ ছায়া। পৃথিবীর কোথাও যেন ভালো কিছু অবশিষ্ট নেই।

অভিমান, অপমান আর মানসিক যন্ত্রণা—সব মিলিয়ে শ্যামলের দিনগুলো ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠতে লাগল।

শ্যামলের অফিস ছিল বাড়ি থেকে বেশ দূরে। প্রতিদিন ভোরে তাকে বেরিয়ে পড়তে হতো। অনেক দিনই না খেয়ে বেরোতে হতো, কারণ সে যখন বাসা থেকে বের হতো, ত্রিদীপ্তা তখনো ঘুমিয়ে থাকত। কী আর করা! নিজের কষ্টটুকু নিজের মধ্যেই চেপে রেখে সে কাজে চলে যেত।

আবার দিন শেষে বাড়ি ফিরে দেখত, ত্রিদীপ্তা নিজের মতো ব্যস্ত। কখনো বন্ধুর বাড়িতে, কখনো বাবার বাড়িতে, কখনো কোনো বান্ধবীর সঙ্গে ঘুরতে গেছে। সংসার যেন পাশাপাশি থাকা দুজন মানুষের জন্য দুটি আলাদা পৃথিবী হয়ে উঠেছিল।

শ্যামলের জন্য সেখানে অপেক্ষা করে থাকত না কোনো আন্তরিক প্রশ্ন—‘খেয়েছ?’ কিংবা ‘আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?’

কেউ যেন জানতে চাইত না, সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ফিরে আসা মানুষটার বুকের ভেতরেও কিছু কথা জমে আছে কি না।

বাবা-মায়ের জন্য বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসত শ্যামল। ত্রিদীপ্তা ঠিকমতো রান্নাও করত না, এমনকি ছুটির দিনগুলোতেও নয়। ঘরে ফিরেও শ্যামলের যেন ঘর বলে কিছু ছিল না। কথা বলার মানুষ ছিল না, মনের কথা শোনার মানুষ ছিল না। সে আলাদা ঘরে থাকত, নিজের মতো করে সময় কাটাত। বই পড়ত, গান শুনত। এভাবেই দিন যেত, রাত যেত।

সে চেষ্টা করত অফিসের কাজে ডুবে থাকতে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যে হয়তো কিছুক্ষণের জন্য নিজের দুঃখ ভুলে থাকা যেত। কিন্তু মানুষের মন কি আর সব সময় ব্যস্ততার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে?

কখনো গভীর রাতে সে বাইরে হাঁটতে বেরিয়ে পড়ত। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। রাতের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলত। শ্যামল ভাবত, তারাগুলোও বোধ হয় ভীষণ একা। এত বিশাল আকাশ, এত অসংখ্য তারা—তবু প্রত্যেকেই যেন নিজের নিজের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে।

শ্যামলও কি ঠিক তেমনই ছিল না?

একটা সংসার ছিল তার, স্ত্রী ছিল, বাবা-মা ছিলেন, চাকরি ছিল, মাথার ওপর ছাদ ছিল। পৃথিবীর চোখে তার জীবনে অভাবটা কোথায়? অথচ সেই মানুষটারই যেন কোথাও একটু আশ্রয় ছিল না। কোথাও ফিরে গিয়ে নিশ্চিন্তে বসার জায়গা ছিল না। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো খুলে বলার মতো একজন মানুষও ছিল না।

ত্রিদীপ্তার আচরণ তাকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করত। শ্যামল বোঝানোর চেষ্টা করত। অনেকবার, অনেকভাবে। হয়তো ভেবেছিল, একদিন ত্রিদীপ্তা বুঝবে। একদিন তার কষ্টগুলো অনুভব করবে। একদিন অন্তত বুঝবে, ভালোবাসা মানে শুধু অধিকার নয়, ভালোবাসা মানে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোও।

কিন্তু ত্রিদীপ্তা যেন কিছুই বুঝতে পারত না।

শ্যামল কাঁদত। খুব কাঁদত। হয়তো সবার আড়ালে, হয়তো গভীর রাতে, যখন চারপাশের পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ত। তার কান্নার শব্দ শোনার মতো কেউ থাকত না। যে মানুষটা বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করত, ভেতরে ভেতরে সে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছিল।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো বাবা-মায়ের কথা ভেবে। নিজের বাবা-মায়ের জন্য সে কিছুই করতে পারছে না—এই অপরাধবোধ তাকে তাড়া করে বেড়াত। তাদের সেবা করতে পারছে না, তাদের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে পারছে না। নিজের সংসার সামলাতে গিয়ে সে যেন নিজের শিকড় থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল।

কী করবে শ্যামল?

কাকে বলবে তার কষ্টের কথা?

শ্যামলের একজন বান্ধবী ছিল। খুব ভালো বান্ধবী। শ্যামল হয়তো ভেবেছিল, অন্তত এই মানুষটি তার কষ্ট বুঝবে। কিন্তু সেখানেও সে পুরোপুরি আশ্রয় পেল না। বান্ধবী সান্ত্বনা দিত, বোঝানোর চেষ্টা করত, কখনো উপদেশও দিত। কিন্তু শ্যামলের ভেতরে যে কী ভাঙচুর চলছিল, তা যেন কেউ সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারত না।

সবাই তাকে কিছু না কিছু বোঝাতে চাইত। অথচ কেউ যেন তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনতে চাইত না।

মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন একটা সময় আসে, যখন সে আর পরামর্শ চায় না, সমাধানও চায় না। সে শুধু চায়, কেউ একজন তার পাশে বসুক। কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো বিচার না করে, শুধু একটু শুনুক। তার কষ্টটুকুকে অস্বীকার না করুক।

শ্যামল হয়তো তেমন একজন মানুষই খুঁজেছিল।

কিন্তু দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, অভিমান আর অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা সে আর সহ্য করতে পারছিলন।

আজ আর নয়!


ইতি 

তোমারই বন্ধু

মন্তব্য করুন

ব্লগ