সিনিয়র শিক্ষক
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৩:৪৫ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
লেখক: মোঃ মাসুদ রানা
সিনিয়র সহকারী শিক্ষক (গণিত)
টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ
মানুষের জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করে, বিবেক জাগ্রত করে এবং সঠিক পথে চলতে শেখায়। আর শিক্ষক হলেন সেই মানুষ, যিনি নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, আদর্শ ও ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। আমার জীবনে শিক্ষা অর্জন এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুধু একটি পেশাগত যাত্রা নয়; এটি আমার জীবনের অন্যতম ব্রত। ছাত্রজীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমার চেষ্টা—নিজে শিখব, অন্যকে শেখাব এবং শিক্ষার্থীদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখব।
আমার শিক্ষাজীবনের সূচনা টিডিএ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৯৪ সালে আমি পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করি। এরপর মজিদা সরকারের উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পড়াশোনা করে ২০০০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। পরবর্তী সময়ে টঙ্গী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করি।
উচ্চশিক্ষার জন্য আমি সরকারি তিতুমীর কলেজে ভর্তি হই এবং গণিত বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ও এমএড সম্পন্ন করি। আমার এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবন আমাকে শিখিয়েছে—জ্ঞান অর্জনের কোনো শেষ নেই। প্রতিটি নতুন অভিজ্ঞতা মানুষকে আরও পরিণত করে এবং অন্যকে শেখানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ছাত্রজীবন থেকেই আমি শিক্ষার্থীদের পড়ানো শুরু করি। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পাঠদান করার সুযোগ পেয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি বুঝতে শিখেছি, একজন শিক্ষকের প্রকৃত দায়িত্ব শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেষ করা নয়; বরং শিক্ষার্থীর মনে শেখার আগ্রহ সৃষ্টি করা।
কেউ দ্রুত বুঝতে পারে, কেউ একটু সময় নিয়ে শেখে। তাই সব শিক্ষার্থীকে একইভাবে বিচার করা উচিত নয়। আমার শিক্ষাদর্শন হলো—শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করা, তার সমস্যার কারণ বোঝা এবং সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে তাকে শেখানো। আমি বিশ্বাস করি, যথাযথ দিকনির্দেশনা, অনুশীলন ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর উন্নতির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
আমার শিক্ষকতা জীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে এনটিআরসিএর জাতীয় মেধাতালিকায় ৮০তম স্থান অর্জন। এই অর্জন আমার পেশাগত জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে আমার কাছে অর্জনের মূল্য শুধু ব্যক্তিগত স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; সেই অর্জিত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারাই আমার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজে সিনিয়র সহকারী শিক্ষক (গণিত) হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছি।
আমার শিক্ষকতা ও শিক্ষাদর্শনের মূল ভিত্তি কয়েকটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
১. বুঝে শেখানো, মুখস্থনির্ভরতা নয়
বিশেষ করে গণিতের ক্ষেত্রে আমি বিশ্বাস করি, সূত্র মুখস্থ করলেই প্রকৃত শিক্ষা সম্পন্ন হয় না। সূত্রের উৎপত্তি, প্রয়োগ, যুক্তি এবং ধাপে ধাপে সমাধান বুঝতে পারলেই শিক্ষার্থী প্রকৃত দক্ষতা অর্জন করে।
২. দুর্বল শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা
কোনো শিক্ষার্থীকে তার দুর্বলতার কারণে অবহেলা করা উচিত নয়। বরং তার সমস্যার জায়গা খুঁজে বের করে ধৈর্যসহকারে শেখানো একজন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
৩. সততা ও দায়িত্বশীলতা
শিক্ষকতার ক্ষেত্রে সততা, সময়নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্ববোধ অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের সামনে একজন শিক্ষককে নিজের আচরণ ও কাজের মাধ্যমে আদর্শ স্থাপন করতে হয়।
৪. শাসনের সঙ্গে সহমর্মিতা
শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাবোধ শেখানো প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে ন্যায্যতা, সম্মান ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে। ভয় সৃষ্টি করে নয়, বরং বোঝানো ও অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালিত করা উচিত।
৫. প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি সমান মনোযোগ
মেধাবী কিংবা দুর্বল, ধনী কিংবা দরিদ্র—প্রত্যেক শিক্ষার্থী সম্মান ও শেখার সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। একজন শিক্ষকের দৃষ্টিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
৬. নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা
একজন শিক্ষক নিজেও আজীবন শিক্ষার্থী। নতুন শিক্ষণপদ্ধতি, প্রযুক্তি ও শিক্ষাবিষয়ক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করা আমার নীতির অংশ।
গণিত অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ভীতিকর বিষয়। আমার লক্ষ্য হলো সেই ভয় দূর করে গণিতকে সহজ, আনন্দময় ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তোলা। আমি চাই, শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর অর্জন করুক তা নয়; বরং যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শিখুক, সমস্যা সমাধানে দক্ষ হোক এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখুক।
আমার বিশ্বাস, গণিত শেখানোর কার্যকর পদ্ধতি হলো—প্রথমে ধারণা পরিষ্কার করা, তারপর উপযুক্ত উদাহরণ দেখানো, ধাপে ধাপে সমাধান শেখানো এবং সবশেষে শিক্ষার্থীকে নিজে অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া। এভাবেই শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা গড়ে ওঠে।
আমার জীবনের মূলমন্ত্র হলো—জ্ঞান অর্জন করব, সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব এবং অর্জিত জ্ঞান অন্যের কল্যাণে কাজে লাগাব। একজন শিক্ষকের সার্থকতা শুধু নিজের ডিগ্রি বা পদমর্যাদায় নয়; বরং তাঁর শিক্ষার্থীরা কতটা শিখল, কতটা আত্মবিশ্বাসী হলো এবং জীবনে কতটা এগিয়ে যেতে পারল, তার মধ্যেই নিহিত।
আমি চাই, আমার শিক্ষার্থীরা একদিন নিজেদের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হোক, পরিবার ও সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখুক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক।
টিডিএ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া আমার শিক্ষাজীবন, মজিদা সরকারের উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা, টঙ্গী সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক এবং সরকারি তিতুমীর কলেজে গণিতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথ আমাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ও এমএড অর্জন আমার পেশাগত জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ছাত্রজীবন থেকে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা অন্যের জীবনকে আলোকিত করে।
আমি ভবিষ্যতেও সততা, নিষ্ঠা, ধৈর্য ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে শিক্ষকতা করতে চাই। আমার প্রত্যাশা—প্রতিটি শিক্ষার্থী গণিতকে বুঝে শিখবে, নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখবে এবং জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
আমার কাছে শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়; এটি জ্ঞান বিতরণ, মানুষ গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করার এক মহান দায়িত্ব।
— মোঃ মাসুদ রানা
সিনিয়র সহকারী শিক্ষক (গণিত)
টঙ্গী পাইলট স্কুল এন্ড গার্লস কলেজ
গণিত বুঝে শিখি, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাই।
১
০ মন্তব্য