Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:০৫ অপরাহ্ণ

জলবায়ু পরিবর্তন: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের দায়

জলবায়ু পরিবর্তন: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের দায়

 

ধরুন, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন- আপনার পরিচিত নদীটি আর আগের জায়গায় নেই। যে মাঠে গতকালও সবুজ ধান দুলছিল, সেখানে আজ লবণাক্ত পানি। যে শহরে শীতের অপেক্ষায় থাকতেন, সেখানে শীত যেন ক্যালেন্ডারের পাতাতেই আটকে আছে। আর আপনার সন্তানের প্রশ্ন- “বাবা, আমাদের পৃথিবীটা এমন হয়ে গেল কেন?”

সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের কাছে আছে। কিন্তু তখন হয়তো উত্তর দেওয়ার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াবে; আমরা যখন সময় পেয়েছিলাম, তখন কী করেছিলাম?

জলবায়ু পরিবর্তন কোনো কল্পকাহিনি নয়। এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, সমুদ্র, বরফ, বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চলমান একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। শিল্পবিপ্লবের পর কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যাপক ব্যবহার, বন উজাড়, শিল্পায়ন ও অন্যান্য মানবিক কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়েছে। এসব গ্যাস পৃথিবী থেকে মহাশূন্যে বেরিয়ে যেতে চাওয়া তাপের একটি অংশ আটকে রাখে। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে।

কিন্তু এই উষ্ণতার গল্প শুধু থার্মোমিটারের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবী যত উষ্ণ হচ্ছে, জলবায়ুর স্বাভাবিক ছন্দও তত বদলে যাচ্ছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ খরা; কোথাও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও অস্বাভাবিক শৈত্যপ্রবাহ। সমুদ্র উষ্ণ হচ্ছে, হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বহু উদাহরণ আমরা পেয়েছি। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, দাবানল, আকস্মিক বন্যা ও শক্তিশালী ঝড় মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। ২০২৬ সালেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপ ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতের কোনো অস্পষ্ট আশঙ্কা নয়; এর অনেকটাই ইতিমধ্যে বাস্তব।

 

হিমালয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নেপালসহ হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, তুষার ও পার্বত্য ভূমির পরিবর্তন নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ গলা, বরফের হ্রদ তৈরি ও আকস্মিক বন্যার মতো ঘটনা নিচের দিকে বসবাসকারী মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। একটি পাহাড়ি দুর্যোগ তাই পাহাড়েই সীমাবদ্ধ থাকে না; নদী ও পানি ব্যবস্থার মাধ্যমে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ অঞ্চল। দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার ঝুঁকিতে। নদীভাঙন ও বন্যা অনেক মানুষের বসতভিটা ও জীবিকা কেড়ে নেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। কৃষিতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন একই সঙ্গে খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও মানুষের অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত একটি সংকট।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবায়ু ন্যায়বিচার। যারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তুলনামূলক কম দায়ী, অনেক সময় তারাই এর ক্ষতির বড় অংশ বহন করছে। তাই জলবায়ু সংকটের সমাধান শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অভিযোজন এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা।

তবে শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা রাষ্ট্রীয় নীতির দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। পরিবর্তন শুরু হতে পারে আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকেই। বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় কমানো, গণপরিবহন ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন- সবকিছুই সম্মিলিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

 

আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মাধ্যম হতে পারে শিক্ষা। একজন শিক্ষক যখন একজন শিশুকে বোঝান যে একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না, কার্বন শোষণ করে; যখন তিনি বোঝান যে পানি সীমাহীন নয়; যখন একটি শ্রেণিকক্ষে প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর অভ্যাস তৈরি হয়- তখন আসলে একটি প্রজন্মের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে।

আমরা হয়তো অতীতের ভুলগুলো মুছে ফেলতে পারব না। কিন্তু ভবিষ্যতের ভুলগুলো কমানোর সুযোগ এখনো আমাদের হাতে আছে। একদিন হয়তো আমাদের সন্তানরা সত্যিই প্রশ্ন করবে- “তোমরা যখন বুঝতে পেরেছিলে পৃথিবী বিপদের দিকে যাচ্ছে, তখন তোমরা কী করেছিলে?”

সেদিন আমাদের উত্তর যেন শুধু আফসোস না হয়। আমাদের উত্তর হোক- “আমরা চেষ্টা করেছিলাম।”, কারণ পৃথিবীটা শুধু আমাদের জন্য নয়; এটি তাদেরও, যারা এখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি।

 

?সদর উদ্দিন

    শিক্ষক, সিটিংবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

    গোয়াইনঘাট, সিলেট

    ২০ অক্টোবর, ২০২৬খ্রি.

মন্তব্য করুন

ব্লগ