সহকারী শিক্ষক
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:৫৫ অপরাহ্ণ
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশিদের 'টোপ' হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
"কীভাবে কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যে প্রাণে বেঁচে ফিরছি, সে কথা বলে বোঝানো যাবে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সম্প্রতি দেশে ফিরে আসা তরুণ রাজন হোসেন।
মি. হোসেনের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায়। তার ভাষ্যমতে, নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে গত মে মাসে তাকে রাশিয়া পাঠিয়েছিল বাংলাদেশের একটি ট্রাভেল এজেন্সি।
"কিন্তু রাশিয়া পৌঁছানোর পর আমার পাসপোর্ট, ফোন -সবকিছু কেড়ে নিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়," বলেন মি. হোসেন।
সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর প্রথমে তাকে নেওয়া হয় রুশ বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। সেখানে তিন সপ্তাহ রেখে অস্ত্র চালানোসহ যুদ্ধের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর সরাসরি পাঠানো হয় ইউক্রেনে, সম্মুখসারির যুদ্ধে।
"আমার সঙ্গে বাংলাদেশের আরও ২৯ জনকে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথমদিনেই ইউক্রেনের সৈন্যদের ড্রোনের হামলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরে আরও তিনজন মিলে আমাদের গ্রুপে মোট ২০ জন মারা গেছে," বলছিলেন মি. হোসেন।
ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন সময় অর্থের বিনিময়ে রাশিয়াকে দেশি-বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধা সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে বরাবরই প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে যেসব নাগরিকদের নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে, তাদের না আছে ভালো প্রশিক্ষণ, না আছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।
তারপরও তাদেরকে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে কেন?
"প্রাথমিক অনুসন্ধানে আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি, সেটা হচ্ছে- প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য, তাদেরকে এক ধরনের টোপ বা শিকার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১০ (এসআরবি-১০) এর অধিনায়ক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
'অন্তত লাশটা ফিরে আসুক'
ইউক্রেনে সম্মুখসারিতে যুদ্ধ করতে গিয়ে এবছর যে ৩০ জন নিহত হয়েছেন, তাদের সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান বলে জানা যাচ্ছে।
একটু স্বচ্ছলতা ও উন্নত জীবনের আশায় তাদের মধ্যে অনেকে বিদেশে যাওয়ার টাকা জোগাড় করেছেন জায়গা-জমি, গরু-ছাগল বিক্রি করে, কেউবা নিয়েছেন ব্যাংক ঋণ।
তেমনই একজন লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন।
"গরু-ছাগল বিক্রি করছি, জায়গা-জমি বন্দক রাখছি, ঋণ নিছি ছেলেরে রাশিয়া পাঠানোর জন্য। ভাবছিলাম, কাজ করে টাকা পাঠাবে, তখন জমির বন্দক ছাড়াবো, ঋণ শোধ করবো, আবার গরু-ছাগল কিনবো। কিন্তু ছেলেটাকে যুদ্ধে নিয়ে মেরে ফেললো," বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে মি. মামুনের বাবা আব্দুল মাজিদের।
পেশায় কৃষক এই বাবার এখন একটাই চাওয়া। সেটা হচ্ছে, তার ছেলের মরদেহটা যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
"ছেলেকে তো আর ফিরে পামু না। অন্তত লাশটা ফিরে আসুক। কবরটা যেন দিতে পারি। সরকারের কাছে এটাই আমার চাওয়া," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মজিদ।
মি. মামুনসহ লালমনিরহাট জেলা থেকে একসঙ্গে রাশিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন চারজন। তাদের মধ্যে তিনজনই যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন বলে জানতে পেরেছে পরিবার।
আল আমিন ইসলাম নামের যে তরুণ এখনও বেঁচে আছেন, তিনি দেশে ফিরে আসার জন্য রীতিমত কান্না-কাটি করছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
"একদিন আগেও ফোন দিয়ে অনেক কান্না-কাটি করছে। বাড়িতে অন্যরাও সবাই দুশ্চিন্তায় আছে। আমরা সবাই নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেতে বসেছি ছেলের দুশ্চিন্তায়," বলছিলেন মি. ইসলামের পিতা আফজাল হোসাইন।
ছেলেকে দেশে ফেরানোর জন্য সরকারের এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছুটাছুটি করছেন বলেও জানান প্রবীণ এই বাবা।
"এলাকার এমপি-মন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রবাসীকল্যাণ, পররাষ্ট্র-সব মন্ত্রণালয়ে দৌঁড়াইছি। সবাই শুধু আশ্বাস দেয়, কিন্তু এখনও ছেলেটা আমার যুদ্ধের মধ্য থেকে বের হতে পারেনি। কবে পারবে, বাঁচবে-নাকি না, সেটাও জানি না," বলেন মি. হোসাইন।
এসব বিষয়টি প্রবাসীকল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, দালাল চক্রের এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে রুশ সরকার অবহিত কি-না, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আর যুদ্ধের ময়দানে 'টোপ হিসেবে' বাংলাদেশিদের ব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটির বিষয়ে রুশ সরকারকে অবহিত করা হয়েছে কি-না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এর আগে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন যে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং বর্তমানে পরিবার কোনো খোঁজ পাচ্ছে না, এ ধরনের তিন ডজনেরও বেশি আবেদন তারা গত এক বছরে পেয়েছেন।
সেসব আবেদনের প্রেক্ষিতে রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছয় জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকিদের ব্যাপারেও খোঁজ-খবর চলছে। সেইসঙ্গে, নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন কর্মকর্তারা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আগে নিহত ছয়জনের মরদেহই এখনও ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।
ফলে সম্প্রতি যে ২০ জন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে, তাদের মরদেহ আদৌ ফিরবে কি-না, সেটি নিয়ে স্বজনদের মধ্যে সন্দেহ দেখা যাচ্ছে।
৪
৭ মন্তব্য