সহকারী অধ্যাপক
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সরলতা ও আন্তরিকতার পরাজয়, প্রতারণার উত্থান এবং সত্যের চিরন্তন মর্যাদা - মোঃ মুজিবুর রহমান
সরলতা ও আন্তরিকতার পরাজয়, প্রতারণার উত্থান এবং সত্যের চিরন্তন মর্যাদা
মোঃ মুজিবুর রহমান সহকারী অধ্যাপক,মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
মানুষের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো সরলতা, আন্তরিকতা, সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। এসব গুণ মানুষের ব্যক্তিত্বকে মহৎ করে, সম্পর্কের ভিতকে দৃঢ় করে এবং সমাজে পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসার পরিবেশ সৃষ্টি করে। কিন্তু যখন একজন মানুষের সরলতাকে দুর্বলতা, আন্তরিকতাকে সুযোগ এবং বিশ্বাসকে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তার হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। বারবার প্রতারিত হতে হতে সে একসময় নিজের বিশ্বাস, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়। যে মানুষটি একসময় অকপটে সবাইকে বিশ্বাস করত, সে-ই ধীরে ধীরে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে; যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে সবার পাশে দাঁড়াত, সে-ই একসময় নিজেকে গুটিয়ে নিতে শেখে।
এভাবেই যখন সরলতা ও আন্তরিকতা বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সেগুলোর জায়গা দখল করতে থাকে অবিশ্বাস, আত্মরক্ষার প্রবণতা, মানসিক দূরত্ব ও কঠোরতা। অন্যদিকে, প্রতারক ও অসৎ মানুষ সাময়িকভাবে সুবিধা লাভ করে নিজেদের সফল ভাবতে পারে। ফলে অনেক সময় মনে হয়, সত্য পরাজিত হচ্ছে, আন্তরিকতা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে আর অসত্য বিজয়ের আসন দখল করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিজয় কি প্রকৃত বিজয়? প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সুবিধা কি সত্যিকারের সাফল্য? আর সরল মানুষ আঘাত পেলেই কি তার সততা ও আন্তরিকতা অর্থহীন হয়ে যায়? ইসলামের নৈতিক শিক্ষা ও মানবজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
সরলতা ও আন্তরিকতা: মহৎ চরিত্রের পরিচয়
সরলতা মানে বোকামি নয়, আর আন্তরিকতা মানে নিজের অধিকার বিসর্জন দিয়ে অন্যের সব অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। সরলতা হলো অহংকার, কপটতা ও জটিল প্রতারণা থেকে মুক্ত স্বচ্ছ মানসিকতা। আন্তরিকতা হলো অন্তরের সদিচ্ছা, কথার সত্যতা এবং কাজে নিষ্ঠার প্রকাশ। একজন সরল ও আন্তরিক মানুষ অন্যের কল্যাণ কামনা করেন, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীল থাকেন এবং নিজের আচরণে সততা বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
ইসলাম মানুষের চরিত্রে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা ও উত্তম আচরণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।” (সূরা আত-তাওবা, ৯:১১৯)
এই নির্দেশনা আমাদের শেখায়, সত্যের পথে থাকা এবং সত্যনিষ্ঠ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মানুষের প্রতারণার শিকার হয়ে নিজের সততা বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। বরং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সততাকে আরও সচেতন, বিচক্ষণ ও দৃঢ়ভাবে ধারণ করা প্রয়োজন।
যখন আন্তরিকতার প্রতিদান হয় প্রতারণা
মানুষ যখন কাউকে বিশ্বাস করে, তখন সেই বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের আবেগ, প্রত্যাশা ও আত্মমর্যাদার একটি অংশও জড়িয়ে থাকে। বিশেষত দীর্ঘদিনের পরিচিত, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আত্মীয় কিংবা ব্যবসায়িক সহযোগীর কাছ থেকে প্রতারণার শিকার হলে কষ্ট আরও গভীর হয়। কারণ, অপরিচিত মানুষের অন্যায় যতটা আঘাত করে, আপনজনের বিশ্বাসভঙ্গ অনেক সময় তার চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।
একজন আন্তরিক মানুষ অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ান, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করেন। কিন্তু বিনিময়ে যদি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ছলচাতুরী, অধিকার হরণ কিংবা বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হন, তাহলে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—মানুষের জন্য এত কিছু করে কী পেলাম?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কখনো তিনি হতাশ হন, কখনো নীরব হয়ে যান, আবার কখনো মানুষের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। তাঁর কাছে সম্পর্কের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে আসে এবং আন্তরিকতার মূল্য নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। অথচ সমস্যাটি আন্তরিকতার মধ্যে নয়; সমস্যাটি সেই ব্যক্তির আচরণে, যিনি আন্তরিকতার সুযোগ নিয়ে অন্যায় করেছেন।
একজন মানুষের প্রতারণা আন্তরিকতার মূল্য কমাতে পারে না; বরং তা প্রতারকের চরিত্রের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।
সরলতার জায়গায় অবিশ্বাসের বিস্তার
সরলতা যখন বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন মানুষের মনে কয়েকটি পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। প্রথমত, সে সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, অন্যের ভালো আচরণের মধ্যেও গোপন স্বার্থ খুঁজতে শুরু করে। তৃতীয়ত, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে ভয় পায়। চতুর্থত, নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে ওঠে।
এসব পরিবর্তনের পেছনে অনেক সময় থাকে নিজেকে আরও আঘাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা। মানুষ ভাবে, কাউকে বিশ্বাস না করলে হয়তো আর প্রতারিত হতে হবে না; কারও জন্য বেশি কিছু না করলে হয়তো আর কষ্ট পেতে হবে না। কিন্তু এই আত্মরক্ষার প্রবণতা যখন অতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন তা মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য, সম্পর্কের উষ্ণতা ও মানসিক প্রশান্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তাই প্রয়োজন অবিশ্বাসের অন্ধকারে সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়া নয়; প্রয়োজন বিশ্বাসের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা অর্জন করা। সবাইকে সন্দেহ করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি যাচাই না করে সবাইকে বিশ্বাস করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মানুষের কথা, কাজ, দায়িত্ববোধ ও সময়ের পরীক্ষায় তার চরিত্র সম্পর্কে ধারণা গড়ে তুলতে হয়।
যখন সরলতা কোণঠাসা হয়, অসত্য তখন মাথাচাড়া দেয়
কোনো সমাজে যখন সত্যবাদী মানুষ বারবার প্রতারিত হন, আর প্রতারকেরা যথাযথ জবাবদিহি ছাড়াই সুবিধা ভোগ করেন, তখন অন্যায়ের একটি বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি হয়। সৎ মানুষ নীরব হয়ে পড়েন, ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা দুর্বল হয় এবং অসৎ ব্যক্তিরা নিজেদের আচরণকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পায়।
কেউ কেউ মনে করতে শুরু করেন, সততা দিয়ে কিছু অর্জন করা যায় না; বরং কৌশলে মিথ্যা বলা, অন্যকে ব্যবহার করা এবং নিজের স্বার্থ হাসিল করাই সফলতার পথ। এভাবে অসত্য শুধু একজন ব্যক্তির আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিবার, বন্ধুত্ব, ব্যবসা ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—অসত্যের দৃশ্যমান সাফল্য মানেই সত্যের প্রকৃত পরাজয় নয়। অনেক সময় প্রতারণাকারী অর্থ, প্রভাব কিংবা সাময়িক সুবিধা লাভ করে। অন্যদিকে, সৎ মানুষকে ক্ষতি, অপমান কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু বাহ্যিক লাভ-ক্ষতিই জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতার চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায় ও সদাচরণ প্রতিষ্ঠা করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। তাই অসত্যের বিস্তার দেখে হতাশ হয়ে অন্যায়ের পথ গ্রহণ করা নয়; বরং সত্যের পক্ষে সচেতন অবস্থান নেওয়াই হলো প্রকৃত দায়িত্বশীলতা।
প্রতারণার সাময়িক লাভ, কিন্তু নৈতিক ক্ষতি গভীর
প্রতারণার মাধ্যমে মানুষ কখনো অর্থ, সম্পদ, পদ কিংবা সাময়িক প্রভাব অর্জন করতে পারে। কিন্তু এসব অর্জনের সঙ্গে যদি অন্যের অধিকার হরণ, বিশ্বাসভঙ্গ ও অন্যায় জড়িয়ে থাকে, তাহলে তা নৈতিক সাফল্য হতে পারে না। কারণ, সম্পদ দিয়ে সব ক্ষতি পূরণ করা যায় না, ক্ষমতা দিয়ে সব অন্যায়কে ন্যায় বানানো যায় না এবং বাহ্যিক সম্মান দিয়ে চরিত্রের শূন্যতা পূরণ করা যায় না।
যে ব্যক্তি বারবার অন্যকে প্রতারণা করেন, তিনি ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন। তাঁর চারপাশে মানুষ থাকলেও সম্পর্কের গভীরতা কমে যেতে পারে। মানুষ তাঁর কথায় আস্থা রাখতে দ্বিধা করে, তাঁর প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ করে এবং প্রয়োজনের সময় তাঁর পাশে দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে।
অন্যদিকে, সৎ মানুষ প্রতারিত হলেও তাঁর সততা, নৈতিক অবস্থান ও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অনুভূতি অটুট রাখতে পারেন। তাঁর ক্ষতি বাস্তব হতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষতির কারণে তাঁর চরিত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া অনিবার্য নয়। বরং সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলে তিনি আরও বিচক্ষণ, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে ধৈর্য, ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদা
ইসলাম মানুষকে ধৈর্য ধারণ করতে শিক্ষা দেয়। তবে ধৈর্য মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয়, নিজের অধিকার বিসর্জন দেওয়া নয় কিংবা প্রতারকের অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া নয়। ধৈর্য হলো বিপদের সময় সংযম বজায় রাখা, অন্যায় প্রতিক্রিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং ন্যায়সংগত উপায়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩)
এই শিক্ষা মানুষকে কঠিন সময়ে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে। কেউ প্রতারণা করলে তার জবাবে মিথ্যা, প্রতারণা কিংবা সীমালঙ্ঘনের আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। বরং সত্য তুলে ধরা, প্রমাণ সংরক্ষণ করা, প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া এবং আইনসম্মত উপায়ে নিজের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করা উচিত।
একই সঙ্গে নিজের আত্মমর্যাদা রক্ষা করাও জরুরি। কাউকে ক্ষমা করা মহৎ গুণ হতে পারে, কিন্তু ক্ষমার নামে বারবার অন্যায়ের সুযোগ সৃষ্টি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সম্পর্ক রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেই সম্পর্কের মধ্যে সততা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মান থাকা প্রয়োজন।
ইসলাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ক্ষমা ও সংশোধনের সুযোগকেও মর্যাদা দেয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ; তবে যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।” (সূরা আশ-শূরা, ৪২:৪০)
আয়াতটি আমাদের শেখায়, ন্যায়সংগত প্রতিকার গ্রহণের অধিকার রয়েছে; আবার ক্ষমা ও সংশোধনের পথও মহৎ। তবে ক্ষমা মানে অন্যায়কে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়, আর ন্যায়বিচার চাওয়া মানে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠাও নয়।
অন্ধ বিশ্বাস নয়, প্রজ্ঞাপূর্ণ বিশ্বাস
জীবনে বিশ্বাস প্রয়োজন, কিন্তু সেই বিশ্বাসের সঙ্গে বিচারবুদ্ধির সমন্বয় থাকা আরও বেশি প্রয়োজন। কাউকে ভালো মনে হলেই তাঁর হাতে নিজের সব দায়িত্ব, সম্পদ কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দেওয়া উচিত নয়। মানুষের পরিচয় শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রকাশ পায়।
ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির লিখিত প্রমাণ রাখা, অর্থ লেনদেনে রসিদ ও হিসাব সংরক্ষণ করা, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় সীমারেখা নির্ধারণ করা আত্মরক্ষার স্বাভাবিক উপায়। এগুলো অবিশ্বাসের প্রকাশ নয়; বরং দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
একইভাবে, প্রত্যেকের সঙ্গে সদাচরণ করা যায়, কিন্তু প্রত্যেককে একই মাত্রায় বিশ্বাস করতে হয় না। কাউকে সম্মান করা যায়, কিন্তু নিজের জীবনের সব সিদ্ধান্তের ওপর তাঁর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া জরুরি নয়। কাউকে সহযোগিতা করা যায়, কিন্তু নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে এমন দায়িত্ব নেওয়া উচিত নয়, যা পরে নিজের বা পরিবারের জন্য সংকট সৃষ্টি করে।
প্রজ্ঞাপূর্ণ সরলতা মানুষকে মহৎ রাখে, আর সচেতন সীমারেখা তাকে অন্যায়ের সুযোগ থেকে রক্ষা করে।
নিজের সুন্দর সত্তাকে হারিয়ে ফেলবেন না
প্রতারণার শিকার হওয়ার পর মানুষের মনে কখনো প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা জাগে, কখনো মনে হয়—এবার থেকে আমিও কাউকে বিশ্বাস করব না, কারও জন্য কিছু করব না। কিন্তু অন্যের অন্যায়কে নিজের চরিত্রের আদর্শ বানিয়ে নেওয়া সমস্যার সমাধান নয়।
একজন অসৎ মানুষের আচরণ দেখে নিজেও অসৎ হয়ে গেলে, যে মূল্যবোধ রক্ষা করার জন্য এত দিন লড়াই করেছেন, সেটিই হারিয়ে ফেলতে পারেন। তাই প্রতারকের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু প্রতারকের চরিত্র গ্রহণ করা যাবে না। কঠিন হতে হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কিন্তু হৃদয়কে নিষ্ঠুর করা যাবে না। সতর্ক হতে হবে মানুষের আচরণ সম্পর্কে, কিন্তু সব মানুষের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা যাবে না।
মনে রাখতে হবে, আন্তরিকতা মানে সবার মন জয় করা নয়; সততা মানে সব পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সফল হওয়া নয়; আর সরলতা মানে নিজের ক্ষতি মেনে নেওয়া নয়। প্রকৃত সরলতা হলো অন্তরের স্বচ্ছতা, প্রকৃত আন্তরিকতা হলো দায়িত্বশীল সদিচ্ছা এবং প্রকৃত শক্তি হলো অন্যায়ের মুখেও নিজের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার সামর্থ্য।
সত্যের পথে চলার জন্য আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর ওপর ভরসা
মানুষের জীবনে এমন সময় আসে, যখন নিজের সততা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়। মনে হয়, এত ভালো থেকেও যদি কষ্ট পেতে হয়, তাহলে ভালো থাকার অর্থ কী? কিন্তু জীবনের প্রতিটি ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। কোনো কাজের ফল দুনিয়াতেই প্রকাশ পায়, কোনো ফল দীর্ঘ সময় পরে বোঝা যায়, আর চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর কাছে।
তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। এর অর্থ হলো, যথাসাধ্য সঠিক চেষ্টা করা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা, ন্যায়সংগত উপায় গ্রহণ করা এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
অতএব, প্রতারণার শিকার হলে নিজের ক্ষতি নিরূপণ করতে হবে, প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে, বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নিতে হবে এবং ন্যায়সংগত প্রতিকার অনুসন্ধান করতে হবে। পাশাপাশি অন্তরের প্রশান্তির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। মানুষের অন্যায় যেন নিজের ইবাদত, দায়িত্ববোধ ও সুন্দর আচরণকে ধ্বংস করতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
সত্যের পথে চলা মানে কখনো কষ্ট না পাওয়া নয়; বরং কষ্টের মধ্যেও সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার পথ ছেড়ে না দেওয়া। আর আল্লাহর ওপর ভরসা মানে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা ধরে নেওয়া নয়; বরং কঠিন পরিস্থিতিতেও সঠিক পথে থাকার শক্তি ও প্রজ্ঞা কামনা করা।
উপসংহার
সরলতা ও আন্তরিকতা যখন বারবার প্রতারণার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়, তখন মানুষের মনে অবিশ্বাস, হতাশা ও আত্মরক্ষার প্রবণতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আঘাতের কারণে নিজের চরিত্রের মহত্ত্ব হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। প্রতারণা মানুষকে সতর্ক হতে শেখাবে, কিন্তু নিষ্ঠুর হতে নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় হতে শেখাবে, কিন্তু অন্যায়কারী হতে নয়; মানুষের আচরণ যাচাই করতে শেখাবে, কিন্তু মানবতার ওপর থেকে সব বিশ্বাস তুলে নিতে নয়।
অসত্য কখনো সাময়িকভাবে সুবিধা লাভ করতে পারে, কিন্তু সেই সুবিধাকে নৈতিক বিজয় বলা যায় না। একইভাবে, সৎ মানুষ কোনো ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেই তাঁর সততা পরাজিত হয়ে যায় না। প্রকৃত বিজয় হলো অন্যায়ের মুখেও ন্যায়ের পক্ষে থাকা, প্রতারণার অভিজ্ঞতা থেকে প্রজ্ঞা অর্জন করা, নিজের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্তরের সততা অক্ষুণ্ণ রাখা।
সরলতা দুর্বলতা নয়, আন্তরিকতা বোকামি নয়, আর ধৈর্য পরাজয় নয়—প্রজ্ঞা, আত্মমর্যাদা ও ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হলে এসব গুণই মানুষের চরিত্রকে মহৎ করে তোলে।
হে আল্লাহ! আমাদের সত্যবাদী, আমানতদার ও ন্যায়পরায়ণ হওয়ার তৌফিক দান করুন। প্রতারণার শিকার হলে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দিন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যেন আমরা নিজেরাও অন্যায়ের পথে না যাই। আমাদের অন্তরের সততা, মানবিকতা ও ঈমান অটুট রাখুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে ন্যায় ও কল্যাণের পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
৪
৭ মন্তব্য