Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:১৩ অপরাহ্ণ

প্রকৃতির বরপুত্র বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়

নিসর্গপ্রেমী লেখক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। এই জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী মুরাতিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মূলত তিনি উপন্যাস ও ছোটগল্পকার। ছোটবেলা থেকেই তাঁর জীবন কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্যে। ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ তাঁর পরিচিত উপন্যাস। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় শিশুর মতো সরলভাবে চলতে  চেয়েছেন সবসময়। গ্রামীণ সহজ-সরল জীবন আর গ্রাম বাংলার  রূপ তাঁর রচনার প্রধান উপজীব্য বিষয়। পল্লীপ্রকৃতি তাঁকে সবসময় বিস্মিত করেছে। প্রকৃতির কাছাকাছি বাস করা মানুষের জীবনবোধের রূপ-রস-গন্ধে তিনি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। বাংলার মাঠ, নদী, নির্জন দুপুর, গাছপালা, জ্যোৎস্নারাত্রি  নিয়ে আমৃত্যু ভেবেছেন। তিনি তাঁর লেখায় অপু আর দুর্গার যে চরিত্র দাঁড় করিয়েছেন সেসব চরিত্রের মধ্যে ফুটে উঠেছে অগাধ প্রকৃতিপ্রেম। তাঁর মতে মানুষ যেমন রহস্যময় তেমনি প্রকৃতিও রহস্যময়। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যকে তিনি উন্মোচন করেছেন লেখনীর মাধ্যমে। তিনি প্রকৃতির বর্ণনায় সম্পূর্ণ একটা নিজস্বতা দ্বার করিয়েছেন। কবি অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, ‘এমন প্রকৃতি-পাগল সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে বিরল।’

বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় সবসময় প্রকৃতির সাথেই থাকতে ভালোবাসতেন। ‘আরণ্যক’ তার একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। এই গ্রন্থে যদিও তেমন কোনো বিশেষ গল্প বা কাহিনী নেই। বিহারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল আদিম অরণ্যের সাথে বর্ণিত হয়েছে সেখানকার সরল অথচ রহস্যময় মানুষ আর প্রকৃতির কথা। জীবনের বিভিন্ন সময় তিনি অরণ্যে অরণ্যে ঘুরেছেন।  প্রকৃতি দেখা ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি লিখেছেন-  ‘বনে পাহাড়ে’, ‘আরণ্যক’, ‘হে অরণ্য কথা কও’ এবং তাঁর দিনলিপি ‘স্মৃতির রেখা’র মতো কালজয়ী সব গ্রন্থ। তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেছেন। সেটার ওপর ভিত্তি করে লিখেছেন- ‘অভিযাত্রিক।’ কবির অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘চাঁদের পাহাড়’। আফ্রিকা অভিযানের এক রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়েই এই উপন্যাস। প্রকৃতির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা না থাকলে এমন বৃক্ষ ও অরণ্য ঘেরা  উপন্যাস কল্পনা করতে পারতেন না। লেখক তাঁর ‘পুঁইমাচা’ আর ‘মেঘ মল্লার’ মতো ছোটগল্পে প্রকৃতির সাথে জীবনের হাসি-কান্নার ছবি এঁকেছেন।

 

লেখকের ব্যারাকপুরের বাড়িটির ছাউনি ছিল খড়ের। জানা যায়, শুধুমাত্র প্রকৃতির কাছাকাছি থাকবেন বলেই প্রকৃতিপূজারী এই সাহিত্যেক ঘর পাকা করেননি। ‘তৃণাঙ্কুর’ দিনলিপিতে লেখক লিখছেন - ‘জ্যোৎস্নাভরা মাঠে, আকন্দ ফুলের বনে, পাখীর বেলা-যাওয়া উদাস গানে, মাঠের দূর পারে সূর্যাস্তের ছবিতে, ঝরা পাতার রাশির সোঁদা সোঁদা শুকনা শুকনা সুবাসে। প্রকৃতি তাই আমার বড় বিশল্যকরণী- মৃত, মূর্ছিত চেতনাকে জাগ্রত করতে অত বড় ঔষধ আর নাই।’

লেখক আগামী প্রজন্মের জন্য দায়বদ্ধতা অনুভব করেছেন। তিনি জীবনীগ্রন্থ ‘স্মৃতির রেখা’য় প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা যেমন এসেছে তেমনি এসেছে শিশুদের কথা। তিনি প্রকৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়াকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন। প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ পছন্দ করতেন না। তিনি অনেকটা আকাক্সক্ষার জোরে, খেয়ালের বশে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ কমে যাওয়ার প্রতি সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন।  তাইতো আরণ্যক উপন্যাসে বলেছেন- ‘হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়। বিদায় . . .!’

প্রকৃতি রক্ষার দায় থেকে কবি লিখেছেন- ‘কাঠের এই যে টেবিলের ওপর এই লেখাটা লিখছি, এই কাঠ যে এক দিন মহীরুহ শিশুগাছ ছিল, তা নিয়ে কি ভাবার অবকাশ আছে? এই যে দূরত্ব, হত এবং হন্তার মাঝখানে, যা বাজারের বিমূর্ততায় নিয়ত হারিয়ে যেতে থাকে, সেখানে আমাদের নিজস্ব দায় বোঝা প্রয়োজন, কিন্তু সহজ নয়। সত্যচরণ সেখানে হয়তো যুগযুগ ধরে আমাদের প্রতিনিধি, যে নিজের হাতে জঙ্গল সাফ করিয়ে বসতি স্থাপন করে আমাদের দায় আমাদেরই বোঝায়।’

লেখক প্রকৃতি বাঁচাবার ডাক দিয়েছেন। ‘বাঙ্গালী সমাজ যেন পঙ্কময় বদ্ধ জলাশয়’ কবিতায় লিখেছেন এভাবে: ‘বাঙ্গালী সমাজ যেন পঙ্কময় বদ্ধ জলাশয়/নাহি আলো স্বাস্থ্যভরা, বহে হেথা বায়ু বিষময়/জীবন-কোরকগুলি, অকালে শুকায়ে পড়ে ঝরি,/বাঁচাবার নাহি কেহ সকলেই আছে যেন মরি।’

প্রকৃতির এই বরপুত্র স্বল্প সময়ে তিনি যে উপন্যাসগুলো লিখেছিলেন সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু উপন্যাস নিয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে বাংলা গদ্য সাহিত্যের এই মহান শিল্পী ঝাড়খন্ডের ঘাটশিলায় নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। জন্মদিনে আজকের এই দিনে প্রকৃতির বরপুত্রের প্রতি রইলো অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।



মন্তব্য করুন

ব্লগ