শিশু মোহনার চোখে আমার শৈশব!
ট্রেনের জানালার পাশে বসে আছে ছোট্ট, ফুরফুটে একটি মেয়ে। বয়স ছয়-সাত হবে, কিংবা তারও একটু কম। জানালার বাইরে তাকানোর তার কী যে ব্যস্ততা! বারবার একটু উঠে, একটু ঝুঁকে, আবার বসে—বাইরের পৃথিবীটাকে যেন দু’চোখ ভরে দেখে নিতে চায়।
পাশেই তার দাদু। পরনে লুঙ্গি, ফুলহাতা সাদা শার্ট, মুখে হালকা দাড়ি। আর ছোট্ট মেয়েটি দাদুর সঙ্গে একটানা কথা বলে চলেছে। কখনো পাখির মতো চঞ্চল স্বরে, কখনো হাসতে হাসতে। তার কথার যেন শেষ নেই। দাদুও মন দিয়ে শুনছেন। তাদের দুজনকে দেখে মনে হচ্ছিল,এই ছোট্ট পৃথিবীতে এই মুহূর্তে তাদের দুজনের চেয়ে আপন আর কেউ নেই।
কথায় কথায় জানলাম, মেয়েটি তার মায়ের কাছে যাচ্ছে। তার মা খুলনার মরিয়মপাড়ায় থাকেন—আমাদের বাসার খুব কাছেই। ছোটবেলা থেকেই সে কখনো দাদুর কাছে, কখনো মায়ের কাছে থেকে বড় হয়েছে।
মেয়েটির নাম মোহনা বাড়ই। বাবার নাম মঙ্গল বাড়ই, মায়ের নাম ইতি।
নামটা জানার পর কেন যেন মেয়েটার দিকে আরও একটু মন দিয়ে তাকালাম। এতটুকু একটা মানুষ, অথচ তার ছোট্ট জীবনের মধ্যেও কত গল্প! জন্মের পর থেকেই দাদুর কাছে মানুষ—তবুও আজ মায়ের কাছে যাওয়ার আনন্দে তার চোখেমুখে অন্যরকম আলো।
একসময় সে আমার কাছে চলে এলো। কোলে বসলো। হাসলো। কথা বললো। এত সহজে, এত আপন করে কাছে চলে এলো যে আমার ভেতরটাও কেমন নরম হয়ে গেল।
মোহনাকে দেখে হঠাৎ আমি ফিরে গেলাম আমার নিজের শৈশবে।
আমিও তো ছোটবেলায় দাদুর কাছে বড় হয়েছি। তাঁর স্নেহ, তাঁর ছায়া, তাঁর সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্ত,সবকিছু যেন হঠাৎ করে ট্রেনের সেই কামরায় ফিরে এলো। সময় কত দূরে চলে গেছে, মানুষগুলোও কত দূরে চলে গেছে, অথচ শৈশবের কিছু অনুভূতি কখনো দূরে যায় না।
মোহনার প্রতি তাই অকারণেই একটা মায়া জন্ম নিল।
ওকে দেখে মনে হলো, শিশুরা আসলে খুব বেশি কিছু চায় না। একটু আদর, একটু সময়, দুটো কথা মন দিয়ে শোনা—এই সামান্যতেই তাদের পৃথিবী পূর্ণ হয়ে যায়।
তবু কোথাও একটা প্রশ্নও মনে এলো মোহনার কি কখনো একটু কষ্ট হয়?
হয়তো হয়।
মাকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট, কখনো দাদুর কাছে, কখনো মায়ের কাছে থাকা—এই ছোট্ট হৃদয়ে হয়তো এমন কিছু অভিমান জমে থাকে, যা সে নিজেও ভাষায় বলতে পারে না। কিন্তু শিশুরা আশ্চর্য! তারা কষ্টের মধ্যেও হাসতে জানে, অভাবের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে জানে। যত্ন পেলে সেই কষ্টগুলো অনেকটাই নরম হয়ে যায়।
হয়তো দাদুর ভালোবাসা সেই কষ্টকে আগলে রাখে। হয়তো মায়ের অপেক্ষা তাকে টেনে নিয়ে যায় মায়ের কাছে। আর হয়তো মায়েরও বুকের ভেতর একই রকম এক শূন্যতা থেকে যায়—সন্তানকে কাছে না পাওয়ার শূন্যতা।
ট্রেন ছুটে চলছিল। জানালার বাইরে দৃশ্যগুলো একের পর এক পিছিয়ে যাচ্ছিল। আর ছোট্ট মোহনা কখনো জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল, কখনো দাদুর সঙ্গে কথা বলছিল, কখনো আমার কোলে বসে হাসছিল।
আমি শুধু ভাবছিলাম,
জীবন কখনো কখনো মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু ভালোবাসা যদি যত্ন হয়ে পাশে থাকে, তবে দূরত্বও হয়তো খুব বেশি দূরত্ব থাকে না।
আর কিছু শিশুর হাসির ভেতরে লুকিয়ে থাকে এমন কিছু গল্প, যা বড়রা দেখেও পুরোটা বুঝতে পারে না।
মোহনার হাসিটা তাই আমার মনে থেকে গেল।
হয়তো ওর একটু কষ্ট আছে।
কিন্তু সেই কষ্টের চারপাশে যদি থাকে দাদুর মতো একজন মানুষের স্নেহ, মায়ের জন্য বুকভরা ভালোবাসা আর একটু যত্ন—তাহলে শিশুর কষ্টও একদিন মায়ায় পরিণত হয়।
ট্রেন চলে এলো স্টেশনে।
মোহনা চলে গেল তার মায়ের কাছে।
আর আমি ফিরে এলাম আমার নিজের শৈশবের কাছে—আমার দাদুর কাছে।
৪
৪ মন্তব্য