সিনিয়র শিক্ষক
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ
বটতলার আড্ডা আশি আর নব্বই দশকের কথা।
বটতলার আড্ডা
আশি আর নব্বই দশকের কথা।
তখন আমি ছোট—শিশু থেকে ধীরে ধীরে কৈশোরের দিকে পা বাড়াচ্ছি। পৃথিবীটাও যেন তখন অন্যরকম ছিল। সময় ছিল ধীর, মানুষ ছিল সহজ, আর বিকেলগুলো ছিল মানুষের।
ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিকের অলস দুপুর। কিংবা চৈত্রের খাঁ-খাঁ রোদ। মাঠের কাজ কিছুটা থেমেছে, পথঘাটে মানুষের আনাগোনা কম। কাজ সেরে, কিংবা কাজের ফাঁকে, মানুষ একটু স্বস্তির জন্য ছুটে আসতেন গ্রামের সেই বিশাল বটতলায়।
বটগাছটি শুধু একটি গাছ ছিল না।
সে ছিল গ্রামের এক অঘোষিত সংসদ, পাঠশালা, নাট্যমঞ্চ, গল্পের আসর এবং মানুষের মিলনস্থল। তার শিকড় মাটির গভীরে যেমন প্রোথিত ছিল, তেমনি তার ছায়া ছড়িয়ে ছিল মানুষের সম্পর্কের ভেতরেও।
বৃদ্ধ, প্রৌঢ়, যুবক, কিশোর—এমনকি আমাদের মতো শিশুরাও সেখানে জায়গা পেতাম।
বটের ঝুরি নেমে আসত মাটির দিকে। বিশাল ডালপালা মাথার ওপর ছাতা মেলে রাখত। কোথাও চাটাই পাতা, কোথাও খালি মাটিতে বসা। কেউ গাছের শিকড়ে হেলান দিয়ে আছেন, কেউ গোল হয়ে বসেছেন। পান-সুপারির রঙে ঠোঁট লাল, কারও হাতে হুঁকা, আর চারদিকে মানুষের কণ্ঠের ঢেউ।
এক পাশে শুরু হতো পুঁথি পাঠ।
সেসব পুঁথি ছিল আমাদের কাছে অমূল্য সাহিত্য। বইয়ের পাতায় বন্দী নয়—মানুষের কণ্ঠে, স্মৃতিতে আর কল্পনায় বেঁচে থাকা এক আশ্চর্য জগৎ।
একজন পড়তেন, বাকিরা কান পেতে শুনতেন।
শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চোখের সামনে খুলে যেত অদৃশ্য রাজ্য—রাজা, রাজকন্যা, যুদ্ধ, প্রেম, দৈত্য, দানব, অলৌকিক নগরী। আমরা জানতাম না কোনটি ইতিহাস, কোনটি কল্পনা। জানার প্রয়োজনও ছিল না। গল্পের সত্যতা তখন গল্পের আনন্দের কাছে গৌণ।
পাশের গোলটিতে চলত রাজনীতির রমরমা আলাপ।
কীভাবে স্বাধীন হলো আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল। কে কোথায় যুদ্ধ করেছিলেন, কার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়েছিলেন—এসব গল্প বইয়ের পাতার ইতিহাস ছিল না; ছিল মানুষের নিজের দেখা, শোনা ও বয়ে আনা ইতিহাস।
কেউ বলতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা—১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কীভাবে সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন বাংলাদেশের স্থপতি।
অন্য কেউ বলতেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথা—তাঁর রাজনৈতিক জীবন, কৃষক-শ্রমিকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, তাঁর শাসনকাল এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরও নির্মম হত্যার কথা।
মত ছিল ভিন্ন।
তর্ক ছিল।
কখনো কণ্ঠস্বর উঁচুও হতো।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—তর্ক শেষ হলে সম্পর্ক শেষ হতো না।
একই বটের ছায়ায় বসে মানুষ ভিন্ন মত পোষণ করত, আবার একই সন্ধ্যায় পাশাপাশি বাড়ি ফিরত।
আজকের পৃথিবীর কাছে হয়তো এ দৃশ্যটি অবিশ্বাস্য মনে হবে।
বটতলার ওপাশে ছিল আরেক পৃথিবী
বটতলার ঠিক ওপাশেই ছিল একটি বিরাট পুকুর।
গ্রামের একমাত্র স্থায়ী জলাধার।
সেই পুকুর শুধু পানি ধরে রাখত না—ধরে রাখত আমাদের গ্রামের অসংখ্য স্মৃতি।
পুকুরের ঘাটে মা-বোনেরা ধোয়া-পালার কাজ সারতেন। কাপড় ধোয়া, বাসন ধোয়া, সংসারের নানা কাজের ফাঁকে গল্প হতো, হাসি হতো, কখনো দুঃখের কথাও ভাগাভাগি হতো।
ঘাট ছিল তাদের কাজের জায়গা, আবার এক অর্থে ছিল তাদেরও আড্ডাঘর।
আর আমরা?
আমাদের ছিল সম্পূর্ণ অন্য এক পৃথিবী।
বটের ঝুরি ছিল আমাদের সিঁড়ি।
ঝুরি বেয়ে ওপরে উঠতাম। তারপর ডাল ধরে ডাল বেয়ে আরও সামনে এগিয়ে যেতাম। নিচে তখন বিরাট পুকুরের জল।
একটু ভয়।
একটু উত্তেজনা।
আর বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক আনন্দ।
তারপর—
ঝাপ!
সোজা পুকুরের জলে।
একজনের পর একজন।
কে কত উঁচু থেকে ঝাঁপ দিতে পারে, কে কত দূরে গিয়ে পানিতে পড়তে পারে—চলত তারও অঘোষিত প্রতিযোগিতা।
পুকুর ছিল আমাদের সুইমিং পুল।
বটগাছ ছিল আমাদের জিমনেশিয়াম।
বন্ধুরা ছিল আমাদের প্রশিক্ষক।
আর প্রকৃতিই ছিল আমাদের খেলাঘর।
কোনো মোবাইল ছিল না। কোনো ভিডিও গেম ছিল না। কোনো ভার্চুয়াল জগত ছিল না।
ছিল কেবল মাটি, জল, গাছ, আকাশ আর দুরন্ত কৈশোর।
আমাদের শরীর তখন প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলত।
আমরা দৌড়াতাম।
গাছে উঠতাম।
সাঁতার কাটতাম।
পুকুরে ঝাঁপ দিতাম।
পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতাম।
সম্ভবত সেভাবেই আমরা শুধু শরীর নয়—জীবনটাকেও শিখতাম।
তারপর সন্ধ্যা নামত
বিকেল ধীরে ধীরে গড়িয়ে যেত।
বটপাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ আলো এসে পড়ত মাটিতে। পুকুরের জলে সেই আলো ভেঙে ভেঙে সোনালি হয়ে উঠত। পাখিরা ফিরত নীড়ে।
পুঁথির আসর শেষ হতো।
রাজনীতির তর্ক থামত।
ভূতের গল্পের শেষটুকু শুনে আমরা ভয় আর বিস্ময় নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতাম।
সবাই যার যার ঘরে ফিরত।
কেউ কারও শত্রু হয়ে ফিরত না।
পরদিন আবার দেখা হবে—এই সহজ বিশ্বাসটুকু নিয়েই সবাই বিদায় নিত।
আহা, কী সুন্দর ছিল সেই বিকেল!
কী নির্মল ছিল সেই সামাজিক বন্ধন!
তখন মানুষের হাতে পৃথিবী ছিল না, কিন্তু মানুষ ছিল মানুষের কাছে।
আজ মানুষের হাতে পুরো পৃথিবী।
একটি ছোট্ট মুঠোফোনে হাজার হাজার মানুষ, হাজারো খবর, অসংখ্য ছবি, অগণিত বন্ধু।
তবু মানুষ যেন ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে।
তখন আমরা বটের ছায়ায় বসে মানুষের মুখ দেখতাম।
এখন মানুষ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তখন গল্প শুনতাম মানুষের মুখে।
এখন গল্প আসে অ্যালগরিদমের পর্দা থেকে।
তখন কিশোররা বটের ডাল বেয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিত।
এখন তাদের কৈশোরের অনেকখানি ডুবে থাকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে।
তখন বিকেল ছিল আকাশের নিচে।
এখন অনেকের বিকেল বন্দী কয়েক ইঞ্চি কাঁচের ভেতর।
শুধু বটগাছটি হারায়নি
আজ সেই বটতলা নেই।
বটের ঝুরি নেই।
সেই ডাল নেই।
পুকুরটিও আগের মতো নেই।
চাটাই পেতে গোল হয়ে বসার মানুষ নেই।
পুঁথির আসর নেই।
মুখে মুখে গল্প বয়ে নেওয়ার মানুষ নেই।
আর সবচেয়ে কষ্টের কথা—
সেই কিশোরগুলোও নেই।
আমরা শুধু একটি গাছ হারাইনি।
শুধু একটি পুকুর হারাইনি।
শুধু একটি আড্ডা হারাইনি।
আমরা হারিয়েছি একসঙ্গে থাকার একটি সংস্কৃতি।
হারিয়েছি মুখোমুখি বসে কথা বলার অবসর।
হারিয়েছি প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠার স্বাধীনতা।
হারিয়েছি সেই সরল কৈশোর, যে কৈশোরে আনন্দ কিনতে হতো না।
আর কোথাও যেন মানুষের নির্মলতাটুকুও ধীরে ধীরে কূটচাল, সন্দেহ, স্বার্থ আর বিভাজনের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
তখন মতের অমিল ছিল—তবু মানুষ পাশাপাশি বসত।
আজ মতের অমিল কখনো মানুষকে এমনভাবে দূরে ঠেলে দেয়, যেন প্রতিবেশী নয়—শত্রু।
তখন বটগাছ মানুষকে ছায়া দিত।
আজ মানুষের মনেই যেন ছায়া কমে গেছে।
আমি তো সেই সময়ের সাক্ষী
আমি জানি না ইতিহাসের বই এই বটতলার কথা লিখবে কি না।
কোনো নথিতে হয়তো এর উল্লেখ নেই।
কোনো সরকারি প্রতিবেদনে হয়তো লেখা নেই—এই বটের নিচে একসময় মানুষ বিকেল কাটাত, পুঁথি পড়ত, ইতিহাস বলত, গল্প করত, তর্ক করত, হাসত।
কিন্তু তাতে কী?
আমি তো ছিলাম।
আমি সেই বটতলা দেখেছি।
আমি সেই পুকুর দেখেছি।
আমি বটের ঝুরি বেয়ে উঠেছি।
আমি ডাল বেয়ে এগিয়েছি।
আমি সেই ডাল থেকে পুকুরের জলে ঝাঁপ দিয়েছি।
আমি মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা গল্প শুনেছি।
আমি সেই বিকেলের শব্দ শুনেছি।
তাই আমার কাছে এটি কোনো নথির বিষয় নয়।
এটি আমার জীবন থেকে উঠে আসা একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।
আজও কখনো চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য ফিরে আসে।
বৃদ্ধরা গোল হয়ে বসেছেন।
কেউ পুঁথি পড়ছেন।
কেউ মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলছেন।
কেউ বঙ্গবন্ধুর কথা বলছেন।
কেউ জিয়াউর রহমানের কথা বলছেন।
অন্যদিকে কেউ রাক্ষসপুরীর ভৌতিক গল্পে সবাইকে শিহরিত করছেন।
পুকুরঘাটে মা-বোনেরা সংসারের কাজ সারছেন।
আর আমরা কয়েকজন দুরন্ত কিশোর—
বটের ঝুরি বেয়ে ওপরে উঠছি।
ডাল বেয়ে আরও সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।
নিচে পুকুরের গভীর জল।
বুকের ভেতর ধুকপুকানি।
তারপর—
ঝাপ!
জলের ছিটা উঠে সূর্যের শেষ আলোকে ভেঙে দিচ্ছে।
আমাদের হাসি পুকুরের ওপার পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে।
তারপর সন্ধ্যা নামছে।
বাড়ি ফিরছি।
কেউ জানে না—এই সাধারণ একটি বিকেল একদিন আমাদের কাছে এত অসাধারণ হয়ে উঠবে।
আজ বুঝি।
সেই বটগাছটি আসলে শুধু ছায়া দিত না—মানুষকে একত্র করত।
সেই পুকুর শুধু জল দিত না—কৈশোরকে ডানা দিত।
সেই আড্ডা শুধু সময় কাটাত না—সম্পর্ক তৈরি করত।
আর সেই ঝাঁপ?
সেটি শুধু পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া ছিল না।
সেটি ছিল জীবনের দিকে ঝাঁপ দেওয়া।
আজ আমাদের সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন আছে।
কিন্তু সেই বটের ডাল নেই।
তাদের সামনে অসংখ্য ভার্চুয়াল বন্ধু আছে।
কিন্তু সেই বটতলার গোল হয়ে বসা মানুষ নেই।
তাদের কাছে পৃথিবীর অসংখ্য গল্প আছে।
কিন্তু গল্প শোনানোর জন্য পাশে বসে থাকা সেই মানুষটি নেই।
তাই মাঝে মাঝে মনে হয়—
আমরা কি সত্যিই উন্নত হয়েছি?
নাকি শুধু আমাদের চারপাশের জিনিসগুলো আধুনিক হয়েছে, আর ভেতরের মানুষটি একটু একটু করে নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে?
আমি উত্তর খুঁজি না।
শুধু চোখ বন্ধ করি।
দূরে কোথাও বটপাতা নড়ছে।
পুকুরের জলে বিকেলের আলো কাঁপছে।
মা-বোনেরা ঘাটে কাজ করছেন।
বৃদ্ধরা গল্প করছেন।
কেউ পুঁথি পড়ছেন।
কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছেন।
আর আমরা—
বটের ডাল বেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আছি।
নিচে জল।
সামনে বিকেল।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবী থমকে আছে।
তারপর—
ঝাপ!
আজ বুঝি, সেই শব্দটি শুধু পুকুরের জলে পড়ার শব্দ ছিল না।
সেটি ছিল আমাদের শৈশবের শব্দ।
আমাদের কৈশোরের শব্দ।
একটি নির্মল সমাজের শব্দ।
আর আজ সেই শব্দই হয়তো সবচেয়ে বেশি হারিয়ে গেছে।
বটগাছটি কাটা গেছে।
পুকুরটি শুকিয়ে গেছে।
আড্ডা ভেঙে গেছে।
মানুষ দূরে সরে গেছে।
কৈশোর স্ক্রিনে ডুবে গেছে।
তবু স্মৃতির ভেতর সেই পুকুর এখনো আছে।
সেই বটগাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
আর আমি—
আজও সেই ডালের মাথায় দাঁড়িয়ে আছি।
শুধু ঝাঁপ দেওয়ার আগে এবার বুকটা কেঁপে ওঠে অন্য কারণে।
কারণ জানি—
এবার ঝাঁপ দিলে পুকুরে নয়,
ডুবে যাবে একটি পুরো যুগ।
মুফিদুল আলম
রামু,কক্সবাজার
৪
৪ মন্তব্য