সহকারী শিক্ষক
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
একদিন একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বোর্ডে লিখলেন, ‘বাংলাদেশে বন্যা হয় কেন?’ সবাই চুপ। শিক্ষক বললেন, ‘বইয়ে যে উত্তর আছে, সেটিই লিখবে।’ একজন শিক্ষার্থী হাত তুলে বলল, ‘স্যার, আমাদের এলাকায় তো প্রতি বছর বন্যা হয়; কিন্তু বন্যার পানি এলে আমাদের স্কুল বন্ধ হয়ে যায় কেন?’ শিক্ষক কিছুক্ষণ থামলেন। আরেকজন বলল, ‘আমাদের বাড়ির পাশে খালটি ভরাট হয়ে গেছে। এটা কি বন্যার কারণ হতে পারে?’ আরেকজন বলল, ‘বন্যা শুধু দুর্যোগ, নাকি এর সঙ্গে মানুষের কাজও জড়িত?’
হঠাৎ একটি সাধারণ প্রশ্ন বদলে গেল অনেক প্রশ্নে। শ্রেণিকক্ষও বদলে গেল। বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে আলোচনা চলে গেল শিক্ষার্থীদের জীবনে। এ মুহূর্তটিই পাওলো ফ্রেইরের দর্শনের প্রাণ। শিক্ষা শুধু শিক্ষক যা জানেন তা শিক্ষার্থীর মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া নয়। শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের চারপাশকে দেখতে, প্রশ্ন করতে, বুঝতে, নিজের মত প্রকাশ করতে এবং প্রয়োজন হলে পরিবর্তনের পথ খুঁজতে শেখানো।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দর্শন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জগতে বাস করে না। তারা এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে ওঠে যেখানে পরিবার, অর্থনীতি, সামাজিক প্রত্যাশা, পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যৎ পেশা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবী প্রতিদিন তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। তাই আজকের শিক্ষার কাজ শুধু ‘সঠিক উত্তর’ শেখানো নয়; বরং শিক্ষার্থীকে এমন মানসিক শক্তি দেওয়া, যাতে সে অনিশ্চয়তার মধ্যেও শান্তভাবে চিন্তা করতে পারে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গড়ে তুলতে পারে।
মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার
পাওলো ফ্রেইরে এই জায়গাতেই অসাধারণ। তিনি শিক্ষার্থীকে খালি পাত্র মনে করেননি। তার কাছে শিক্ষার্থী একজন মানুষ, যার নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে, প্রশ্ন আছে, অনুভূতি আছে, চিন্তা আছে। শিক্ষকও শুধু বক্তা নন। শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে জ্ঞান অনুসন্ধানের যাত্রায় অংশ নেন। অর্থাৎ শিক্ষক বলবেন না, ‘আমি জানি, তুমি জানো না।’ বরং তিনি এমন পরিবেশ তৈরি করবেন যেখানে দুজনেই বলতে পারেন, ‘চলো, আমরা বিষয়টি বুঝে দেখি।’
এখানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী উত্তর দিতে ভয় পায়। কারণ ভুল উত্তর দিলে হাসাহাসি হতে পারে, শিক্ষক বকা দিতে পারেন, সহপাঠী উপহাস করতে পারে কিংবা পরীক্ষায় নম্বর কমে যেতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করাও বন্ধ করে দেয়। অথচ প্রশ্ন না করার শিক্ষা কখনো গভীর শিক্ষা হতে পারে না।
২
২ মন্তব্য