সহকারী শিক্ষক
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:১৭ পূর্বাহ্ণ
৬৬ হাজার বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার: একটি প্রজন্মে বিনিয়োগ
কলাম
৬৬ হাজার বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার: একটি প্রজন্মে বিনিয়োগ
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় বড় একটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী বছর থেকে দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন এক বেলা পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, বর্তমানে ১৫০টি উপজেলায় ৩০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে নিয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চলছে। এই কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কর্মসূচিটি সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
সংখ্যার বিচারে এটি বিশাল কর্মসূচি। কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু সংখ্যায় নয়। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। সে কারণেই প্রতিমন্ত্রীর একটি বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ- মিড ডে মিল কোনো অনুগ্রহ বা দয়া নয়; বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রতিটি শিশুর এটি অধিকার।
এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ কম। কারণ একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে এনে বই হাতে তুলে দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না। শিশুটি যাতে সুস্থ থাকে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে এবং মনোযোগ দিয়ে শিখতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরিও শিক্ষাব্যবস্থার অংশ। ক্ষুধার সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক একদম সরাসরি। যে শিশু সকালে পর্যাপ্ত খাবার না খেয়ে বিদ্যালয়ে আসে, তার পক্ষে কয়েক ঘণ্টা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি তার শেখার সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে শিক্ষা ও পুষ্টিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
বর্তমান স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ডিম, দুধ, কলা বা মৌসুমি ফল, রুটি ও পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কুটের মতো খাবার দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব খাবারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দৈনিক প্রয়োজনীয় শক্তি, প্রোটিন, চর্বি ও বিভিন্ন অণুপুষ্টির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সামনে রান্না করা মধ্যাহ্নভোজ চালুর মডেলও পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর প্রথম এবং সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ফল হবে শিশুর পুষ্টির উন্নতি। দ্বিতীয় ফলটি আসতে পারে শ্রেণিকক্ষে। পেটের ক্ষুধা কমলে মনোযোগ বাড়বে, ক্লান্তি কমবে এবং পাঠ গ্রহণের সক্ষমতা বাড়বে।
আরেকটি বড় প্রত্যাশা হলো বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া কমানো। সরকার এরই মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে স্কুল ফিডিং অত্যন্ত কার্যকর একটি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর একটি বাড়তি প্রণোদনা তৈরি করবে। এর অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল ফিডিংয়ের চলমান প্রকল্পে এরই মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার কর্মসূচি অনুমোদিত হয়েছে। দেশব্যাপী ১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য কর্মসূচি সম্প্রসারিত হলে স্বাভাবিকভাবেই এর আর্থিক পরিসর আরও বড় হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটি রাষ্ট্রের জন্য বড় ব্যয়। কিন্তু সামাজিক বিনিয়োগের হিসাব শুধু ব্যয়ের খাতায় করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না।
ধরা যাক, একটি নিম্ন আয়ের পরিবারের দুই সন্তান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ে সপ্তাহের পাঁচ দিন তাদের পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা হলে পরিবারের খাদ্যব্যয়ের একটি অংশ সরাসরি সাশ্রয় হবে। দেশের লাখ লাখ পরিবারের ক্ষেত্রে এই সাশ্রয় যোগ করলে এর সামাজিক মূল্য অনেক বড়। এর অর্থনৈতিক সুফল এখানেই শেষ নয়।
১ কোটি ১০ লাখ শিশুর জন্য নিয়মিত খাবার সরবরাহ করতে বিপুল পরিমাণ ডিম, দুধ, চাল, ডাল, সবজি, ফল, মাছসহ বিভিন্ন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের প্রয়োজন হবে। সরকার যদি এসব পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় পর্যায় থেকে সংগ্রহের ব্যবস্থা করে, তাহলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বিশাল ও স্থায়ী বাজার তৈরি করতে পারে। একজন ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তাগুলোর একটি হলো তার উৎপাদিত পণ্যের নিয়মিত ক্রেতা থাকা। হাজার হাজার বিদ্যালয়ের চাহিদার সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকদের যুক্ত করা গেলে সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ আবার গ্রামীণ অর্থনীতিতেই ফিরে যাবে। এখানেই এই কর্মসূচির বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
সরকার একদিকে শিশুর পুষ্টিতে অর্থ ব্যয় করবে, অন্যদিকে সেই অর্থের একটি অংশ কৃষক, খামারি, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় সেবাদাতার আয় হয়ে অর্থনীতিতে ঘুরবে। রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা বিস্তৃত হলে স্থানীয় পর্যায়ে রান্না, পরিবেশন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। সরকার ইতিমধ্যে স্থানীয় বাজার থেকে সবজি, ডিম, মাছসহ খাদ্যপণ্য সংগ্রহ এবং শিক্ষার্থীদের মায়েদের অংশগ্রহণে রান্না করা খাবার সরবরাহের মডেল পরীক্ষার কথা জানিয়েছে। বিশেষ করে মায়েদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাটি সামাজিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এতে একদিকে খাবারের মান ও শিশুদের প্রয়োজনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা তৈরি হবে, অন্যদিকে নারীদের জন্য আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এই কর্মসূচির আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি লাভ জনস্বাস্থ্যে। শিশুকালের অপুষ্টি ভবিষ্যতে নানা শারীরিক সমস্যা, দুর্বল কর্মক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। আজ যদি রাষ্ট্র একটি শিশুর পুষ্টিতে বিনিয়োগ করে, ভবিষ্যতে সেই নাগরিকের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার উন্নতির মাধ্যমে রাষ্ট্র ও পরিবার উভয়ই লাভবান হতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো মানবসম্পদ। বাংলাদেশ এমন একটি সময়ে প্রবেশ করছে, যখন শুধু জনসংখ্যা বেশি থাকা অর্থনৈতিক শক্তির নিশ্চয়তা দেবে না। প্রয়োজন সুস্থ, শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করতে হলে আজকের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুটিকেই আগামী দিনের দক্ষ কর্মী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা কিংবা প্রশাসক হিসেবে তৈরি করতে হবে। সেই প্রস্তুতি শুরু হয় শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশ থেকে।
এ কারণে স্কুল ফিডিংয়ের হাজার হাজার কোটি টাকাকে কেবল সরকারের রাজস্ব বা উন্নয়ন ব্যয়ের একটি অঙ্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর প্রকৃত ফলাফল মাপতে হবে কয়েকটি জায়গায়- শিশুর পুষ্টি কতটা উন্নত হলো, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কতটা বাড়ল, ঝরে পড়া কতটা কমল, শেখার সক্ষমতা কতটা বাড়ল এবং ভবিষ্যতে সেই প্রজন্ম দেশের উৎপাদনশীলতায় কতটা অবদান রাখতে পারল।
অবশ্য এত বড় কর্মসূচিতে খাবারের মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশার কথা, পাইলট পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার এরই মধ্যে এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছে। নিম্নমান বা পচা খাবার সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং দায়ী সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে তদারকিতে সম্পৃক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। দেশব্যাপী সম্প্রসারণের সময় এই জবাবদিহির কাঠামো আরও শক্তিশালী করা গেলে কর্মসূচিটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
৬৬ হাজার বিদ্যালয়ের ১ কোটি ১০ লাখ শিশুর জন্য প্রতিদিন এক বেলা পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা তাই নিছক একটি ‘মিড ডে মিল’ প্রকল্প নয়। এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদকে একই সুতোয় গাঁথার বিরাট সুযোগ। একটি শিশুর হাতে বই এবং তার সামনে এক প্লেট পুষ্টিকর খাবার-এই দুইয়ের সমন্বয়ই হয়তো উন্নয়নের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলোর একটি।
আজ যে অর্থ আমরা শিশুর খাবারে বিনিয়োগ করব, তার প্রতিদান আগামী দিনে পাওয়া যাবে আরও সুস্থ নাগরিক, আরও দক্ষ শ্রমশক্তি, আরও উৎপাদনশীল অর্থনীতি এবং আরও সক্ষম বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। সেই বিবেচনায় ৬৬ হাজার বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবারের পরিকল্পনাটি শুধু একটি ভালো সরকারি উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের ওপর রাষ্ট্রের একটি সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ নির্বিঘ্নে সফল হবে- এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক
ইত্তেফাক
৪
৪ মন্তব্য