সহকারী অধ্যাপক
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ
আল্লাহর সতর্কবাণী ও অবাধ্যতার পরিণতি (সূরা আল-মুলক : ১৭–১৮ নম্বর আয়াতের আলোকে) -মোঃ মুজিবুর রহমান
আল্লাহর সতর্কবাণী ও অবাধ্যতার পরিণতি
(সূরা আল-মুলক : ১৭–১৮ নম্বর আয়াতের আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষ দুনিয়ার জীবনে নানা শক্তি, সামর্থ্য, সম্পদ ও নিরাপত্তার উপায় অর্জন করে অনেক সময় নিজেকে অত্যন্ত নিরাপদ মনে করতে শুরু করে। ঘরবাড়ি, সম্পদ, প্রযুক্তি, জ্ঞান, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পার্থিব নিরাপত্তা—এসবের ওপর ভরসা করে সে কখনো কখনো ভুলে যায় যে, তার জীবন, মৃত্যু, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সবই মহান আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন।
সূরা আল-মুলকের ১৭–১৮ নম্বর আয়াত মানুষকে এই আত্মতুষ্টি থেকে জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন করেন—মানুষ কি এতটাই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আসমানে যিনি আছেন তিনি তাদের ওপর কংকরবর্ষী ঝঞ্ঝা পাঠাবেন না? এরপর পূর্ববর্তী অস্বীকারকারী জাতিগুলোর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে—তারা সত্যকে অস্বীকার করেছিল; অতঃপর আল্লাহর শাস্তি কেমন ছিল!
এই দুই আয়াতে রয়েছে সতর্কতা, শিক্ষা, ইতিহাস, আত্মশুদ্ধির আহ্বান এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার গভীর স্মরণ।
আয়াতের মর্মবাণী
আল্লাহ তাআলা বলেন—
اَمۡ اَمِنۡتُمۡ مَّنۡ فِی السَّمَآءِ اَنۡ یُّرۡسِلَ عَلَیۡكُمۡ حَاصِبًا ؕ فَسَتَعۡلَمُوۡنَ كَیۡفَ نَذِیۡرِ
অর্থাৎ, তোমরা কি এ ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে গেছ যে, আসমানে যিনি কর্তৃত্বশীল তিনি তোমাদের ওপর কংকরবর্ষী ঝঞ্ঝা পাঠাবেন না? তখন তোমরা জানতে পারবে আমার সতর্কবাণী কেমন ছিল।
এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন—
وَ لَقَدۡ كَذَّبَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ فَكَیۡفَ كَانَ نَكِیۡرِ
অর্থাৎ, তাদের পূর্ববর্তীরাও সত্যকে অস্বীকার করেছিল; অতঃপর কেমন ছিল আমার শাস্তি ও প্রত্যাখ্যান!
এখানে মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা রয়েছে—আল্লাহর সতর্কবাণীকে অবহেলা করা কখনো নিরাপত্তার প্রমাণ নয়; বরং অবকাশ পাওয়া অনেক সময় পরীক্ষার অংশ। তাই শাস্তি আসার আগেই সতর্ক হওয়া, ভুল থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করা বুদ্ধিমান মানুষের পরিচয়।
আল্লাহই প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী
এই পৃথিবীতে মানুষ বিভিন্ন শক্তির অধিকারী হলেও তার শক্তি সীমিত। মানুষ পাহাড় কাটতে পারে, সমুদ্র পাড়ি দিতে পারে, আকাশে উড়তে পারে, মহাকাশে যেতে পারে এবং প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতি ঘটাতে পারে; কিন্তু সে নিজের জন্ম নির্ধারণ করতে পারে না, মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না এবং আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নিজের জন্য চূড়ান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ
অর্থাৎ, বলুন, সব কিছুর কর্তৃত্ব কার হাতে?
নিশ্চয়ই সমস্ত কর্তৃত্ব আল্লাহর।
তাই মানুষের জ্ঞান যত বাড়ুক, প্রযুক্তি যত উন্নত হোক, সামর্থ্য যত বৃদ্ধি পাক—তার উচিত নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা এবং মহান আল্লাহর প্রতি বিনয়ী থাকা।
নিরাপত্তা পাওয়া মানেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়
মানুষ অনেক সময় মনে করে, জীবনে কোনো বিপদ আসছে না, ব্যবসা ভালো চলছে, সম্পদ বাড়ছে, স্বাস্থ্য ভালো আছে—তাহলে নিশ্চয়ই সে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে আছে এবং তার কোনো ভয় নেই।
এ ধারণা সবসময় সঠিক নয়।
আল্লাহ কখনো বান্দাকে নিয়ামত দিয়ে পরীক্ষা করেন, আবার কখনো বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। সম্পদ যেমন পরীক্ষা, দারিদ্র্যও পরীক্ষা; সুস্থতা যেমন পরীক্ষা, অসুস্থতাও পরীক্ষা; ক্ষমতা যেমন পরীক্ষা, দুর্বলতাও পরীক্ষা।
কেউ দীর্ঘদিন আরামে থাকলেই সে নিরাপদ—এমন নয়। বরং তাকে দেখতে হবে, সে সেই আরামের সময় আল্লাহকে স্মরণ করছে কি না, তাঁর বিধান মানছে কি না এবং তাঁর দেওয়া নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করছে কি না।
আল্লাহর সতর্কবাণীকে হালকাভাবে নেওয়া বিপজ্জনক
আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলদের মাধ্যমে মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করেছেন। তাঁরা মানুষকে তাওহিদ, ঈমান, ইবাদত, ন্যায়, সততা ও তাকওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন এবং পাপ, জুলুম, শিরক, অহংকার ও অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
তাই সতর্কবাণী মানুষের শত্রু নয়; বরং সতর্কবাণী মানুষের জন্য রহমত।
যেমন একজন চিকিৎসক রোগীকে ক্ষতিকর খাবার থেকে বিরত থাকতে বলেন, একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে ভুলের পরিণতি বোঝান এবং একজন অভিভাবক সন্তানকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেন—তেমনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সতর্কবাণীও মানুষের কল্যাণের জন্য।
যে ব্যক্তি সতর্কবাণী শুনে সংশোধিত হয়, সে প্রকৃতপক্ষে নিজেরই উপকার করে।
অতীতের জাতিগুলোর পরিণতি থেকে শিক্ষা
১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পূর্ববর্তী অস্বীকারকারীদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আল্লাহর রাসূলদের অস্বীকার করেছিল। তাদের কাছে প্রমাণ ও সতর্কতা পৌঁছেছিল, কিন্তু তারা অহংকার ও অবাধ্যতার পথ বেছে নিয়েছিল।
কুরআনে বিভিন্ন জাতির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে—আদ, সামূদ, লূত ও অন্যান্য জাতির ঘটনা। এসব কাহিনি কেবল ইতিহাসের গল্প নয়; এগুলো শিক্ষা ও সতর্কতার আয়না।
আল্লাহ বলেন—
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
অর্থাৎ, হে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরা, তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।
ইতিহাসের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা নেওয়া। অতীতের ভুল যেন বর্তমানের মানুষ পুনরায় না করে—এটাই ইতিহাস স্মরণের অন্যতম শিক্ষা।
লূত সম্প্রদায় ও কংকরবর্ষণের শিক্ষা
কুরআনে লূত আলাইহিস সালামের জাতির ওপর আল্লাহর শাস্তির বিবরণ এসেছে। তারা সীমালঙ্ঘন ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথে অগ্রসর হয়েছিল এবং নবীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর শাস্তি তাদের ওপর নেমে আসে।
এ থেকে বোঝা যায়, সমাজে যখন পাপকে স্বাভাবিক করা হয়, সত্যকে উপহাস করা হয়, নৈতিকতাকে অবজ্ঞা করা হয় এবং আল্লাহর বিধানকে অহংকারের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করা হয়, তখন মানুষকে সতর্ক হওয়া উচিত।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সমসাময়িক কোনো ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহর শাস্তি নেমেছে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া আমাদের কাজ নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং তিনিই জানেন কোন ঘটনা কেন ঘটেছে।
হস্তীবাহিনীর ঘটনাও একটি শিক্ষা
কুরআনে হাতির বাহিনীর ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা পবিত্র কাবা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়েছিল। আল্লাহ তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেন এবং তাদের ওপর পাখির ঝাঁক প্রেরণ করেন, যারা তাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর নিক্ষেপ করেছিল।
এই ঘটনা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—আল্লাহ চাইলে মানুষের বিশাল শক্তিকেও মুহূর্তে পরাজিত করতে পারেন।
তাই শক্তি অর্জন করা দোষ নয়; কিন্তু শক্তির অহংকার করা বিপজ্জনক। জ্ঞান অর্জন করা মহৎ; কিন্তু জ্ঞানের অহংকার ধ্বংসের কারণ হতে পারে। সম্পদ অর্জন করা বৈধ; কিন্তু সম্পদের অহংকার মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অহংকার মানুষের পতনের অন্যতম কারণ
অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। অহংকারী ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করতে চায় না। সে উপদেশকে অপমান মনে করে এবং সতর্কবাণীকে গুরুত্বহীন ভাবতে শুরু করে।
শয়তানের পতনের অন্যতম কারণ ছিল অহংকার। সে আল্লাহর নির্দেশের সামনে বিনয়ী না হয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করেছিল।
তাই মুমিনের চরিত্র হলো বিনয়, সত্য গ্রহণ, উপদেশ গ্রহণ এবং ভুল হলে ফিরে আসা।
অবকাশ পাওয়া মানেই অব্যাহতি নয়
কখনো মানুষ পাপ করে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি পায় না। তখন সে মনে করতে পারে—“কিছুই তো হলো না!”
এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক চিন্তা।
আল্লাহ তাআলা অনেক সময় মানুষকে অবকাশ দেন, যাতে সে তাওবা করে ফিরে আসে। কিন্তু কেউ যদি সেই অবকাশকে অবাধ্যতার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে সে নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনে।
তাই একজন বুদ্ধিমান মানুষ পাপের পর শাস্তি না আসাকে পাপের অনুমোদন মনে করে না; বরং এটিকে তাওবার সুযোগ মনে করে।
তাওবার দরজা খোলা থাকা আল্লাহর মহান রহমত
মানুষ ভুল করবে—এটাই মানবীয় বাস্তবতা। কিন্তু ভুলের পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ
অর্থাৎ, বলুন, হে আমার সেই বান্দারা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।
সুতরাং সূরা আল-মুলকের সতর্কবাণী মানুষের মনে শুধু ভয় সৃষ্টি করার জন্য নয়; বরং ভয়ের সঙ্গে আশাও সৃষ্টি করে—যেন মানুষ শাস্তি আসার আগে ফিরে আসে।
সতর্কতা ও আশার মধ্যে ভারসাম্য
ইসলাম মানুষকে শুধু ভয় দেখায় না, আবার শুধু আশ্বাসও দেয় না। ইসলাম ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য শেখায়।
আল্লাহর শাস্তির ভয় মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে।
আল্লাহর রহমতের আশা মানুষকে তাওবার দিকে ফিরিয়ে আনে।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা মানুষকে ইবাদতে উৎসাহিত করে।
একজন মুমিন তাই আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী থাকবে, আবার তাঁর শাস্তির ব্যাপারে সতর্কও থাকবে।
বিপদে পড়ার আগেই শিক্ষা গ্রহণ
আয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—শাস্তি প্রত্যক্ষ করার আগেই সতর্ক হতে হবে।
কারণ বিপদ আসার পরে সত্য উপলব্ধি করা সবসময় উপকারী হয় না। মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের উপলব্ধি অনেক সময় তার কোনো কাজে আসে না। কিয়ামতের দিন সত্য স্পষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু তখন নতুন করে আমল করার সুযোগ থাকবে না।
তাই সুযোগ থাকা অবস্থায় ঈমান, তাওবা, সালাত, সৎকর্ম ও চরিত্র সংশোধনের দিকে ফিরে আসতে হবে।
মানুষের নিরাপত্তার প্রকৃত ভিত্তি
প্রকৃত নিরাপত্তা শুধু শক্তিশালী দেয়াল, উন্নত প্রযুক্তি, ব্যাংকের অর্থ, সামাজিক ক্ষমতা কিংবা বাহ্যিক নিরাপত্তায় নয়।
প্রকৃত নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হলো—
- বিশুদ্ধ ঈমান;
- তাওহিদের ওপর অটল থাকা;
- আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল;
- ফরজ ইবাদত পালন;
- গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা;
- তাওবা ও ইস্তিগফার;
- মানুষের অধিকার রক্ষা;
- ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা;
- অহংকার পরিত্যাগ;
- বিপদে ধৈর্য ধারণ;
- নিয়ামতের সময় শুকরিয়া আদায়।
যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করে, সে দুনিয়ার সব বিপদ থেকে মুক্ত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই; তবে সে বিপদের মধ্যেও ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শক্তি পায়।
সমাজের জন্য শিক্ষা
এই আয়াত শুধু ব্যক্তির জন্য নয়; সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
একটি সমাজে যদি—
সত্যের পরিবর্তে মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়,
ন্যায়ের পরিবর্তে জুলুম চলে,
আমানতের পরিবর্তে বিশ্বাসঘাতকতা হয়,
শালীনতার পরিবর্তে অশ্লীলতা ছড়ায়,
সততার পরিবর্তে প্রতারণা চলে,
দুর্বলদের অধিকার হরণ করা হয়,
অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হয়,
এবং আল্লাহর বিধানকে অবজ্ঞা করা হয়—
তাহলে সেই সমাজের মানুষকে আত্মসমালোচনা করতে হবে।
তবে কোনো দুর্যোগকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট গুনাহের নিশ্চিত শাস্তি বলে ঘোষণা না করে কুরআনের শিক্ষার আলোকে নিজেদের সংশোধন করাই মুমিনের কর্তব্য।
বর্তমান জীবনে আয়াত দুটির প্রয়োগ
আজকের মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক উন্নতি করেছে। কিন্তু উন্নতি যেন তাকে আল্লাহবিমুখ না করে।
আকাশে বিমান উড়ছে—এটি আল্লাহর সৃষ্টি ও মানুষের জন্য তাঁর দেওয়া জ্ঞানের একটি ব্যবহার হতে পারে। সমুদ্রের গভীরতা মানুষ অনুসন্ধান করছে—এটিও আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন নিয়ে চিন্তার সুযোগ।
কিন্তু এসব উন্নতি যেন মানুষের মনে এই ধারণা সৃষ্টি না করে যে, সে আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
মানুষ যত উন্নত হবে, তার বিনয় তত গভীর হওয়া উচিত।
দুর্যোগ আমাদের কী শেখায়?
ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, বজ্রপাত, খরা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে তার সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এগুলো কখনো মানুষের জন্য পরীক্ষা, কখনো সতর্কতা, কখনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর শাস্তি বলে ঘোষণা করা সঠিক নয়, যদি তার ব্যাপারে ওহির স্পষ্ট দলিল না থাকে।
তবে প্রতিটি বিপদ মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ হতে পারে—
আমি কি আল্লাহকে ভুলে গেছি?
আমি কি আমার গুনাহ থেকে ফিরে এসেছি?
আমি কি মানুষের হক নষ্ট করেছি?
আমি কি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি?
আমি কি আমার পরিবারকে সৎ পথে পরিচালিত করছি?
আমি কি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত?
এ ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সংশোধনের পথে নিয়ে যায়।
কুরআনের সতর্কবাণী—জীবনের জন্য পথনির্দেশ
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; এটি জীবন পরিচালনার হিদায়াত।
আল্লাহর সতর্কবাণী শুনে যার হৃদয় নরম হয়, সে সৌভাগ্যবান। আর যে ব্যক্তি বারবার সতর্কতা শুনেও অহংকারে অটল থাকে, তার জন্য বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
তাই কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি তার অর্থ বোঝা, শিক্ষা গ্রহণ করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
পরিবারে এই শিক্ষা
অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি সাফল্যের শিক্ষা না দিয়ে আল্লাহভীতি, নৈতিকতা, সত্যবাদিতা ও জবাবদিহির শিক্ষা দেওয়া।
সন্তানকে বোঝাতে হবে—
আল্লাহ আমাদের দেখেন।
আল্লাহ আমাদের কথা শোনেন।
আল্লাহ আমাদের কাজ জানেন।
একদিন আমাদের কাজের হিসাব দিতে হবে।
এই চেতনা শিশুর চরিত্রকে ভেতর থেকে সুন্দর করে।
শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা
শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে—জ্ঞান মানুষের মর্যাদা বাড়ায়, কিন্তু জ্ঞান যদি অহংকার সৃষ্টি করে, তাহলে সেই জ্ঞান কল্যাণের বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে বিনয়, শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতি অর্জন করতে হবে।
পরীক্ষায় সাফল্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জীবনের পরীক্ষায় সফল হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। দুনিয়ার পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যায়; কিন্তু আখিরাতের পরীক্ষার ফল নির্ধারিত হবে ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে।
ক্ষমতাবানদের জন্য শিক্ষা
যার হাতে ক্ষমতা আছে, তার মনে রাখা উচিত—ক্ষমতা স্থায়ী নয়।
আজ যে শাসক, কাল সে সাধারণ মানুষ।
আজ যে ধনী, কাল সে নিঃস্ব হতে পারে।
আজ যে শক্তিশালী, কাল সে দুর্বল হতে পারে।
আজ যে জীবিত, কাল সে মৃত হতে পারে।
অতএব ক্ষমতা মানুষের জন্য আমানত। ক্ষমতার অপব্যবহার, জুলুম ও অন্যায় থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
সম্পদশালীদের জন্য শিক্ষা
সম্পদ আল্লাহর নিয়ামত। কিন্তু সম্পদ যদি মানুষকে অহংকারী করে, দরিদ্রের অধিকার ভুলিয়ে দেয় এবং আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাহলে সেই সম্পদ কল্যাণের কারণ থাকে না।
মুমিনের সম্পদ তাকে দানশীল করবে, কৃপণ নয়; বিনয়ী করবে, অহংকারী নয়; মানুষের উপকারী করবে, অত্যাচারী নয়।
গুনাহ থেকে ফিরে আসার আহ্বান
এই দুই আয়াতের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের জীবন পর্যালোচনা করা।
যে সালাত অবহেলা করছে—সে সালাতে ফিরে আসুক।
যে গুনাহে জড়িয়ে আছে—সে তাওবা করুক।
যে মানুষের হক নষ্ট করেছে—সে তা ফিরিয়ে দিক।
যে অন্যায় করেছে—সে ক্ষমা চেয়ে সংশোধন করুক।
যে অহংকারে ডুবে আছে—সে বিনয়ী হোক।
যে আল্লাহকে ভুলে গেছে—সে আবার আল্লাহকে স্মরণ করুক।
কারণ সতর্কবার্তার সবচেয়ে সুন্দর উত্তর হলো সংশোধন।
মৃত্যুর আগে প্রস্তুতি
মানুষ জানে না তার মৃত্যু কখন আসবে। তাই আগামীকাল তাওবা করব, পরে নামাজ শুরু করব, পরে ভালো মানুষ হব—এভাবে সময় নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আজকের তাওবা আগামীকালের তাওবার চেয়ে নিরাপদ।
আজকের সৎকর্ম আগামীকালের সৎকর্মের অপেক্ষার চেয়ে উত্তম।
আজকের সংশোধন আগামীকালের অনিশ্চিত সুযোগের চেয়ে মূল্যবান।
তাই আল্লাহর সতর্কবাণী শুনে এখনই ফিরে আসতে হবে।
উপসংহার
সূরা আল-মুলকের ১৭–১৮ নম্বর আয়াত মানুষের হৃদয়ে গভীর সতর্কতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন—তোমরা নিজেদের এত নিরাপদ মনে করো না যে, আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে চলে গেছ। তিনি চাইলে আকাশ থেকে এমন ঝঞ্ঝা পাঠাতে পারেন, যা মানুষের সমস্ত অহংকারকে মুহূর্তে ভেঙে দিতে পারে। অতীতের অস্বীকারকারী জাতিগুলোর ঘটনাও এর বাস্তব শিক্ষা বহন করে।
তবে এই আয়াতের উদ্দেশ্য মানুষকে হতাশ করা নয়; বরং তাকে জাগিয়ে তোলা। শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে তাকে তাওবার পথে ফেরানো। সতর্ক করে তাকে নিরাপদ পথ দেখানো।
অতএব আমাদের কর্তব্য হলো—আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় করা, তাঁর বিধান মেনে চলা, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আখিরাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।
নিরাপত্তা অহংকারে নয়—আল্লাহর আনুগত্যে।
সাফল্য অবাধ্যতায় নয়—তাকওয়ায়।
মুক্তি গাফিলতিতে নয়—তাওবায়।
আর প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো—শাস্তি আসার আগে সতর্কবাণী থেকে শিক্ষা নেওয়া।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে আপনার স্মরণে জীবন্ত রাখুন। আপনার সতর্কবাণী শুনে যারা সংশোধিত হয়, আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। অহংকার, অবাধ্যতা, জুলুম ও গুনাহ থেকে আমাদের রক্ষা করুন। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন, তাওবার তাওফিক দিন, ঈমানের ওপর অটল রাখুন এবং দুনিয়ার পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে আখিরাতে আপনার রহমত ও জান্নাত লাভের তাওফিক দান করুন।
আমিন।
৪
৪ মন্তব্য