সহকারী অধ্যাপক
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:০৮ পূর্বাহ্ণ
নতুন প্রজন্মের মধ্যে কেন কমছে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সহ্যশক্তি?
একসময় স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা মানসিক ক্লান্তিকে বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রভাব হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যেও এসব সমস্যা ক্রমেই বেশি দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শদাতা প্ল্যাটফর্ম হেলথ শটস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত ঘুমের পরও অনেক তরুণ মানসিকভাবে ক্লান্ত বোধ করেন। ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাওয়া, মিটিং বা কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা আগের তুলনায় ধীরে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো সমস্যার কথাও অনেকে জানান। এসব উপসর্গকে অনেক সময় ‘ব্রেইন বার্নআউট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম ও মাল্টিটাস্কিংয়ের প্রভাব
আধুনিক জীবনযাত্রায় মস্তিষ্ককে প্রায় সব সময়ই নানা ধরনের উদ্দীপনার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। নোটিফিকেশন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, একসঙ্গে একাধিক কাজ করা, কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং সারাক্ষণ অনলাইনে থাকার অভ্যাস মস্তিষ্ককে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দিচ্ছে না।
ভারতের নয়ডার ফোর্টিস হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট ডা. নেহা পণ্ডিতার মতে, মস্তিষ্কের যেমন গভীর মনোযোগের প্রয়োজন, তেমনি স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরে পেতেও পর্যাপ্ত বিশ্রাম দরকার।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মস্তিষ্ককে যখন এক কাজ থেকে দ্রুত অন্য কাজে বারবার যেতে হয়, তখন তার কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। এর ফলে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে, স্মৃতি থেকে তথ্য মনে করার প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে এবং মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস ও কর্টিসলের ভূমিকা
মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার পাশাপাশি মানসিক সহ্যশক্তি হ্রাসের অন্যতম কারণ দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ। অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের ফলে শরীরে কর্টিসলসহ স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শেখা, স্মৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যক্রমে।
ফলে কোনো কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা, বারবার বিষয় ভুলে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ এবং মাথা ঝাপসা লাগার মতো অনুভূতি দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সমস্যা সাময়িক হলেও যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে কর্মক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জীবনযাপনের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতার সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনযাপনের অভ্যাসেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শরীরচর্চা না করা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে স্মৃতি সংরক্ষণ ও মানসিক ক্লান্তি কাটাতে পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টানা কয়েক রাতের অপর্যাপ্ত ঘুমও মানসিক তীক্ষ্ণতা ও উৎপাদনশীলতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্রেইন বার্নআউট থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়?
স্বস্তির বিষয় হলো, সময়মতো জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে ব্রেইন বার্নআউট থেকে অনেকটাই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। এজন্য প্রতি রাতে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ভালো ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সুষম খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
খাদ্যতালিকায় ফলমূল, শাকসবজি, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখা উচিত। পাশাপাশি শরীরকে পর্যাপ্ত পানিতে হাইড্রেটেড রাখাও জরুরি, কারণ পানিশূন্যতা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
একসঙ্গে অনেক কাজ করার বদলে নির্দিষ্ট একটি কাজে মনোযোগ দেওয়া, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের মাঝে বিরতি নেওয়া এবং কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পর অফিসের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সীমা তৈরি করাও উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত মাইন্ডফুলনেস, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ও মেডিটেশনের পরামর্শ দিয়েছেন। এসব অভ্যাস মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি মনোযোগ বৃদ্ধিতেও সহায়তা করতে পারে। এর সঙ্গে বাইরে কিছুটা সময় কাটানো, নিজের পছন্দের শখ চর্চা করা এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখাও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি বা মানসিক ক্লান্তিকে দীর্ঘদিন ধরে শুধু ব্যস্ততা কিংবা কাজের চাপের ফল হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। যদি এসব সমস্যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে এবং দৈনন্দিন কাজ, ঘুম, আচরণ বা মেজাজে প্রভাব ফেলে, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ একই ধরনের উপসর্গ কখনো কখনো পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়াও শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্নের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্রেইন বার্নআউটের প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা তরুণদের দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগ, উৎপাদনশীলতা ও মানসিক সহনশীলতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
৪
৪ মন্তব্য