সহকারী অধ্যাপক
০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৫২ পূর্বাহ্ণ
অন্তর আছে, তবু উপলব্ধি নেই
অন্তর আছে, তবু উপলব্ধি নেই
মহান আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জিনকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে দিয়েছেন বিবেক, বুদ্ধি, হৃদয়, চোখ ও কান। দিয়েছেন সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ এবং কল্যাণ-অকল্যাণ বোঝার সামর্থ্য। দিয়েছেন আসমানি কিতাব, নবী-রাসুল ও হিদায়াতের পথনির্দেশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক মানুষ এসব নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহার না করে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, প্রবৃত্তির অনুসরণ ও গাফেলতিতে ডুবে থাকে। ফলে তারা সত্য দেখেও গ্রহণ করে না, সত্যের কথা শুনেও তা থেকে শিক্ষা নেয় না এবং অন্তর দিয়ে আল্লাহর নিদর্শন উপলব্ধি করে না।
এই বাস্তবতার প্রতি গভীর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আ‘রাফের ১৭৯ নম্বর আয়াতে। মহান আল্লাহ বলেন—
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ ۖ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا ۚ أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
অর্থ: “আর আমরা তো বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই হচ্ছে গাফেল।”
—সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১৭৯
এই আয়াত মানুষের দেহগত অক্ষমতার কথা বলছে না; বরং সত্য উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে তার অন্তর, সত্যের নিদর্শন দেখার ক্ষেত্রে তার চোখ এবং হিদায়াতের বাণী গ্রহণের ক্ষেত্রে তার কান অকার্যকর হয়ে যাওয়ার কথা বলছে।
জ্ঞান ও বিবেকের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে
মানুষকে আল্লাহ তাআলা শুধু খাওয়া, পান করা, ঘুমানো ও পার্থিব জীবন উপভোগ করার জন্য সৃষ্টি করেননি। মানুষের জীবনের একটি মহান উদ্দেশ্য রয়েছে। আল্লাহর পরিচয় লাভ করা, তাঁর ইবাদত করা, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং ন্যায়-সৎ জীবনযাপন করাই মানুষের প্রকৃত সফলতার পথ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
অর্থ: “আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।”
—সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬
অতএব মানুষের হৃদয়, চোখ, কান ও বুদ্ধি—সবই আল্লাহর দেওয়া আমানত। এসব নিয়ামতকে আল্লাহর পরিচয়, তাঁর নিদর্শন এবং তাঁর হিদায়াত লাভের কাজে ব্যবহার করাই মানুষের কর্তব্য।
“জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি”—এর প্রকৃত অর্থ
আয়াতে বলা হয়েছে—
“আমরা তো বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি।”
এ কথার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে অন্যায়ভাবে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য সৃষ্টি করেছেন কিংবা কাউকে কোনো অপরাধ ছাড়াই শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বরং আয়াতের পরবর্তী অংশেই বোঝানো হয়েছে—কোন ধরনের মানুষ নিজেদের কর্মের মাধ্যমে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়।
আল্লাহ মানুষকে বিবেক দিয়েছেন, সত্য বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন, চোখ-কান দিয়েছেন এবং হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন। কিন্তু যারা এসব নিয়ামতকে সত্য গ্রহণের কাজে ব্যবহার করে না, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে এবং অবাধ্যতা ও গাফেলতিতে জীবন কাটায়, তারা নিজেদের কর্মের মাধ্যমে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে যায়।
অতএব মানুষের জাহান্নামে যাওয়া আল্লাহর জুলুম নয়; বরং তার নিজের কৃতকর্মের পরিণতি। আল্লাহ তাআলা কারও প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না।
অন্তর আছে, কিন্তু উপলব্ধি নেই
আল্লাহ বলেন—
لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا
অর্থ: “তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না।”
এখানে অন্তর বলতে শুধু শরীরের একটি অঙ্গ বোঝানো হয়নি; বরং মানুষের চিন্তা, বিবেক, অনুভূতি ও সত্য উপলব্ধির ক্ষমতাকেও বোঝানো হয়েছে।
একজন মানুষ অসংখ্য বই পড়তে পারে, অনেক তথ্য জানতে পারে, দুনিয়াবি বিষয়ে অত্যন্ত বুদ্ধিমান হতে পারে; কিন্তু যদি সে আল্লাহর পরিচয় লাভ না করে, সত্যকে গ্রহণ না করে এবং নিজের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন না হয়, তবে তার জ্ঞান তাকে প্রকৃত কল্যাণ দিতে পারে না।
প্রকৃত জ্ঞান হলো যে জ্ঞান মানুষকে আল্লাহভীরু করে, সত্যের পথে পরিচালিত করে এবং সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
অর্থ: “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে যথার্থভাবে ভয় করে।”
—সূরা ফাতির, ৩৫:২৮
সুতরাং হৃদয়ের প্রকৃত জাগরণ হলো আল্লাহর স্মরণ, কুরআনের শিক্ষা এবং সত্যের প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অন্তরকে জীবন্ত করা।
চোখ আছে, কিন্তু সত্য দেখে না
আল্লাহ বলেন—
وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا
অর্থ: “তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না।”
এখানে তারা শারীরিকভাবে অন্ধ—এমন কথা বলা হয়নি। তারা চোখ দিয়ে পৃথিবীর অসংখ্য দৃশ্য দেখে; কিন্তু আল্লাহর নিদর্শন দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না।
মানুষ আকাশের বিশালতা দেখে, সূর্য-চন্দ্রের নিয়মিত গতি দেখে, পৃথিবীর বিস্ময়কর সৃষ্টি দেখে, নিজের শরীরের অসাধারণ গঠন দেখে—কিন্তু এসবের স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধি না করলে তার দৃষ্টি পূর্ণ হয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَفَلَا يَنظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ
অর্থ: “তারা কি উটের দিকে তাকায় না—কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে?”
—সূরা আল-গাশিয়াহ, ৮৮:১৭
অতএব মুমিনের চোখ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে না; সে সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার কুদরত ও হিকমত উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।
কান আছে, কিন্তু হিদায়াতের কথা শোনে না
আল্লাহ বলেন—
وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا
অর্থ: “তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না।”
মানুষ শব্দ শুনতে পারে; কিন্তু সব শোনা সমান নয়। কানে শব্দ প্রবেশ করলেই সত্য গ্রহণ করা হয় না। কুরআনের আয়াত শোনা, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর শিক্ষা শোনা এবং নসিহত গ্রহণ করাই হলো উপকারী শ্রবণ।
অনেক মানুষ সত্য কথা শুনে; কিন্তু নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার, স্বার্থ ও দুনিয়ার মোহের কারণে তা গ্রহণ করে না। এটাই আয়াতে নিন্দিত গাফেলত।
মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে সত্য কথা শুনে এবং তার উত্তম অনুসরণ করে।
আল্লাহ বলেন—
فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ
অর্থ: “অতএব আমার বান্দাদের সুসংবাদ দিন, যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার মধ্যে উত্তমটির অনুসরণ করে।”
—সূরা আয-যুমার, ৩৯:১৭–১৮
মানুষ যখন শুধু দেহের চাহিদায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়
আয়াতে বলা হয়েছে—
أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ
অর্থ: “তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো।”
জন্তুর জীবন মূলত তার স্বাভাবিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও বংশবৃদ্ধি—এসব তার জীবনের স্বাভাবিক চাহিদা।
কিন্তু মানুষকে আল্লাহ বিবেক, বুদ্ধি ও শরিয়তের দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাই মানুষের জীবন যদি কেবল খাদ্য, অর্থ, সম্পদ, ভোগ-বিলাস, ক্ষমতা ও পার্থিব আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং সে নিজের স্রষ্টা, পরকাল ও জবাবদিহির কথা ভুলে যায়, তাহলে সে তার মানবিক মর্যাদা নষ্ট করে।
মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব তার দেহে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা ও সৎকর্মে।
“বরং তারা আরও অধিক পথভ্রষ্ট”
আল্লাহ আরও বলেন—
بَلْ هُمْ أَضَلُّ
অর্থ: “বরং তারা আরও অধিক পথভ্রষ্ট।”
এটি অত্যন্ত কঠিন সতর্কবার্তা। পশু আল্লাহর দেওয়া স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলে। তার ওপর শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য নয় এবং তাকে কিয়ামতের দিন মানুষের মতো আমলের হিসাব দিতে হবে না।
কিন্তু মানুষকে আল্লাহ বিবেক দিয়েছেন, নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন, কিতাব নাজিল করেছেন এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন। এরপরও যদি সে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তার অবস্থা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
তাই মানুষকে শুধু মানুষ হয়ে জন্ম নিলেই হবে না; তাকে সত্যিকারের মানবিক ও আল্লাহভীরু মানুষ হতে হবে।
গাফেলত কী?
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে—
أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
অর্থ: “তারাই হচ্ছে গাফেল।”
গাফেলত হলো আল্লাহ, তাঁর বিধান, নিজের দায়িত্ব এবং পরকালের জবাবদিহি সম্পর্কে অসচেতন হয়ে পড়া।
গাফেল মানুষ দুনিয়ার জন্য পরিকল্পনা করে, কিন্তু আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেয় না। সম্পদ বৃদ্ধির চিন্তা করে, কিন্তু আমল বৃদ্ধির চিন্তা করে না। ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করে, কিন্তু কবর ও আখিরাতের জন্য সৎকর্ম সঞ্চয় করে না।
অথচ দুনিয়ার জীবন অস্থায়ী এবং আখিরাত চিরস্থায়ী।
গাফেলতার প্রধান কারণ
মানুষের গাফেলতার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
১. দুনিয়ার মোহ
অতিরিক্ত দুনিয়ামুখিতা মানুষের অন্তরকে আখিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অর্থ ও সম্পদ নিজে খারাপ নয়; কিন্তু যখন এগুলো মানুষের জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে যায়, তখন বিপদ সৃষ্টি হয়।
২. প্রবৃত্তির অনুসরণ
নিজের ইচ্ছাকে সত্যের ওপর প্রাধান্য দিলে মানুষ ধীরে ধীরে আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরে যায়।
৩. অহংকার
অহংকারী ব্যক্তি সত্য কথা শুনলেও তা গ্রহণ করতে চায় না। সে মনে করে, তার নিজের মতই সর্বদা সঠিক।
৪. পাপের প্রতি আসক্তি
বারবার পাপ করতে করতে মানুষের অন্তর কঠিন হয়ে যেতে পারে। ফলে নসিহত তার ওপর আগের মতো প্রভাব ফেলে না।
৫. আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকা
আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকা অন্তরকে দুর্বল করে দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহর জিকির অন্তরকে প্রশান্ত ও জীবন্ত করে।
আল্লাহ বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
অর্থ: “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।”
—সূরা আর-রা‘দ, ১৩:২৮
গাফেলতার বিপরীত হলো জাগ্রত হৃদয়
একজন মুমিনের অন্তর জীবন্ত থাকে। সে নিজের ভুল বুঝতে পারে, তাওবা করতে পারে, নসিহত গ্রহণ করতে পারে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَذِكْرَىٰ لِمَن كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ
অর্থ: “নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার অন্তর আছে অথবা যে মনোযোগ দিয়ে শোনে।”
—সূরা কাফ, ৫০:৩৭
অতএব আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্তরকে জাগ্রত রাখা, চোখকে সত্য দেখার উপযোগী করা এবং কানকে হক কথা শোনার উপযোগী করা।
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা
গাফেলতা দূর করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায় হলো কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা। শুধু তিলাওয়াত নয়; কুরআনের অর্থ বোঝা, শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
কুরআন মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে। এটি মানুষকে তার স্রষ্টার পরিচয় দেয়, দুনিয়ার প্রকৃত স্বরূপ জানায় এবং আখিরাতের প্রস্তুতির পথ দেখায়।
তাই প্রতিদিন কুরআন পড়া, অর্থ বোঝা এবং নিজের জীবনের সঙ্গে তার শিক্ষা মিলিয়ে দেখা একজন মুসলিমের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
নিজের আমলের হিসাব নেওয়া
গাফেলতা থেকে মুক্তির জন্য মানুষকে নিয়মিত আত্মসমালোচনা করতে হবে।
নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—
আমি কেন সৃষ্টি হয়েছি?
আমি কি আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলছি?
আমার নামাজের অবস্থা কেমন?
আমার উপার্জন হালাল কি না?
আমি কি মানুষের হক নষ্ট করছি?
আমার জবান কি গীবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতা থেকে নিরাপদ?
আমি কি কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করছি?
মৃত্যু যদি আজই আসে, আমি কি প্রস্তুত?
এ ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে গাফেলতা থেকে জাগিয়ে তুলতে পারে।
তাওবা ও প্রত্যাবর্তনের দরজা খোলা
মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে ভুলের ওপর স্থির থাকে না; বরং আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ
অর্থ: “বলুন, ‘হে আমার সে বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’”
—সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩
সুতরাং গাফেলতার উপলব্ধি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করতে হবে। পাপ ছেড়ে দিতে হবে, অনুতপ্ত হতে হবে এবং ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
পরিবার ও সমাজে এই শিক্ষার প্রয়োগ
এই আয়াত শুধু ব্যক্তিগত সংশোধনের জন্য নয়; পরিবার ও সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি শিক্ষা নয়, ঈমান, আকিদা, ইবাদত, নৈতিকতা ও আখিরাতের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া।
শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সত্যনিষ্ঠা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ শেখানো।
সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত অন্যকে হিদায়াতের পথে উৎসাহিত করা এবং সৎকাজে সহযোগিতা করা।
তবে নসিহত হতে হবে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও উত্তম পদ্ধতিতে। কাউকে অপমান বা হেয় করা নয়; বরং ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতার মাধ্যমে সত্যের দিকে আহ্বান করাই ইসলামের সুন্দর পদ্ধতি।
আধুনিক জীবনে আয়াতটির প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান যুগে মানুষের তথ্য ও জ্ঞান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর মুহূর্তে অন্য প্রান্তে জানতে পারে। প্রযুক্তি মানুষের চোখ ও কানকে অসংখ্য তথ্যের সামনে উন্মুক্ত করেছে।
কিন্তু তথ্যের আধিক্য সবসময় হিদায়াতের নিশ্চয়তা দেয় না।
মানুষ যদি হাজারো তথ্য জানে, অথচ নিজের স্রষ্টাকে ভুলে যায়; অসংখ্য দৃশ্য দেখে, অথচ আল্লাহর নিদর্শন থেকে শিক্ষা না নেয়; অসংখ্য বক্তব্য শোনে, অথচ সত্যের আহ্বানে সাড়া না দেয়—তাহলে সে এই আয়াতের সতর্কবার্তা থেকে মুক্ত নয়।
তাই প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে আল্লাহর নাফরমানির উপকরণ না বানিয়ে কল্যাণ, শিক্ষা ও সত্য প্রচারের কাজে ব্যবহার করা উচিত।
আমাদের করণীয়
সূরা আল-আ‘রাফের ১৭৯ নম্বর আয়াত আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরে—
প্রথমত, আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, নিজের হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণে জীবন্ত রাখতে হবে।
চতুর্থত, চোখকে হারাম দৃষ্টি থেকে সংযত রেখে আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে হবে।
পঞ্চমত, কানকে মিথ্যা, গীবত, অশ্লীলতা ও অনর্থক কথা থেকে হেফাজত করতে হবে এবং কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
ষষ্ঠত, প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে আল্লাহর বিধানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সপ্তমত, প্রতিদিন নিজের আমলের হিসাব নিতে হবে।
অষ্টমত, ভুল হলে দ্রুত তাওবা করতে হবে।
নবমত, মৃত্যু ও আখিরাতের কথা স্মরণ করতে হবে।
দশমত, জ্ঞান অর্জন করে তা আমলে পরিণত করতে হবে।
উপসংহার
সূরা আল-আ‘রাফের ১৭৯ নম্বর আয়াত মানবজাতির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। মানুষের অন্তর, চোখ ও কান আল্লাহর অমূল্য নিয়ামত। এগুলোর প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন মানুষ এগুলোকে সত্য উপলব্ধি, আল্লাহর নিদর্শন পর্যবেক্ষণ এবং হিদায়াতের বাণী গ্রহণের কাজে ব্যবহার করে।
শুধু চোখ থাকা যথেষ্ট নয়—সত্য দেখার দৃষ্টি চাই।
শুধু কান থাকা যথেষ্ট নয়—হক কথা শোনার মন চাই।
শুধু হৃদয় থাকা যথেষ্ট নয়—সত্য উপলব্ধি করার জাগ্রত অন্তর চাই।
শুধু জ্ঞান থাকা যথেষ্ট নয়—জ্ঞান অনুযায়ী আমল চাই।
যে মানুষ আল্লাহর দেওয়া বিবেক ও ইন্দ্রিয়গুলোকে সত্যের পথে ব্যবহার করে, কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে, তাওবা করে এবং সৎকর্মে জীবন সাজায়—সে গাফেল নয়; বরং সে হিদায়াতপ্রাপ্তির পথে অগ্রসরমান।
অন্যদিকে যে ব্যক্তি সত্য বুঝেও তা প্রত্যাখ্যান করে, আল্লাহর নিদর্শন দেখেও শিক্ষা নেয় না এবং হক কথা শুনেও গ্রহণ করে না, সে নিজের জন্য বিপদের পথ তৈরি করে।
অতএব আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত—
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে সত্য উপলব্ধির জন্য জাগ্রত রাখুন, আমাদের চোখকে সত্য দেখার তাওফিক দিন, আমাদের কানকে হক কথা শোনার ও গ্রহণ করার তাওফিক দিন। আমাদের গাফেলতা দূর করুন, ঈমানকে দৃঢ় করুন, কুরআন ও সুন্নাহর পথে পরিচালিত করুন এবং দুনিয়ার মোহ থেকে রক্ষা করে আখিরাতের সফলতা দান করুন। আমিন।
৪
৪ মন্তব্য