সহকারী শিক্ষক
৩১ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ
দক্ষিণের ভেনিস স্বরুপকাঠিঃ প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা এক রুপসী জনপদ
সবুজ গাছপালার ছায়া, রূপালি নদীর আঁকাবাঁকা পথ আর খালের ওপর ভেসে বেড়ানো শত শত কাঠের নৌকা— দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো পটুয়া পরম মমতায় ক্যানভাসে এঁকেছেন এক নিখুঁত ছবি। কিন্তু এটি কোনো কাল্পনিক ছবি নয়; এটি জল, জঙ্গল আর বাণিজ্যের অপূর্ব এক মেলবন্ধন নেছারাবাদ উপজেলা। যা সাধারণ মানুষের কাছে এখনও 'স্বরূপকাঠি' হিসেবেই বেশি পরিচিত। রূপালী ইলিশের নদী সন্ধ্যা আর বেলুয়া নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা পিরোজপুর জেলার এই জনপদটি শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং এটি দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, ভাসমান অর্থনীতি আর অনন্য গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক জীবন্ত ক্যানভাস।
স্থানীয় প্রবীণ ও ঐতিহাসিক সূত্র মতে, তৎকালীন জমিদার স্বরূপ চন্দ্র দত্তের নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম স্বরূপকাঠি রাখা হয়। ১৭৯০ সালে কালীগঙ্গা নদীর তীরে কেওয়ারী থানা গঠিত হয়। নদীভাঙনে তা বিলীন হলে ১৯০৬ সালে স্বরূপকাঠিতে থানা পূনঃ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে এ অঞ্চলের প্রাণপুরুষ প্রখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মরহুম হযরত নেছার উদ্দীনের নামানুসারে এর নাম নেছারাবাদ রাখা হলেও স্বরূপকাঠি নামটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে আছে।
প্রজাপতির মতো আকৃতি নিয়ে গড়ে ওঠা ২০০.৩৩ কি.মি বা ৪৯,২১১ একর আয়তনের নেছারাবাদ উপজেলার জনসংখ্যা ২,১২,২৩২ জন, খানা পরিবার ৪৫,৫৪২টি, গ্রাম ১৩৭ টি, মৌজা ৮২টি, ইউনিয়ন ১০টি ও পৌরসভা ১টি।
১. ভাসমান পেয়ারা বাজার : জলের বুকে সবুজের মেলা
স্বরূপকাঠির কথা উঠলেই সবার আগে চোখে ভাসে এখানকার ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারা ও আমড়ার বাজার। বিশেষ করে আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে কুড়িয়ানা, আটঘর ও ভীমরুলী (ঝালকাঠি সীমানা ঘেঁষা) এলাকার খালগুলো পরিণত হয় এক সবুজ উৎসবে। এখানকার খালের ওপর নৌকায় নৌকায় চলে পেয়ারা বেচাকেনা। চাষিরা বাগান থেকে তাজা পেয়ারা পেড়ে সরাসরি নৌকায় করে নিয়ে আসেন বাজারে। এই দৃশ্য দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমান। এছাড়া পেয়ারার মৌসুম শেষ হতেই শুরু হয় সুস্বাদু আমড়ার মৌসুম। এখানকার বড় বড় আমড়া দেশজুড়ে সমাদৃত।
২. ভাসমান কাঠের আড়ত : খালের বুকে কাঠের রাজ্য
নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলায় অবস্থিত ভাসমান কাঠের হাট দেশের একটি অনন্য এবং ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য কেন্দ্র। সন্ধ্যা নদীর বিভিন্ন শাখা খাল ও মোহনায় গড়ে ওঠা শতবর্ষী এই হাট কাঠ ব্যবসার জন্য দেশজুড়ে বিখ্যাত। লোহাকাঠ, মেহগনি, রেইনট্রি ও চাম্বলসহ হরেক রকম কাঠের বিশাল সমাহার রয়েছে এখানে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি নির্মাণ বা আসবাবপত্র তৈরির জন্য এখান থেকে কাঠ সংগ্রহ করেন। প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার এই হাট বসে। প্রতিদিন এখানে লাখ লাখ টাকার কাঠ বেচাকেনা হয়।
৩. ভাসমান নৌকার হাট : জলের ওপর জীবনের মেলা
নদীমাতৃক এই অঞ্চলে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌকা। আর এই নৌকার চাহিদাকে কেন্দ্র করে স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানা এবং জিন্দাকাঠির মতো এলাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল নৌকা তৈরির হাট। এখানকার মিস্ত্রিরা বংশপরম্পরায় নিখুঁত দক্ষতায় তৈরি করেন ডিঙি নৌকা, ট্রলার ও কোষা নৌকা। সম্পূর্ণ দেশীয় কাঠ দিয়ে তৈরি এসব নৌকা সাশ্রয়ী মূল্যে কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন স্বরূপকাঠিতে।
৪. নার্সারি শিল্প: সবুজের রাজধানী
স্বরূপকাঠির আরেকটি বড় পরিচয় এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ নার্সারি অঞ্চল। উপজেলার আকলম, অলংকারকাঠি, সংগীতকাঠি, কুড়িয়ানাসহ বিভিন্ন গ্রামে মাইলের পর মাইল জুড়ে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার নার্সারি। এখানে ফলদ, বনজ, ঔষধি এবং দেশি-বিদেশি নান্দনিক ফুলের চারা উৎপাদন করা হয়। দেশের মোট চাহিদার একটা বড় অংশ জোগান দেয় স্বরূপকাঠির এই সবুজ বিপ্লবীরা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা প্রতিদিন এখান থেকে চারা কিনে নিয়ে যান। এই নার্সারি শিল্প হাজারো বেকার পুরুষ ও নারীর কর্মসংস্থান।
৫. ডকইয়ার্ড বা জাহাজ নির্মাণ শিল্প: নদীপথে আলোর দিশা
নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার সন্ধ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা ডকইয়ার্ড বা নৌযান নির্মাণ শিল্প একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। এখানে ছোট-বড় ডকইয়ার্ডে কার্গো, ট্রলার ও লঞ্চের মতো বিভিন্ন ধরনের নৌযান তৈরি ও মেরামত করা হয়। প্রায় ৩০ বছর ধরে নেছারাবাদে জাহাজ নির্মাণের কাজ চলছে। আগে হাতেগোনা কয়েকটি ডকইয়ার্ডে ছোট আকৃতির জাহাজ তৈরি হলেও বিগত ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে এ শিল্প। ফলে ২৫টিরও বেশি ডকইয়ার্ডে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় তিন সহস্রাধিক মানুষের। শুধু সন্ধ্যার দুই কূলে নয়, এই নদীতে মিশে যাওয়া বড় বড় খালের পাড়েও গড়ে উঠেছে ডকইয়ার্ড।
৬. মৃৎশিল্প : মাটির ছোঁয়ায় প্রানের স্পন্দন
ফুল, ফলে ঘেরা নার্সারির পর স্বরূপকাঠির গোনমান গ্রামের মৃৎশিল্পের পরিচিতি খুব পুরনো। কাঁচা মাটি দিয়ে তৈরি ব্যাংক, ফুলদানি, খেলনাসহ হরেক রকম মাটির তৈরি জিনিস পাওয়া যায় এখানে। মাটির তৈরি এসব জিনিসও ছড়িয়ে যায় সারা দেশে।
৭. শীতলপাটি: মায়াবী বুনন শিল্প
স্বরূপকাঠির ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের মধ্যে শীতলপাটি অন্যতম। এখানকার বিশেষ এক শ্রেণির বেত (মুর্তা বেত) দিয়ে গ্রামীণ নারীরা পরম যত্নে বুনে চলেন এই পাটি। গরমের দিনে শরীরকে শীতল রাখার এই প্রাকৃতিক চাদরটির কদর যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যদিও আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের ভিড়ে এই শিল্পটি এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে।
৮. বিসিক শিল্প : সমৃদ্ধির নতুন রূপরেখা
উপজেলার কৌড়িখাড়া এলাকায় ১৯৬০-৬১ সালে প্রায় ২৪ থেকে ২৮ একর জমির ওপর বিসিক শিল্প নগরী প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে কাঠ ও বনজ শিল্প, পাটজাত পণ্য, রোপ ইন্ডাস্ট্রি, কাঠের ফার্নিচার এবং রাসায়নিক কারখানার মতো বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় দেড় শত কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ফুলঝাড়ু শিল্প, কোদালের আছারি শিল্পের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে হাজারো পরিবারের।
৯. প্রাচীন পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন :
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্বরূপকাঠির বুকে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাস ও স্থাপত্যের অনন্য নিদর
১
১ মন্তব্য