সহকারী অধ্যাপক
৩১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
সৃষ্টির নিদর্শনে জ্ঞানীর চিন্তা ও মুমিনের প্রার্থনা - মোঃ মুজিবুর রহমান
সৃষ্টির নিদর্শনে জ্ঞানীর চিন্তা ও মুমিনের প্রার্থনা
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মহাবিশ্ব একটি বিশাল বিস্ময়ের নাম। আকাশের অসংখ্য নক্ষত্র, সূর্য-চন্দ্রের নিয়মিত গতি, পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য, পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু, মানুষের জীবন—সবকিছুই মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নিদর্শন। দিন-রাতের পালাবদল, ঋতুর পরিবর্তন, বৃষ্টি, বাতাস এবং প্রকৃতির সুসমন্বিত ব্যবস্থা মানুষকে প্রতিনিয়ত তার সৃষ্টিকর্তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মহান আল্লাহ মানুষকে শুধু চোখ দিয়ে দেখার ক্ষমতাই দেননি; তিনি তাকে দিয়েছেন বিবেক, বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি। তাই প্রকৃত মুমিন কেবল সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয় না; সে সৃষ্টির অন্তরালে স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কুদরত অনুভব করে, পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে তাঁর হিকমত উপলব্ধি করে এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়।
সূরা আলে ইমরানের ১৯১–১৯৩ নম্বর আয়াতে এমনই এক গভীর চিন্তাশীল মুমিনের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এখানে আল্লাহর স্মরণ, সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা, তাঁর সৃষ্টির উদ্দেশ্য উপলব্ধি, জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তির প্রার্থনা, গুনাহের ক্ষমা এবং নেককারদের সঙ্গে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি—মহান আল্লাহর নিদর্শন
আসমান ও যমীনের সৃষ্টি মানুষের চিন্তার জন্য এক বিরাট বিষয়। সীমাহীন আকাশ, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ এবং পৃথিবীর সুসংগঠিত ব্যবস্থা মানুষকে মহান স্রষ্টার অসীম শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের বিবর্তনের মধ্যে বিবেকসম্পন্নদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।”
—সূরা আলে ইমরান: ১৯১
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে মহাবিশ্বের সৃষ্টি কোনো অর্থহীন ঘটনা নয়। এর প্রতিটি স্তরে আল্লাহর জ্ঞান, শক্তি ও প্রজ্ঞার পরিচয় রয়েছে। একজন বিবেকবান মানুষ এসব নিদর্শন দেখে স্রষ্টাকে ভুলে যেতে পারে না; বরং তার ঈমান আরও দৃঢ় হয়।
আকাশের বিশালতা মানুষকে তার ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করায়। পৃথিবীর সৌন্দর্য তাকে কৃতজ্ঞ করে। সূর্যের আলো তাকে আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করায়। রাতের নীরবতা তাকে আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। দিনের কর্মব্যস্ততা তাকে দায়িত্বশীল হতে শেখায়। এভাবেই প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্য মুমিনের জন্য শিক্ষার উপকরণ হয়ে ওঠে।
রাত ও দিনের পরিবর্তনের শিক্ষা
রাত আসে, আবার দিন আসে। অন্ধকারের পর আলো এবং আলোর পর অন্ধকার—এ এক চিরন্তন নিয়ম। এই পরিবর্তনের মধ্যে মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা রয়েছে।
রাত মানুষকে বিশ্রাম দেয়, আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেয় এবং নির্জনে আল্লাহর ইবাদতের পথ খুলে দেয়। আর দিন তাকে কর্ম, চেষ্টা, জীবিকা অনুসন্ধান ও দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান করে।
দিন-রাতের এই নিয়মিত পরিবর্তন প্রমাণ করে যে পৃথিবী একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অধীন। কোনো কিছুই এলোমেলোভাবে চলছে না। সূর্য তার নির্ধারিত নিয়মে উদিত ও অস্ত যায়, চাঁদ তার নির্দিষ্ট পর্যায় অতিক্রম করে এবং পৃথিবী তার নিয়মে আবর্তিত হয়। এসবই মহান আল্লাহর কুদরত ও হিকমতের নিদর্শন।
তাই একজন মুমিনের উচিত সময়ের মূল্য বোঝা। যে রাত চলে গেল, তা আর ফিরে আসবে না। যে দিন অতীত হলো, তা আর পুনরায় পাওয়া যাবে না। সুতরাং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্য, জ্ঞানার্জন, সৎকর্ম ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো উচিত।
উলুল আলবাব—বিবেকবান মানুষের পরিচয়
আয়াতে বলা হয়েছে, এসব নিদর্শন রয়েছে “উলুল আলবাব” অর্থাৎ বিবেকবান ও প্রজ্ঞাবান মানুষের জন্য।
বুদ্ধিমান হওয়া আর প্রকৃত জ্ঞানী হওয়া এক বিষয় নয়। কেউ অনেক তথ্য জানতে পারে, অনেক বিদ্যা অর্জন করতে পারে; কিন্তু সেই জ্ঞান যদি তাকে আল্লাহর পরিচয় না দেয়, নৈতিকতা না শেখায় এবং সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ না করে, তাহলে সেই জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে না।
প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি সৃষ্টি দেখে স্রষ্টাকে স্মরণ করে। জ্ঞান তাকে অহংকারী করে না; বরং বিনয়ী করে। সে জানে—মানুষ যত জ্ঞানই অর্জন করুক, আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় তা অত্যন্ত সামান্য।
তাই প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে এবং মহান আল্লাহর সামনে বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত করে।
দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ
আয়াতে মুমিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ বর্ণনা করা হয়েছে—
“যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে...”
এর অর্থ হলো, মুমিনের জীবন আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সে শুধু মসজিদে বা নির্দিষ্ট ইবাদতের সময় আল্লাহকে স্মরণ করবে—এমন নয়; বরং জীবনের প্রতিটি অবস্থায় তার হৃদয় আল্লাহর স্মরণে সজীব থাকবে।
দাঁড়িয়ে থাকলে সে আল্লাহকে স্মরণ করে, বসে থাকলে আল্লাহকে স্মরণ করে, বিশ্রামের সময়ও সে আল্লাহকে ভুলে যায় না।
আল্লাহর স্মরণ শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহকে স্মরণ করার অর্থ হলো—তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর ভয় রাখা, তাঁর আদেশ মানা, তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকা, তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা এবং বিপদে তাঁর ওপর ভরসা করা।
জিকির ও চিন্তার সমন্বয়
এই আয়াতের একটি অসাধারণ শিক্ষা হলো—ইসলাম মানুষকে শুধু জিকির করতে বলে না, আবার শুধু চিন্তা করতেও বলে না; বরং জিকির ও চিন্তার সুন্দর সমন্বয় শিক্ষা দেয়।
মুমিন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং একই সঙ্গে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে।
চিন্তাহীন জিকির মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে নাও পারে। আবার আল্লাহর স্মরণহীন চিন্তা মানুষকে অহংকার ও বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু জিকির ও চিন্তা যখন একত্র হয়, তখন মানুষের অন্তরে ঈমানের আলো আরও উজ্জ্বল হয়।
প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করা, মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধান করা, জীবজগতের বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করা—এসব জ্ঞানচর্চা একজন মুমিনকে আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি উপলব্ধিতে সাহায্য করতে পারে, যদি সে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখে।
“তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি”
মুমিনরা মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে বলে—
“হে আমাদের রব! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র মহান।”
এই বাক্যের মধ্যে রয়েছে গভীর ঈমানি উপলব্ধি। মুমিন বিশ্বাস করে, আল্লাহর কোনো সৃষ্টি উদ্দেশ্যহীন নয়। মানুষও উদ্দেশ্যহীনভাবে পৃথিবীতে আসেনি।
মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর আনুগত্য করা, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
পৃথিবী মানুষের জন্য পরীক্ষা ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র। এখানে মানুষ যা করবে, পরকালে তার ফলাফল পাবে। তাই জীবনকে খেল-তামাশা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
জীবনের উদ্দেশ্য উপলব্ধি
মানুষ পৃথিবীতে এসেছে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। শৈশব পেরিয়ে যৌবন আসে, যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্য আসে এবং একদিন মৃত্যু এসে জীবনের পর্দা নামিয়ে দেয়।
ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা, সৌন্দর্য ও খ্যাতি—সবকিছুই একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের ঈমান, আমল ও নৈতিকতার ফল তার সঙ্গে থাকবে।
তাই মুমিনের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
যে ব্যক্তি জীবনের উদ্দেশ্য ভুলে যায়, সে দুনিয়ার মোহে হারিয়ে যেতে পারে। আর যে ব্যক্তি জীবনের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে, সে প্রতিটি কাজের আগে চিন্তা করে—এ কাজ কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে?
জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় প্রার্থনা
মুমিনরা শুধু আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে আনন্দিত হয় না; তারা নিজেদের পরিণতি নিয়েও চিন্তা করে। তাই তারা বলে—
“সুতরাং তুমি আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা কর।”
এটি একজন মুমিনের গভীর ভয় ও বিনয়ের প্রকাশ। সে নিজের আমলের ওপর অহংকার করে না। সে জানে, মানুষের ভুল হতে পারে, গুনাহ হতে পারে এবং দুর্বলতার কারণে মানুষ আল্লাহর অবাধ্য হয়ে যেতে পারে।
তাই মুমিন আল্লাহর রহমতের আশায় থাকে এবং তাঁর শাস্তি থেকে আশ্রয় চায়।
এই দোয়া আমাদের শেখায়—নিজের আমল নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহর রহমত কামনা করতে হবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করতে হবে।
জাহান্নাম অপমানের চূড়ান্ত পরিণতি
পরবর্তী আয়াতে মুমিনরা বলে—
“হে আমাদের রব! নিশ্চয় তুমি যাকে আগুনে প্রবেশ করাবে, অবশ্যই তাকে তুমি অপমান করবে। আর জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।”
জাহান্নামের শাস্তি শুধু শারীরিক কষ্টের বিষয় নয়; এটি অপমান ও পরাজয়েরও চূড়ান্ত পরিণতি। তাই মুমিন আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি চায় এবং জুলুম ও অন্যায় থেকে নিজেকে দূরে রাখে।
জুলুম শুধু অন্যের ওপর অত্যাচারের নাম নয়। নিজের ওপরও জুলুম করা হয় যখন মানুষ গুনাহে লিপ্ত হয় এবং আল্লাহর দেওয়া জীবনকে অন্যায় কাজে নষ্ট করে।
সুতরাং মুমিনের দায়িত্ব হলো—নিজেকে সংশোধন করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং জুলুম-অন্যায় থেকে বিরত থাকা।
ঈমানের আহ্বানে সাড়া দেওয়া
আয়াত ১৯৩-এ মুমিনদের আরেকটি সুন্দর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। তারা বলে—
“হে আমাদের রব! নিশ্চয় আমরা শুনেছিলাম একজন আহ্বানকারীকে, যে ঈমানের দিকে আহ্বান করে—‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আন।’ তাই আমরা ঈমান এনেছি।”
এখানে সত্যের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে।
মানুষের কাছে যখন সত্যের বাণী পৌঁছে, তখন তার দায়িত্ব হলো তা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বুঝে গ্রহণ করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা।
শুধু “আমি ঈমানদার” বললেই ঈমানের দাবি পূর্ণ হয় না। ঈমানের প্রভাব মানুষের বিশ্বাস, কথা, চরিত্র ও কাজে প্রকাশ পেতে হয়।
সত্যের আহ্বান শুনে যারা নিজেদের জীবন সংশোধন করে, তারাই প্রকৃত অর্থে সফলতার পথে এগিয়ে যায়।
গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা
মুমিনদের দোয়ার আরেকটি অংশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—
“হে আমাদের রব! আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি বিদূরিত করুন...”
এখানে মুমিনের বিনয় প্রকাশ পেয়েছে। সে নিজেকে নিষ্পাপ মনে করে না। সে জানে, মানুষ ভুল করতে পারে। তাই সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়।
ইসলামে তাওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব অপরিসীম। গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হতে হবে, গুনাহ পরিত্যাগ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং মুমিন ভুলের পর দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
নেককারদের সঙ্গে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা
মুমিনদের দোয়ার শেষাংশ—
“আর আমাদেরকে মৃত্যু দিন নেককারদের সঙ্গে।”
এটি অত্যন্ত সুন্দর একটি প্রার্থনা। এখানে শুধু সুন্দর জীবন নয়, সুন্দর পরিণতির আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে।
মানুষের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো ঈমানের সঙ্গে জীবন শেষ করা। কারণ দুনিয়ার জীবনের শেষ হলো মৃত্যু, কিন্তু মৃত্যুর পর শুরু হবে অনন্ত জীবনের যাত্রা।
তাই মুমিনের উচিত প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা—
আমি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য জীবন কাটাচ্ছি?
আমার চরিত্র কি ইসলামের আদর্শ অনুযায়ী?
আমি কি মানুষের অধিকার রক্ষা করছি?
আমার উপার্জন কি হালাল?
আমার কথা কি সত্য ও সুন্দর?
আমি কি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত?
এই আত্মসমালোচনা মানুষকে সংশোধনের পথে নিয়ে যায়।
চিন্তাশীলতা মানুষকে দায়িত্বশীল করে
সৃষ্টিজগত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে মানুষের অন্তরে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়। সে বুঝতে পারে, পৃথিবী আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষ তাঁর দেওয়া আমানতের দায়িত্বপ্রাপ্ত।
তাই পরিবেশ রক্ষা, জীবজন্তুর প্রতি দয়া, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ, পানি ও সম্পদের অপচয় রোধ—এসবও দায়িত্বশীল জীবনের অংশ।
একজন মুমিন প্রকৃতিকে ধ্বংস করার পরিবর্তে তার সংরক্ষণে সচেতন হবে। কারণ পৃথিবীর সম্পদ আল্লাহর নিয়ামত এবং নিয়ামতের অপব্যবহার কৃতজ্ঞতার বিপরীত।
জ্ঞানচর্চা ও ইসলামী জীবন
ইসলাম জ্ঞানার্জনকে মর্যাদা দিয়েছে। তবে জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিকতা যুক্ত না হলে তা মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিজ্ঞান মানুষকে সৃষ্টির নিয়ম বুঝতে সাহায্য করে; আর ওহির জ্ঞান তাকে সেই সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ব বুঝতে সাহায্য করে।
তাই মুসলিম শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চা হওয়া উচিত সত্য, ন্যায়, মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
জ্ঞান তাকে বিনয়ী করবে, দায়িত্বশীল করবে এবং মানুষের উপকারে উদ্বুদ্ধ করবে—এটাই ইসলামী জ্ঞানের সৌন্দর্য।
বর্তমান জীবনে আয়াতগুলোর শিক্ষা
সূরা আলে ইমরানের ১৯১–১৯৩ নম্বর আয়াতের শিক্ষা বর্তমান জীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, আমাদের প্রকৃতির দিকে গভীরভাবে তাকাতে হবে এবং আল্লাহর নিদর্শন উপলব্ধি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জীবনের প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, সময়ের মূল্য বুঝতে হবে এবং রাত-দিনের পরিবর্তন থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
চতুর্থত, জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি বিবেক ও নৈতিকতা গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
ষষ্ঠত, জাহান্নামের শাস্তি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হবে।
সপ্তমত, সত্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঈমানকে দৃঢ় করতে হবে।
অষ্টমত, নিজের গুনাহ ও ত্রুটির জন্য নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে।
নবমত, অন্যায় ও জুলুম থেকে দূরে থাকতে হবে।
দশমত, নেককারদের সঙ্গে সুন্দর পরিণতি লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা
শিক্ষার্থীদের জীবনে এই আয়াতগুলোর শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য জ্ঞান অর্জন করবে না; বরং জ্ঞানকে চরিত্র গঠনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করবে।
সে শিক্ষককে সম্মান করবে, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হবে, সহপাঠীদের সঙ্গে সদাচরণ করবে এবং সময়ের অপচয় থেকে বাঁচবে।
আকাশ, পৃথিবী, জীবজন্তু ও প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করে সে জ্ঞান অর্জন করবে এবং একই সঙ্গে স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করবে।
একজন আদর্শ শিক্ষার্থী হবে জ্ঞানী, বিনয়ী, সত্যবাদী, পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও নৈতিকতাসম্পন্ন। তার জ্ঞান তাকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে নয়, বরং আরও কাছে নিয়ে যাবে।
একজন মুমিনের দৈনন্দিন জীবন
একজন সত্যিকারের মুমিনের দিন শুরু হবে আল্লাহর স্মরণে এবং শেষ হবে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে।
সে সালাত আদায় করবে, কুরআন পড়বে, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করবে, মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করবে এবং নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে।
বিপদে সে হতাশ হবে না, সুখে অহংকারী হবে না। সে জানবে—সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন।
সে দুনিয়ায় থাকবে, কিন্তু দুনিয়াকে হৃদয়ের একমাত্র লক্ষ্য বানাবে না। বরং দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করবে।
উপসংহার
সূরা আলে ইমরানের ১৯১–১৯৩ নম্বর আয়াত মানুষের চিন্তা, ঈমান, চরিত্র ও জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এক গভীর শিক্ষা প্রদান করে। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তন নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এগুলো মহান আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের অংশ।
প্রকৃত বিবেকবান মানুষ এসব নিদর্শন দেখে স্রষ্টাকে স্মরণ করে। সে দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করে। তার হৃদয়ে উপলব্ধি জন্ম নেয়—“হে আমাদের রব! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি।”
এই উপলব্ধি তাকে অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে, গাফেলতি থেকে জিকিরের দিকে, গুনাহ থেকে তাওবার দিকে এবং দুনিয়ার মোহ থেকে আখিরাতের প্রস্তুতির দিকে নিয়ে যায়।
তাই আমাদেরও উচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর মহিমা অনুভব করা, পৃথিবীর সৌন্দর্যে তাঁর কুদরত উপলব্ধি করা, রাত-দিনের পরিবর্তন থেকে সময়ের মূল্য শেখা, জ্ঞান অর্জন করা, আল্লাহকে স্মরণ করা, গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং নেককারদের পথে জীবন পরিচালিত করা।
হে মহান আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে ঈমানের আলোয় আলোকিত করুন। আমাদেরকে আপনার নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করার তাওফিক দিন। আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করুন, জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন এবং নেককার বান্দাদের সঙ্গে ঈমানের অবস্থায় আমাদের মৃত্যু দান করুন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
৪
৪ মন্তব্য