প্রভাষক
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:১১ পূর্বাহ্ণ
স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য কমাতে ইসলামের নির্দেশনা
মানুষের জীবনে এমন কোনো সম্পর্ক নেই যেখানে কখনো মতভেদ, অভিমান কিংবা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় না। বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা কিংবা দাম্পত্য- প্রত্যেক সম্পর্কেই কখনো না কখনো পরীক্ষার মুহূর্ত আসে। তবে একটি সম্পর্কের সফলতা নির্ভর করে মতভেদ না হওয়ার ওপর নয়; বরং মতভেদকে কীভাবে প্রজ্ঞা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সমাধান করা হয়, তার ওপর।
ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, সম্মান ও দায়িত্বের এক পবিত্র বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ -সূরা আর রূম: ২১
এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো সাকিনা (প্রশান্তি), মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা) এবং রাহমাহ (দয়া)। তাই সংসারে কখনো টানাপোড়েন দেখা দিলেও সম্পর্ক রক্ষার মানসিকতাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ নবী কারিম (সা.)-এর সংসারে কখনো কোনো মতভেদ বা অভিমান ছিল না। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন।
ইসলাম মানুষকে কল্পনার জগৎ নয়, বাস্তব জীবনের শিক্ষা দেয়। নবীজির সম্মানিত স্ত্রীগণেরও স্বাভাবিক আবেগ, অনুভূতি, অভিমান ও চাওয়া-পাওয়া ছিল। আর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) অসীম ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে সেসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। এ কারণেই তার সংসার প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য আদর্শ।
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ দেখা দিলে কীভাবে সংযমী আচরণ করতে হয়, তার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় হজরত হাফসা (রা.)-এর একটি ঘটনায়। একবার কথোপকথনের সময় হজরত ওমর (রা.) তার কন্যা হজরত হাফসা (রা.)-এর একটি আবেগপূর্ণ কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। কিন্তু হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে শান্ত করেন এবং পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত হতে দেননি। এ ঘটনা আমাদের শেখায়, রাগের মুহূর্তে উচ্চারিত প্রতিটি কথাকে বড় করে দেখা কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ বানানো উচিত নয়। বরং সংযম ও সহনশীলতাই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। -সিরাতে হালাবিয়্যা: ৩/২১৭
এক সময় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীরা সংসারের ভরণপোষণে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করেছিলেন। বিষয়টি জানার পর হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও হজরত ওমর (রা.) নিজেদের কন্যাদের শাসন করতে চাইলেও হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের সে সুযোগ দেননি। কারণ, স্বামীর কাছে প্রয়োজন বা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু চাওয়া কোনো অপরাধ বা অবাধ্যতা নয়। তিনি বিষয়টিকে পারিবারিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। -হায়াতুস সাহাবা: ২/৬৮৪
তবে যখন দুনিয়ার চাহিদার বিষয়টি বারবার সামনে আসে, তখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মানসিকভাবে কষ্ট পান। সেই কষ্টে তিনি প্রায় এক মাস স্ত্রীদের থেকে আলাদা অবস্থান করেন। এ সময় সমাজে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি নাকি তাদের তালাক দিয়েছেন। পরে হজরত ওমর (রা.) এসে সত্যতা যাচাই করেন এবং জানতে পারেন, তালাকের ঘটনা ঘটেনি। তারপর তিনি পরিবেশকে স্বাভাবিক করতে হাস্যরসের মাধ্যমে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মন প্রফুল্ল করার চেষ্টা করেন। -সহিহ বোখারি: ৫১৯১
এরপর আল্লাহতায়ালা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা অবতীর্ণ করেন। তিনি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দেন, তার স্ত্রীদের সামনে দুটি পথ উপস্থাপন করতে- একদিকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, অন্যদিকে আল্লাহ, তার রাসুল ও আখেরাতের সফলতা। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন, যদি তোমরা পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদের কিছু ভোগ-সামগ্রী দিয়ে সুন্দরভাবে বিদায় করে দেব। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তার রাসুল ও আখেরাত কামনা করো, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের মধ্যে সৎকর্মশীলদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ -সূরা আহজাব: ২৮–২৯
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সকল স্ত্রী আল্লাহ, তার রাসুল এবং আখেরাতকেই বেছে নিয়েছিলেন। এ সিদ্ধান্ত তাদের ঈমান, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। এ ছাড়াও হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বামীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করে। আর আমি আমার পরিবারের সঙ্গে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম আচরণ করি।’ -সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫
আবার আল্লাহতায়ালা স্বামীদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম ও সদাচরণে জীবনযাপন করো।’ -সূরা আন নিসা: ১৯
এসব শিক্ষা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, একটি সুখী সংসারের জন্য ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংযম, ন্যায়বিচার এবং আন্তরিক যোগাযোগ কতটা অপরিহার্য। রাগের মুহূর্তে কঠোর সিদ্ধান্ত না নেওয়া, অভিমানকে দীর্ঘস্থায়ী না করা এবং একে অপরের অনুভূতির মূল্য দেওয়াই নববি আদর্শ।
নবী কারিম (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন ছিল বাস্তব জীবনের একটি পরিপূর্ণ আদর্শ। সেখানে মতভেদ ছিল, অভিমান ছিল, পারিবারিক চাহিদা ছিল; কিন্তু ছিল না অবিচার, প্রতিশোধ, অপমান কিংবা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার তাড়াহুড়ো। বরং ছিল ধৈর্য, ন্যায়, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা, ক্ষমা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে রাখার মানসিকতা।
আজ অনেক সংসার ভেঙে যায় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার, রাগ বা যোগাযোগের অভাবে। অথচ যদি আমরা নবী কারিম (সা.) শিক্ষা অনুসরণ করি- রাগের সময় সংযম অবলম্বন করি, একে অপরকে ক্ষমা করি, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখি এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে সংসার পরিচালনা করি- তবে ইনশাআল্লাহ আমাদের পরিবার হবে শান্তিময়, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং আখেরাতের সফলতার একটি মাধ্যম। সত্যিই, নববি আদর্শ অনুসরণই একটি সুখী, স্থিতিশীল ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের সর্বোত্তম পথ।
৪
৪ মন্তব্য