সহকারী শিক্ষক
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:১৭ পূর্বাহ্ণ
আমাদের শিশুদের আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?
আমাদের শিশুদের আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?
এখান থেকে বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। আমাদের বাসার খুব কাছেই একটি মুদির দোকান ছিল। সেখানে চা বিক্রি হতো, পাশাপাশি টুকটাক সিগারেটও বিক্রি করা হতো।
একদিন খুব অল্প বয়সের একটি ছেলে দোকানদারের কাছে এসে বলল,
—“আমাকে একটা সিগারেট দেন।”
দোকানদার ছেলেটিকে বললেন,
—“না, তুমি তো অনেক ছোট। তোমার কাছে আমি সিগারেট বিক্রি করব না।”
ছেলেটি তখন দোকানদারকে গালাগাল করতে শুরু করল। আমার যতদূর মনে পড়ে, ছেলেটি তখন সর্বোচ্চ পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত।
আমি সেদিন সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে বই-খাতা থাকার কথা, মাঠে খেলাধুলা করার কথা, স্বপ্ন দেখার কথা—সে বয়সে একটি শিশু সিগারেট চাইছে! আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, কোথা থেকে সে শিখল এই অভ্যাস? কে তাকে উৎসাহিত করল?
তবে সেদিন একটা বিষয় ভালো লেগেছিল—দোকানদার অন্তত শিশুটির কাছে সিগারেট বিক্রি করেননি। তিনি যদি বিক্রি করতেন, তাহলে হয়তো শিশুটি সেটি খেয়েই ফেলত।
আমরা আসলে নিজেরাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নষ্ট করছি।
কয়েক দিন আগের আরেকটি ঘটনা পেপারে পড়েছি। একটি শিশু মাদক বহন করার সময় জনতার হাতে আটক হয়। পরে তাকে গণপিটুনি দেওয়া হয় এবং পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো,মাদকটি তার হাতে এল কীভাবে? কে তাকে দিল? কারা তাকে ব্যবহার করল? তার পেছনে কি কোনো বড় চক্র রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর কি আমরা খুঁজেছি?
অনেক সময় দেখা যায়, যারা শিশুদের ব্যবহার করছে, তারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। আর আমাদের শিশুরাই সামনে এসে ধরা পড়ছে, মার খাচ্ছে, মামলা-অভিযোগের শিকার হচ্ছে। অথচ যে বড় মানুষগুলো তাদের ব্যবহার করছে, তারা হয়তো নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে।
একবার শুধু ভাবুন—যদি আমার সন্তান এমন কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ত, আমি কি তাকে ফেলে দিতাম? নাকি তাকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতাম?
অবশ্যই আমরা আমাদের সন্তানকে বাঁচাতে চাইতাম।
তাহলে অন্যের সন্তানকে আমরা কেন শুধু অপরাধী হিসেবে দেখি? তাদের পেছনের গল্পটা কেন খুঁজি না?
অর্থের কষ্টে অনেক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ কাজে জড়িয়ে পড়ছে—এটা কষ্টের। অনেক শিশু লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—এটাও কষ্টের। আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তাদের এই অসহায়ত্ব ও দুর্ভাগ্যের সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ তাদের মাদক, অপরাধ কিংবা নানা অপকর্মে ব্যবহার করছে।
শিশুরা অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পরিবেশ, দারিদ্র্য, অবহেলা, ভুল সঙ্গ এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব অনেক সময় তাদের ভুল পথে ঠেলে দেয়।
তাই শুধু শিশুকে শাস্তি দিলেই হবে না। যে ব্যক্তি বা চক্র শিশুদের ব্যবহার করছে, তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। আইনের প্রয়োগ আরও কঠোর ও কার্যকর হতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবাইকে শিশুদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো শিশু সিগারেট চেয়ে দোকানে দাঁড়াবে না। কোনো শিশু মাদক বহন করতে বাধ্য হবে না। কোনো শিশু অর্থের অভাবে স্কুল ছেড়ে দেবে না। কোনো অপরাধী চক্র কোনো শিশুকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না।
আমাদের সন্তানদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়—এটা আমাদের সবার দায়িত্ব।
কবে আমরা আমাদের শিশুদের জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ ও শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারব?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজতে হবে। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ। তাদের রক্ষা করতে না পারলে, ভবিষ্যৎ সমাজকেও আমরা রক্ষা করতে পারব না।
৪
৪ মন্তব্য