Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

প্রতারণা, হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত সমাজ গড়ি -মোঃ মুজিবুর রহমান

প্রতারণা, হিংসা বিদ্বেষমুক্ত সমাজ গড়ি

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রকে ঘিরেই তার জীবন গড়ে ওঠে। মানুষের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা, সহযোগিতা সৌহার্দ্যের ওপর। যেখানে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে, বিপদে পাশে দাঁড়ায়, অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হয় এবং সত্য ন্যায়ের পথে চলে, সেখানে শান্তি কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। পক্ষান্তরে প্রতারণা, হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা সম্পর্কচ্ছেদ সমাজের ভিত দুর্বল করে দেয়।

ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে, সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা এবং সমাজকে ভালোবাসা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি সততা, আমানতদারি, দয়া, ক্ষমা ভালোবাসাকে উৎসাহিত করেছেন এবং প্রতারণা, হিংসা, বিদ্বেষ পরস্পর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া থেকে নিষেধ করেছেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন

যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
সহীহ মুসলিম

আরেক হাদিসে এসেছে

সাবধান! তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো।
আবু দাউদ

ছাড়া তিনি বলেছেন

তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না এবং একে অপরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না।
সহীহ মুসলিম

এই বাণীগুলোর মধ্যে ব্যক্তি-চরিত্র, পারিবারিক শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবিক সম্পর্ক রক্ষার গভীর শিক্ষা নিহিত রয়েছে।

প্রতারণা কী

প্রতারণা হলো সত্য গোপন করে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে, ধোঁকা দিয়ে বা অসৎ কৌশল অবলম্বন করে অন্যের ক্ষতি করা কিংবা অন্যায়ভাবে নিজের স্বার্থ হাসিল করা। মিথ্যা বলা, পণ্যের দোষ গোপন করা, ওজনে কম দেওয়া, আমানতের খেয়ানত করা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া, জালিয়াতি করা এবং বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অন্যের ক্ষতি করাসবই প্রতারণার বিভিন্ন রূপ।

প্রতারণার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে টাকা-পয়সার ক্ষতি কোনোভাবে পূরণ করা সম্ভব হলেও হারানো বিশ্বাস ফিরে পাওয়া অনেক কঠিন। একজন মানুষ যখন আরেকজনকে বিশ্বাস করে, তখন সে তার কাছে শুধু সম্পদ নয়, নিজের সম্মান, আশা নিরাপত্তার একটি অংশও অর্পণ করে। সেই বিশ্বাসের অপব্যবহার করা নৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।

ইসলাম তাই প্রতারণাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। একজন প্রকৃত মুসলমানের পরিচয় শুধু তার বাহ্যিক ইবাদতে নয়; তার সততা মানুষের সঙ্গে আচরণেও প্রকাশ পায়।

প্রতারণার ক্ষতি

প্রতারণা ব্যক্তি সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। একজন প্রতারক হয়তো সাময়িকভাবে কিছু অর্থ বা সুবিধা অর্জন করতে পারে; কিন্তু এর বিনিময়ে সে মানুষের বিশ্বাস হারায় এবং নিজের চরিত্রকে কলুষিত করে।

প্রতারণার ফলে

  • মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়;

  • পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়;

  • ব্যবসা-বাণিজ্যে অনাস্থা বাড়ে;

  • বন্ধুত্ব আত্মীয়তার সম্পর্ক ভেঙে যায়;

  • সামাজিক বিভেদ সৃষ্টি হয়;

  • দুর্বল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়;

  • অন্যায়ের পরিবেশ তৈরি হয়;

  • মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।

তাই সাময়িক লাভের জন্য প্রতারণার পথ বেছে নেওয়া কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সত্য সততার পথে অর্জিত অল্প সম্পদও কল্যাণকর; আর প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত বিপুল সম্পদও শান্তি বরকত বয়ে আনে না।

হিংসা কী

হিংসা হলো অন্যের ভালো থাকা, সাফল্য, সম্মান, সম্পদ, জ্ঞান, সৌভাগ্য বা মর্যাদা দেখে মনে কষ্ট পাওয়া এবং তার সেই কল্যাণ দূর হয়ে যাকএমন আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা। এটি মানুষের অন্তরের একটি ভয়ংকর ব্যাধি।

কেউ ভালো ফল করেছে, কেউ চাকরি পেয়েছে, কেউ ব্যবসায় সফল হয়েছে, কেউ সম্মান অর্জন করেছে, কেউ সুন্দর পরিবার পেয়েছেএসব দেখে যদি আমরা আনন্দিত না হয়ে মনে মনে চাই যে তার সুখ নষ্ট হয়ে যাক, তাহলে আমাদের অন্তরে হিংসার জন্ম নিয়েছে।

হিংসা মানুষের নিজেরই ক্ষতি করে। কারণ হিংসুক ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করার আগে নিজের অন্তরের শান্তি নষ্ট করে ফেলে। সে অন্যের সুখ দেখে কষ্ট পায়, অন্যের উন্নতি দেখে অস্থির হয় এবং নিজের প্রাপ্ত নিয়ামতগুলোর মূল্যও ভুলে যায়।

হিংসার ভয়াবহ পরিণতি

হিংসা মানুষের অন্তরকে অন্ধকার করে দেয়। হিংসুক ব্যক্তি ধীরে ধীরে অন্যের ভালো দেখতে না-পাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময় তার মনে ঘৃণা, বিদ্বেষ, অহংকার প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নিতে পারে।

হিংসা থেকে অনেক সময়

কুৎসা, অপবাদ, গীবত, মিথ্যা অভিযোগ, সম্পর্কচ্ছেদ, ষড়যন্ত্র এবং অন্যায় আচরণ সৃষ্টি হয়।

একজন মানুষের সাফল্য দেখে যদি অন্যজন তাকে অভিনন্দন জানানোর পরিবর্তে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়, তাহলে শুধু একজন ব্যক্তি নয়পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাই হিংসার পরিবর্তে আমাদের উচিত অন্যের কল্যাণ দেখে আল্লাহর কাছে নিজের জন্য কল্যাণ কামনা করা এবং বৈধভাবে ভালো কিছু অর্জনের চেষ্টা করা।

হিংসার পরিবর্তে ভালোবাসা

ইসলাম মানুষের অন্তরে হিংসার পরিবর্তে ভালোবাসা সৃষ্টি করতে চায়। একজন মুমিন অন্য মুমিনের সুখে আনন্দিত হবে এবং তার দুঃখে সহমর্মী হবে। অন্যের সাফল্য দেখে হতাশ না হয়ে সে ভাববেআল্লাহ তাকে দিয়েছেন, আল্লাহ চাইলে আমাকেও দিতে পারেন। তাই হিংসা নয়, বরং দোয়া সৎ প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত আমাদের মানসিকতার ভিত্তি।

অন্যের ভালো দেখে বলা যায়

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাকে আরও কল্যাণ দান করুন; আমাকেও হালাল কল্যাণকর পথে উত্তম কিছু দান করুন।

এমন মনোভাব মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং সমাজে ভালোবাসা বাড়ায়।

ঘৃণা বিদ্বেষের ক্ষতিকর প্রভাব

ঘৃণা বিদ্বেষ মানুষের সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল তৈরি করে। সামান্য মতভেদ কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতায় পরিণত হয়। একটি ভুল কথা, একটি ভুল বোঝাবুঝি বা সামান্য অভিমান থেকে পরিবারে, বন্ধুত্বে কিংবা প্রতিবেশীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

ইসলাম এমন সম্পর্কচ্ছেদকে উৎসাহিত করে না। বরং মানুষকে ক্ষমা, সহনশীলতা, ধৈর্য সুন্দর আচরণের শিক্ষা দেয়।

কেউ আমাদের সঙ্গে অন্যায় করলে তার অন্যায়ের সমর্থন করা জরুরি নয়; কিন্তু প্রতিশোধের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলা থেকেও বাঁচতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ক্ষমা সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি করা মহৎ চরিত্রের পরিচয়।

পরস্পর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়

রাসূলুল্লাহ (সা.) পরস্পর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে নিষেধ করেছেন। এর অর্থ হলোঅহংকার, বিদ্বেষ বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে সম্পর্ককে অকারণে নষ্ট করা উচিত নয়।

মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকতেই পারে। প্রত্যেক মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা দৃষ্টিভঙ্গি এক হবেএমন নয়। কিন্তু মতভেদ যেন মনভেদে পরিণত না হয়। মতের অমিল থাকলেও ভদ্রতা বজায় রাখা, অন্যের কথা শোনা, যুক্তি দিয়ে কথা বলা এবং সম্পর্কের মৌলিক সৌজন্য রক্ষা করা প্রয়োজন।

একটি সুন্দর সমাজে মানুষ বলতে পারবে

আমাদের মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে ঘৃণা নেই।

পরিবারে এই শিক্ষার প্রয়োগ

পরিবার হলো মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। সন্তান পরিবার থেকেই সততা, ভালোবাসা, সম্মান সহমর্মিতা শেখে। তাই বাবা-মা, ভাই-বোন এবং অন্যান্য সদস্যদের পারস্পরিক আচরণে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।

ভাইয়ের সাফল্যে ভাই আনন্দিত হবে, বোনের ভালো কাজে বোন উৎসাহ দেবে, সন্তানকে অন্যের সঙ্গে অকারণে তুলনা করা হবে না। পরিবারে কারও প্রতি পক্ষপাত, অবহেলা বা হিংসার পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত নয়।

অভিমান হলে কথা বলতে হবে, ভুল হলে ক্ষমা চাইতে হবে, অন্যায় হলে সুন্দরভাবে সংশোধন করতে হবে। এভাবেই পরিবারে ভালোবাসা শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

বন্ধুত্বে সততা বিশ্বস্ততা

বন্ধুত্ব মানুষের জীবনের একটি মূল্যবান সম্পর্ক। একজন বন্ধু আরেকজন বন্ধুর কাছে নিজের কথা, আশা, দুঃখ গোপনীয়তা প্রকাশ করে। তাই বন্ধুত্বে প্রতারণা করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

সত্যিকারের বন্ধু বিপদে পাশে থাকে, ভুল পথে গেলে সতর্ক করে, অন্যের অনুপস্থিতিতে তার সম্মান রক্ষা করে এবং তার সাফল্যে আনন্দিত হয়।

যে বন্ধু সামনে ভালোবাসার কথা বলে কিন্তু পেছনে প্রতারণা করে, অপমান করে বা ক্ষতি করার চেষ্টা করে, সে বন্ধুত্বের মর্যাদা নষ্ট করে।

ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা বর্জন

ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যবসায়ী পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে সত্য কথা বলবে, ওজনে কম দেবে না, ত্রুটি গোপন করবে না এবং ক্রেতার অজ্ঞতার সুযোগ নেবে না।

লাভ করা ব্যবসার স্বাভাবিক উদ্দেশ্য; কিন্তু অন্যায়ভাবে লাভ করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সৎ ব্যবসায়ী হয়তো কোনো সময় কম লাভ করতে পারেন, কিন্তু তিনি মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন। আর মানুষের বিশ্বাস একটি বড় সম্পদ। বিশ্বাসযোগ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্কতা

বর্তমান যুগে মানুষের যোগাযোগের বড় একটি মাধ্যম হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখানে একটি মিথ্যা খবর মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কারও বিরুদ্ধে যাচাই না করে অভিযোগ করা, অপমানজনক মন্তব্য করা, গুজব ছড়ানো বা ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা মানুষের সম্মান নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমাদের ইসলামী নৈতিকতা মেনে চলতে হবে।

শেয়ার করার আগে যাচাই করতে হবে,
লেখার আগে ভাবতে হবে,
অভিযোগ করার আগে সত্য জানতে হবে,
আর কাউকে অপমান করার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করতে হবে।

একটি শব্দ যেমন মানুষকে আনন্দ দিতে পারে, তেমনি একটি অসতর্ক বাক্যও একটি মানুষের হৃদয় ভেঙে দিতে পারে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এই নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষক শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যায়সঙ্গত, স্নেহশীল দায়িত্বশীল হবেন। শিক্ষার্থী শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং সহপাঠীর সাফল্যে হিংসা না করে তাকে অভিনন্দন জানাবে।

একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে অন্যরা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঘৃণা করবে না; বরং তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নেবে। এভাবে সুস্থ প্রতিযোগিতা শিক্ষার মান উন্নত করে।

হিংসা বলে—“সে কেন পেল?”
সুস্থ প্রতিযোগিতা বলে—“আমিও চেষ্টা করব।

এই পার্থক্যটি বুঝতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায়

প্রতারণা, হিংসা বিদ্বেষমুক্ত সমাজ গড়তে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে প্রয়োজন

. সত্য কথা বলা।
. আমানত রক্ষা করা।
. প্রতিশ্রুতি পালন করা।
. অন্যের অধিকার সম্মান করা।
. হিংসা পরিহার করা।
. গীবত অপবাদ থেকে বেঁচে থাকা।
. ভুল বোঝাবুঝি হলে আলোচনা করা।
. অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হওয়া।
. অন্যায় হলে ন্যায়সংগতভাবে প্রতিবাদ করা।
১০. ক্ষমা সহনশীলতার চর্চা করা।
১১. পরিবার প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।
১২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ করা।
১৩. দুর্বল অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
১৪. আল্লাহর কাছে অন্তরের পবিত্রতা কামনা করা।

আমাদের করণীয়

আমরা যদি সত্যিই সুন্দর সমাজ গড়তে চাই, তাহলে পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে নিজেদের মধ্য থেকেই। অন্যকে প্রতারক বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবেআমি কি কারও সঙ্গে প্রতারণা করছি? অন্যের হিংসা নিয়ে অভিযোগ করার আগে দেখতে হবেআমার অন্তরে কি কারও প্রতি হিংসা রয়েছে?

আমরা যদি চাই সমাজে মিথ্যা কমুক, তাহলে আমাদের সত্যবাদী হতে হবে। যদি চাই মানুষ প্রতারণা না করুক, তাহলে আমাদের আমানতদার হতে হবে। যদি চাই মানুষ আমাদের ভালোবাসুক, তাহলে আমাদেরও মানুষকে ভালোবাসতে হবে। যদি চাই সমাজে বিদ্বেষ কমুক, তাহলে আমাদের অন্তর থেকেই ঘৃণার আগুন নিভাতে হবে।

পরিবর্তন সব সময় অন্যের কাছ থেকে শুরু হয় না। অনেক সময় একটি পরিবারের পরিবর্তন একজন মানুষের ভালো আচরণ থেকে শুরু হয়; একটি সমাজের পরিবর্তন শুরু হতে পারে একটি পরিবারের নৈতিক শিক্ষা থেকে; আর একটি জাতির পরিবর্তন শুরু হতে পারে কয়েকজন সৎ মানুষের দৃঢ় অবস্থান থেকে।

ইসলামি ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য

ইসলাম মানুষের মধ্যে এমন এক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে মানুষ অন্যের নিরাপত্তা, সম্মান কল্যাণকে নিজের স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে করবে।

একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ক্ষতি করবে না, তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না, তার সম্মান নষ্ট করবে না এবং তার দুর্বলতার সুযোগ নেবে না। বরং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াবে, ভুল হলে সুন্দরভাবে সংশোধন করবে এবং বিপদে সহযোগিতা করবে।

এই ভ্রাতৃত্ব কেবল মুখের কথা নয়; এটি আচরণে প্রকাশ করতে হয়।

ভালোবাসা কথায় নয়, কাজে প্রকাশ পায়।
সততা দাবিতে নয়, আচরণে প্রমাণিত হয়।
ঈমান শুধু পরিচয়ে নয়, চরিত্রেও প্রতিফলিত হয়।

অন্তর পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা

মানুষের বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরের পরিচ্ছন্নতাও প্রয়োজন। শরীর পরিষ্কার রাখার জন্য যেমন পানি প্রয়োজন, তেমনি অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখার জন্য প্রয়োজন তাওবা, আত্মসমালোচনা, আল্লাহর স্মরণ, সৎকাজ সুন্দর চরিত্রের চর্চা।

হিংসা জন্ম নিলে নিজেকে বোঝাতে হবেরিজিক সম্মান আল্লাহর হাতে। অন্যের প্রাপ্তি আমার প্রাপ্তি কমিয়ে দেয় না। আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তা তাঁর হিকমত ইচ্ছার অংশ।

অন্যের সাফল্য দেখে হিংসা করার পরিবর্তে তার জন্য দোয়া করা এবং নিজের জন্য বৈধ উপায়ে চেষ্টা করা একজন মুমিনের উত্তম মানসিকতা।

উপসংহার

প্রতারণা মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে, হিংসা অন্তরের শান্তি কেড়ে নেয়, ঘৃণা সম্পর্ক ভেঙে দেয় এবং বিদ্বেষ সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ভালোবাসা, ক্ষমা, সহমর্মিতা ভ্রাতৃত্ব মানুষের জীবনকে সুন্দর করে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়কাউকে ধোঁকা দেওয়া নয়, হিংসা করা নয়, ঘৃণা করা নয় এবং অহংকার করে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং আমাদের হতে হবে সৎ, বিশ্বস্ত, সহনশীল, ক্ষমাশীল ভালোবাসাপূর্ণ মানুষ

আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের অন্তরকে হিংসা থেকে পবিত্র করি, আচরণকে প্রতারণামুক্ত করি, জবানকে কষ্টদায়ক কথা থেকে সংযত করি এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা কল্যাণের মনোভাব পোষণ করি, তাহলে পরিবারে শান্তি আসবে, সমাজে সম্প্রীতি বাড়বে এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস দৃঢ় হবে।

তাই আসুন

প্রতারণার পথ ছেড়ে সত্যের পথে চলি,
হিংসার আগুন নিভিয়ে ভালোবাসার আলো জ্বালি,
ঘৃণার দেয়াল ভেঙে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ি,
অন্যের ক্ষতি নয়অন্যের কল্যাণ কামনা করি।

আমাদের হাত হোক নিরাপদ,
আমাদের জবান হোক সত্যের বাহক,
আমাদের অন্তর হোক হিংসামুক্ত,
আমাদের আচরণ হোক ভালোবাসায় পূর্ণ।

তবেই গড়ে উঠবে এমন একটি সমাজযেখানে মানুষ মানুষকে ঠকাবে না, অন্যের সাফল্যে কষ্ট পাবে না, ঘৃণার বদলে ভালোবাসা ছড়াবে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস, ন্যায়, সৌহার্দ্য মানবিকতার ভিত্তিতে সুন্দর জীবন গড়ে তুলবে।

প্রতারণামুক্ত অন্তর, হিংসামুক্ত মন,
ভালোবাসায় গড়ি সুন্দর জীবন।
সত্যের পথে চলি, ন্যায়ের পথে রই,
মানুষের কল্যাণে জীবন যেন সই।

এটাই ইসলামের নৈতিক সৌন্দর্য; এটাই সুন্দর চরিত্রের শিক্ষা; এটাই শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার অন্যতম পথ।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ