সহকারী শিক্ষক
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ০১:৫২ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
এডওয়ার্ড মিলস পার্সেল (Edward Mills Purcell) ছিলেন একজন প্রখ্যাত মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ৩০ আগস্ট ১৯১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের টেলুরাইডে জন্মগ্রহণ করেন। পার্সেলের গবেষণা মূলত নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স বা NMR-এর ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। তাঁর এই কাজ পরবর্তীকালে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিশেষ করে MRI প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
NMR বা Nuclear Magnetic Resonance হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যেখানে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে নির্দিষ্ট পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের আচরণ এবং রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি সংকেত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
সহজভাবে বললে, কিছু পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একটি ক্ষুদ্র চুম্বকের মতো ভাবা যায়। এগুলোকে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে রাখলে তারা নির্দিষ্টভাবে সাড়া দেয়। উপযুক্ত রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি শক্তি প্রয়োগ করলে নিউক্লিয়াসের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং সেখান থেকে সংকেত পাওয়া যায়।
এই সংকেত বিশ্লেষণ করেই পদার্থের ভেতরের গঠন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পার্সেল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শুরু করেন। সেখানে তিনি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেন।
১৯৪৫ সালে তিনি এবং তাঁর গবেষণা দল দেখান যে কঠিন পদার্থে নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
প্রায় একই সময়ে ফেলিক্স ব্লখ (Felix Bloch) স্বাধীনভাবে একই ধরনের আবিষ্কার করেন।
এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫২ সালে পার্সেল ও ব্লখ যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
তাঁদের পুরস্কার দেওয়া হয় “nuclear magnetic precision measurements” এবং সংশ্লিষ্ট আবিষ্কারের জন্য।
এখানেই পার্সেলের গবেষণার চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যায়।
মানবদেহে প্রচুর পরিমাণে পানি রয়েছে। আর পানির অণুতে হাইড্রোজেন থাকে। মানুষের শরীরের বিপুলসংখ্যক হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসকে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে রাখলে তারা NMR সংকেত তৈরি করতে পারে।
MRI যন্ত্র মূলত এই সংকেত ব্যবহার করে শরীরের বিভিন্ন টিস্যু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।
একটি সরল ধারাবাহিকতা হলো:
শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র → হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের প্রতিক্রিয়া → রেডিও সংকেত → কম্পিউটার বিশ্লেষণ → শরীরের অভ্যন্তরের ছবি
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পার্সেল নিজে MRI আবিষ্কার করেননি। তাঁর NMR গবেষণা MRI-এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে Paul Lauterbur ও Peter Mansfield-সহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা NMR-কে চিকিৎসা-ইমেজিংয়ের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁদের কাজের জন্য Lauterbur ও Mansfield ২০০৩ সালে ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার পান।
MRI-কে অনেকটা শরীরের ভেতরের একটি অত্যন্ত উন্নত চৌম্বকীয় মানচিত্র তৈরির ব্যবস্থা হিসেবে বোঝা যায়।
MRI মেশিনের ভেতরে—
১. শক্তিশালী চুম্বক
শরীরের হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলোকে নির্দিষ্ট অবস্থায় সাজাতে সাহায্য করে।
২. রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি পালস
হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসে শক্তি প্রয়োগ করে।
৩. নিউক্লিয়াস থেকে সংকেত
তারা আগের অবস্থায় ফিরে আসার সময় নির্দিষ্ট সংকেত তৈরি করে।
৪. গ্রেডিয়েন্ট ম্যাগনেটিক ফিল্ড
শরীরের কোথা থেকে সংকেত আসছে তা নির্ণয়ে সাহায্য করে।
৫. কম্পিউটার
সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ সংকেত গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে এবং সেগুলোকে ছবিতে রূপান্তর করে।
ফলে চিকিৎসকরা শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুর বিস্তারিত ছবি দেখতে পারেন।
MRI শুধু পদার্থবিজ্ঞানের একটি পরীক্ষা নয়; এটি আধুনিক কম্পিউটেশনাল ইমেজিংয়ের একটি অসাধারণ উদাহরণ।
MRI মেশিন সরাসরি একটি ছবি তোলে না। বরং শরীর থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা সংকেত বা ডেটা সংগ্রহ করে। এরপর গাণিতিক পদ্ধতি ও কম্পিউটার অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সেই ডেটা থেকে ছবি পুনর্গঠন করা হয়।
অর্থাৎ এখানে কাজ করে—
Physics + Mathematics + Electronics + Computer Science + Medical Science
এই সমন্বয়ের ফলেই আধুনিক MRI সম্ভব হয়েছে।
MRI বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আয়নাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহার করে না। অর্থাৎ এক্স-রে বা CT স্ক্যানের মতো X-ray radiation-এর ওপর এটি নির্ভর করে না।
এটি বিশেষ করে—
পরীক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর।
MRI-এর বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে একই অঙ্গের ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যও তুলে ধরা যায়।
পার্সেলের কাজ শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি-তেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
১৯৫১ সালে তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা মহাকাশ থেকে আসা নিরপেক্ষ হাইড্রোজেনের ২১-সেন্টিমিটার রেডিও সংকেত পর্যবেক্ষণের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এই সংকেত ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের গ্যালাক্সি এবং মহাবিশ্বে নিরপেক্ষ হাইড্রোজেনের বণ্টন সম্পর্কে গবেষণা করতে পারেন।
অর্থাৎ একই ধরনের মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান একদিকে মানবদেহের ভেতর দেখতে সাহায্য করেছে, অন্যদিকে মহাবিশ্বের গঠন বুঝতেও সাহায্য করেছে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | এডওয়ার্ড মিলস পার্সেল |
| জন্ম | ৩০ আগস্ট ১৯১২ |
| জন্মস্থান | টেলুরাইড, কলোরাডো, যুক্তরাষ্ট্র |
| পেশা | পদার্থবিজ্ঞানী |
| প্রধান গবেষণা | Nuclear Magnetic Resonance |
| নোবেল পুরস্কার | পদার্থবিজ্ঞান, ১৯৫২ |
| সহ-নোবেল বিজয়ী | ফেলিক্স ব্লখ |
| গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র | NMR, রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি |
| MRI-এর সঙ্গে সম্পর্ক | MRI-এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি NMR গবেষণার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত |
| মৃত্যু | ৭ মার্চ ১৯৯৭ |
আপনার মূল বক্তব্যটি আরও নির্ভুলভাবে এভাবে লেখা যায়:
এডওয়ার্ড মিলস পার্সেল (জন্ম: ৩০ আগস্ট ১৯১২) ছিলেন নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৪০-এর দশকে তাঁর Nuclear Magnetic Resonance বা NMR-সংক্রান্ত গবেষণা আধুনিক চৌম্বকীয় ইমেজিংয়ের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে NMR প্রযুক্তি চিকিৎসা-ইমেজিংয়ে রূপান্তরিত হয়ে MRI-এর বিকাশ ঘটায়। আজ MRI-তে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র, রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি সংকেত, উন্নত গণিত ও কম্পিউটার অ্যালগরিদম ব্যবহার করে মানবদেহের অভ্যন্তরের অত্যন্ত বিস্তারিত ছবি তৈরি করা হয়।
এক কথায়: পার্সেলের আবিষ্কার MRI নয়, কিন্তু তাঁর NMR গবেষণা MRI-এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
২
২ মন্তব্য