Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ জুন, ২০২৬ ১১:১৮ অপরাহ্ণ

ভ্রমণ গদ্য বেঁচে থাক

ভ্রমণ গদ্য বেঁচে থাক

ভ্রামণ গদ্য এভাবেই বেঁচে থাক। সম্পাদকের প্রবল প্রাণশক্তি, লেখকদের ধারাবাহিক লেখাচর্চা ও পাঠকের অবিরত ভালোবাসায়। ভ্রমণগদ্যের জন্য যেমন এই প্রাণশক্তি, লেখাচর্চা ও ভালোবাসার দরকার আছে, তেমনি এসবের হালে পানি দিতেও ভ্রমণগদ্য প্রকাশনার নিরবচ্ছিন্নতা প্রয়োজন।

#ভ্রমণগদ্য #জাকারিয়া মন্ডল #ম্যাগাজিনভ্রমণগদ্য’র জীবনচক্র ছোট হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন ম্যাগাজিনটির উদ্যোক্তা, সংগঠক ও সম্পাদক মাহমুদ হাফিজ। তিনি লিখেছেন, ‘ভ্রমণগদ্যর জীবনচক্র ছোট কাগজের নিয়তি-নির্ধারিত সময়ের চেয়েও কম প্রলম্বিত বলে ধারণা করি। দ্রুতই যদি এর প্রকাশনার পাট চুকোয়, সেটাই স্বাভাবিক হবে। যদি হয় তার ব্যত্যয় হয়, বুঝতে হবে, এ ঘরানার নিয়মিত লেখকগণ কিংবা সম্পাদক স্বয়ং অতি নিবেদিত। সঙ্কটকে তুড়ি মেরে জাদুকরি হাতে বাঁচিয়ে চলেছেন ভ্রমণকে গদ্য বলার নতুন সাহিত্যচিন্তার প্রাণবায়ু!’

সম্পাদক মাহমুদ হাফিজ তার এই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সম্পাদকীয়তে। ভ্রমণগদ্যের বর্ষ ৮ এর ১৯তম সংখ্যায়। এটি প্রকাশিত ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে। আশার কথা এই যে, গত এক বছরে সম্পাদকের এই শঙ্কা সত্য হয়নি। অথবা বলা চলে, তিনি নিজেই সত্য হতে দেননি। সঙ্কটকে তুড়ি মেরে জাদুকরি হাতে বাঁচিয়ে চলেছেন ভ্রমণকে গদ্য বলার নতুন সাহিত্যচিন্তার প্রাণবায়ু!ভ্রামণ গদ্য এভাবেই বেঁচে থাক। সম্পাদকের প্রবল প্রাণশক্তি, লেখকদের ধারাবাহিক লেখাচর্চা ও পাঠকের অবিরত ভালোবাসায়। ভ্রমণগদ্যের জন্য যেমন এই প্রাণশক্তি, লেখাচর্চা ও ভালোবাসার দরকার আছে, তেমনি এসবের হালে পানি দিতেও ভ্রমণগদ্য প্রকাশনার নিরবচ্ছিন্নতা প্রয়োজন।গত প্রায় বছর দশেক ধরেই ‘স্লো বাট স্টেডি’ রীতিতে ভ্রমণগদ্যের প্রকাশনা অব্যাহত। সম্পাদকের ওই আশঙ্কার পরও এই ধারবাহিকতায় ছেদ পড়েনি। ভ্রমণ লেখকদের প্রাত:রাশ আড্ডাও বন্ধ হয়নি। বরং অনিয়মিত হলেও ব্যপ্তি বেড়েছে। এখন ভ্রমণগদ্য সুহৃদসভার প্রাত:রাশ আড্ডাও হয়। সর্বশেষ আড্ডাটি সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো গত ১৬ মে। বুয়েট গ্রাজুয়েট ক্লাবে। ওই আড্ডার উপস্থিতি ও আয়োজন নি:সন্দেহে আশা জাগানিয়া। এই আশার সলতেটাকে শেষ হতে দেয়া যাবে না।

আশার কথা হলো, কিছুটা অনিয়মিত মনে হলেও এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ভ্রমণগদ্যই ভ্রমণ বিষয়ক সবচেয়ে ধারাবাহিক প্রকাশনা। অন্য প্রকাশনাগুলো এখন অনেকটাই অনলাইন নির্ভর। লেখকদের মধ্যে নিয়মিত বা অনিয়মিত আড্ডার চর্চাও কেউ চালু রাখতে পারেনি। তাই ভ্রমণ বিষয়ক সাহিত্য চর্চার স্বার্থেই ভ্রমণগদ্যকে টিকে থাকতে হবে, টিকিয়ে রাখতে হবে। এখন বরং সময় এসেছে আরো দীর্ঘ সময় ধরে এই ম্যাগাজিনটিকে টিকিয়ে রাখার কৌশল ও উদ্যোগ কেমন হবে, তা নিয়ে ভাববার। আর এ কাজে স্বভাবই সম্পাদককে সহযোগিতার দায়টা সব ভ্রমণ চর্চাকারীর ওপরই বর্তায়।

এবার আসা যাক, যে সম্পাদকীয় নিয়ে এই লেখার অবতারণা, সেই সংখ্যাটিতে কারা লিখেছেন, কী লিখেছেন, সেসব একপলকে একটু দেখে নিই। বর্ষ ৮, সংখ্যা ১৯ এ লেখা আছে মোট ১৫টি। লেখক তালিকায় আছেন- ফকির আকতারুল আলম, কাজল চক্রবর্তী, কাজী এনায়েত উল্লাহ, কামরুল হাসান, চপল বাশার, জিকরুর রেজা খানম, ড ডি এম ফিরোজ শাহ, ফরিদুর রহমান, বিশ্বজিৎ বড়ুয়া, মাসরুর-উর-রহমান আবীর, মাহমুদ হাফিজ, লিজি রহমান, সুমন্ত বন্দোপাধ্যায়, সেলিম সোলায়মান ও স্বপন ভট্টাচার‌্য।

ফকির আকতারুল আলম এর লেখাটি ভ্রমণ বিষয়ক বিড়ম্বনার গল্প। এটি দিয়েই শুরু হয়েছে ১১ ফর্মার সংখ্যাটি। কাজল চক্রবর্তীর লেখায় উঠে এসেছে মার্কিন মুলুকে গিয়ে বাংলা ভাষার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক উপলব্ধির গল্প। কাজী এনায়েত উল্লাহর অন্টারিও লেকের অ্যাডভেঞ্চার জমেছে বেশ। কামরুল হাসান বাংলা সাহিত্যে বহুল চর্চিত ডুয়ার্সকে নতুন করে চিনিয়েছেন। চপল বাশার মালাক্কা শহরের বর্ণিল ইতিহাস ধরার চেষ্টা করেছেন।

এছাড়া জিকরুর রেজা খানম লিখেছেন সুইডেন ভ্রমণের গল্প। মাল্টায় অন্য এক মদিনার খোঁজ দিয়েছেন ফরিদুর রহমান। বিশ্বজিৎ বড়ুয়ার ইউরোপ ভ্রমণে বৈচিত্রের স্বাদ আছে। মাসরুর-উর-রহমান আবীর এর গল্প ঝাড়খণ্ড ভ্রমণের। মাহমুদ হাফিজের কালিম্পঙের সন্ধ্যা জমেছে বেশ। লিজি রহমান লিখেছেন কানাডা ফলসের গল্প।

শরৎ কুঠিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ ঢেলে দিয়েছেন সুমন্ত বন্দোপাধ্যায়। আমিরাত ভ্রমণের বিভ্রাট তুলে ধরেছেন সেলিম সোলায়মান।

এই সংখ্যার ১৫ লেখার মধ্যে ১৪টি লেখার মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্য ও পূর্ব এশিয়া- বলতে গেলে পৃথিবীর বিশাল এক অংশ এক মলাটে বন্দি হয়েছে। অবশিষ্ট একটিমাত্র লেখা এই সংখ্যার দেশের ভেতরের গল্প। সেটি লিখেছেন ড. ডি এম ফিরোজ শাহ। আগামী সংখ্যাগুলোতে দেশের ভেতরের ভ্রমণ গল্প বাড়াতে পারলে মন্দ হয় না।

এ সংখ্যায় বরাবরের মতোই খ্যাতনামা ভ্রামণিক ও ভ্রমণ লিখিয়েদের সমাবেশ ঘটেছে। তাদের লেখনীর মুন্সীয়ানাও অনেকাংশেই অটুট। যেমন মদিনা নামে মাল্টার যে অচেনা শহরটাকে ফরিদুর রহমান এই সংখ্যায় চিনিয়েছেন, সেখানে যাওয়ার পথের বর্ণনায় তিনি লিখছেন, ‘মুড়ির টিন বাসের ভেতরটা ছোট হলেও দু’পাশের দুই দুই চার সিটের বসার ব্যবস্থা ভালো। বড় জানালাগুলোর কাঁচের ওপাশের দৃশ্য পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। পাশে বসা হাফ প্যান্ট পরা লোকটি আমার জ্যাকেট দেখে বললেন, তোমার গরম লাগছে না? বললাম, আমরা গরমের দেশের লোক, ঠান্ডা ভীষণ ভয় পাই। তাই শীতের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়েছি। পথের পাশে সরিষা ফুলের মতো হলুদ ফুলে ছাওয়া ক্ষেত পার হয়ে যাচ্ছিল। হলুদ ফুলের মতো ক্ষেতগুলো সরিষা নয়, রেপসিড নামে এক ধরনের তেলবীজ।’

এই বর্ণনা নি:সন্দেহে স্থানটি না দেখা মানুষের চোখেও একটা পরিপূর্ণ চিত্র ফুটিয়ে তুলবে। যে চিত্রে মানুষ নিজের চেনা প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে কল্পনার ডানা মেলে দিতে সক্ষম হবে।

আবার কামরুল হাসানের বর্ণনায়, ‘জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সরু ও দীর্ঘ পথ গেছে। মাটির ওপর পাথর বিছানো পথ। দুপাশের গাছগুলোর প্রতিটি যেন অমিতাভ বচ্চন-একহারা, দীর্ঘদেহী, নায়কোচিত। এই জঙ্গল, জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান বাংলা সাহিত্যের প্রচুর পৃষ্ঠাজুড়ে বর্ণিত। তার মধ্য দিয়ে সত্যি সত্যিই সাফারিতে যাচ্ছি-ভাবতেই সাহিত্যের এক শিহরণ জাগে।’

এই বিবরণ শিহরণ জাগানিয়াই বটে। এই সংখ্যায় আরো আছে এমন লেখা।

তবে ‘সাহিত্য ক্যাটগরির নাম ও কাঠামোয় নতুনত্বের প্রয়াসে’ প্রায় এক দশক আগে কাজ শুরু করা ভ্রমণগদ্যের এই সংখ্যার কিছু লেখায় সাহিত্যের ছিঁটেফোটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার কিছু লেখা সাবলীলতার ধারকাছ দিয়েও ঘেঁষেনি।

দুএকটি লেখায় ভুল তথ্যের সন্নিবেশ চোখে পড়েছে। যেমন সিঙ্গাপুর থেকে এসে রাজা পরমেশ্বর মালাক্কায় শহর প্রতিষ্ঠা করেন বলে বর্ণিত হয়েছে একটি লেখায়। আদতে যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, সে সময়ে সিঙ্গাপুর ছিল একটি জেলে গ্রাম ও ছোট্ট বাণিজ্য কেন্দ্র মাত্র। বস্তুত পরমেশ্বর ছিলেন মালাক্কা প্রণালীর অপর পাড়ের সুমাত্রা সমাজ্যের যুবরাজ। উত্তরাধিকারের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি প্রণালী পাড়ি দিয়ে এ পাড়ে এসে মালাক্কা শহর প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পুরো পরিবার আর সেনাবাহিনীসহ মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে মালাক্কা সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ইউরোপীয় শক্তির আক্রমণের মুখে পালিয়ে তারই এক উত্তরসূরি সিঙ্গাপুরের কাছে জোহর সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন।

এছাড়া অন্য একটি লেখায় গাজী, কালু ও চম্পাবতীর গল্প আছে। তারা মূলত সুন্দরবন কেন্দ্রিক সভ্যতার কিংবদন্তি। কিন্তু তাদের মাজার ভ্রমণের আলোচনায় সুন্দরবন প্রসঙ্গে বা সুন্দরবনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কোনো যোগসূত্র না থাকায় পাঠকের বিভ্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে।

এসব বিষয়ে সম্পাদকের আরো সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করি।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা

#ভ্রমণগদ্য #জাকারিয়া মন্ডল #ম্যাগাজিন

মন্তব্য করুন

ব্লগ