Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩১ মে, ২০২৬ ০৩:৪৪ অপরাহ্ণ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শনের বাস্তব রূপ

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ইসলামী শিক্ষা দর্শন ও অবিস্মরণীয় অবদান বাংলাদেশে ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একটি সুসংহত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। তার নেয়া পদক্ষেপগুলো কেবল একটি প্রতিষ্ঠানই সৃষ্টি করেনি, বরং মুসলিম-অধ্যুষিত বাংলাদেশের ও বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের জ্ঞানতাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তি দান করেছে। 

তার ইসলামী শিক্ষা দর্শন ছিল ইসলামী ও জাগতিক জ্ঞানের সুসংহত ও সার্থক সমন্বয় সাধন। তিনি কেবল প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সমাজবিজ্ঞানের চর্চা হবে। তার লক্ষ্য ছিল মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন আঙ্গিকে পুনর্গঠন করা এবং এমন একদল উচ্চশিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করা, যারা উন্নত নৈতিকতা ও মূলধারার ইসলামী জ্ঞান ও ইসলামী মূল্যবোধের পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সক্ষম হবে। এখানে আমরা তার সামগ্রিক পদক্ষেপে ইসলামী শিক্ষা দর্শনের মৌল দিকগুলো খুঁজে পাই।

তার দর্শনের প্রধান দিকগুলো হলো ১. সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ঐশী ও জাগতিক উভয় প্রকার জ্ঞানের ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে দেশে একটি সুসংহত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন। ২. নতুন আঙ্গিকে মাদরাসা শিক্ষার আশু উন্নয়ন ও সুসংহত আধুনিকায়ন। 

৩. ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জনশক্তি গঠন করা, যারা দেশ ও জাতির সেবায় আরো বেশি অবদান রাখতে ও যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে আরো পারদর্শী ও কর্মতৎপর হবে। এজন্য যা যা করা দরকার ছিল, তিনি সবই করেছেন জাতির জাতীয়তাবাদী আদর্শ চেতনার পরিপূরক হিসেবে।

তার এই দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ ডিসেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন। এরপর ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি অধ্যাপক ড. এম. এ. বারীকে সভাপতি করে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ তার লালিত স্বপ্নপূরণে প্রবল সহায়ক হয়।

১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামী শিক্ষা সম্মেলনে জিয়াউর রহমান সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তার কূটনৈতিক তৎপরতায় ওআইসি এবং মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন অর্জিত হয়, যা বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মক্কা মুকাররমায় ওআইসির উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক ইসলামী শিক্ষা সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বয়ং যোগদান করেন।

সম্মেলনে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করে। এই দলে ছিলেন শিক্ষাগুরু প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, ছিলেন প্রফেসর ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইন, প্রফেসর ড. এম. এ. বারী, ড. এ. কে. এম. আইয়ুব আলী এবং মাওলানা মোহাম্মদ আবদুর রহিম। এই সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

জিয়াউর রহমানের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের ফলে ওআইসি এবং বিভিন্ন মুসলমান রাষ্ট্রের সমর্থন লাভ সহজ হয়। তার এই উদ্যোগের ফলেই সম্মেলনে এশিয়ার তিনটি মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওআইসি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ও নৈতিক পথ প্রশস্ত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি জিয়াউর রহমান ড. এ. এন. এম. মমতাজ উদ্দীন চৌধুরীকে প্রকল্প পরিচালক নিযুক্ত করেন। একই বছরের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহের শান্তডাঙ্গা-দুলালপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের দুই শতাব্দীব্যাপী সংগ্রামের সফল সমাপ্তি ঘটে। তিনি এর আইনি কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানও সম্পন্ন করেন। তার শাসনামলে ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় সংসদে ‘দ্য ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ অ্যাক্ট ১৯৮০’ এবং ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৮০’ পাস হয়। এই আইনের ৫ ধারায় ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও তুলনামূলক আইন চর্চার বিধান রাখা হয়। এই পরিকল্পনায় ৩টি অনুষদ (ধর্মতত্ত্ব, মানবিক ও বিজ্ঞান) এবং ৩টি বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট (শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অনুবাদ ও প্রকাশনা এবং মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন) অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি জিয়াউর রহমান ড. এ. এন. এম. মমতাজ উদ্দীন চৌধুরীকে প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা নিশ্চিত করেন। সামগ্রিকভাবে, শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার আধুনিকায়ন ও প্রসারে একজন সফল স্থপতির ভূমিকা পালন করেছেন। তার পরিকল্পিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট আজ ধর্মতত্ত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞানের সেতুবন্ধন হিসেবে টিকে আছে, যা তার সুদূরপ্রসারী শিক্ষা দর্শনেরই এক মূর্ত প্রতীক।

আসলে শহীদ জিয়াউর রহমান শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একটি যুগোপযোগী শিক্ষা কাঠামোর নকশা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছিলেন, যা ধারাবাহিকভাবে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যায় প্রতিষ্ঠা, ইসলামী প্রকাশনা ও গণশিক্ষাসহ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সব কার্যক্রমের শত শতগুণ সম্প্রসারণ, উভয় ধারার মাদরাসা শিক্ষার ব্যাপক উন্নয়ন-আধুনিকায়ন ও আর্থিক সক্ষমতা অর্জন এবং ইউজিসি, পিএসসিসহ সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ও ইসলামী শিক্ষার মূল অভিযোজনের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তৃতি ও শিকড় দৃঢ়করণে সহায়ক হয়।

লেখক: ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য

মন্তব্য করুন

ব্লগ