সহকারী অধ্যাপক
২৭ মে, ২০২৬ ০৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
দুই বন্ধুর হিসাব -মোঃ মুজিবুর রহমান
দুই বন্ধুর হিসাব
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
“হক্কের টাকা আগুন হয়ে
জ্বালাবে অন্তরখান,
মাজলুমের দীর্ঘশ্বাস গিয়ে
কাঁপাবে আরশ মহান।”
“লোভের আগুন নিভে যাক
মানবতার জলে,
ভাই যেন ভাইয়ের পাশে থাকে
দুঃখ-বিপদ কলে।
হক আদায়ে গড়ে উঠুক
বিশ্বাসভরা সমাজ,
মাজলুম যেন ফিরে পায়
হারানো সুখের আজ।”
***
বিশ্বাসের ঋণ ও মাজলুমের কান্না
একই গ্রামের দুইটি মানুষ,
একই পথে চলা,
একজন ছিল সরল নদী,
অন্যজন ছলাকলা।
একজন কম জানত দুনিয়া,
তবু মনটা খাঁটি,
অন্যজনের হাসির আড়াল
স্বার্থে ভরা মাটি।
চায়ের দোকান, বিকেল বেলা,
কত গল্প হতো,
বন্ধুত্বের মায়ার বাঁধন
বুকের মাঝে রত্ন।
একদিন সে কাঁদো কাঁদো
চোখে এসে কয়—
“বন্ধু আমার ব্যবসাটা
ডুবতে বসে ভয়।
তুমি ছাড়া এই দুনিয়ায়
নাই তো আপন কেউ,
কিছু টাকা দিলে বন্ধু
বাঁচবে আমার নৌ।”
সরল মানুষ বিশ্বাস করে
ভাবল মনে তাই—
“বন্ধুর দুঃখে পাশে না থাকলে
মানুষ হওয়া দায়।”
প্রথমবার দিল কিছু টাকা,
দ্বিতীয়বার আরও,
দুই বারে লাখ তিন ছাড়ালো
বিশ্বাস ছিল ভারো।
দিন যায় ধীরে, মাসও ফুরায়,
বছর ঘুরে যায়,
টাকার কথা উঠলেই শুধু
মিষ্টি কথার ছায়।
“আগামী মাসে দেবো বন্ধু,”
“এই জমিটার পরে,”
“আরেকটু সময় দাও না”—
কথা শুধু ঝরে।
মাঝে মাঝে বৈঠক বসে,
চায়ের কাপে ধোঁয়া,
কাগজ লেখা, সই-স্বাক্ষর,
আশার প্রদীপ জ্বলা।
সরল বন্ধু বুকের ভেতর
স্বপ্নগুলো রাখে,
ভাবত— “ভুল করতেই পারে,
তবু বন্ধু ফাঁকে?”
কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতির
দেয়াল হলো বড়,
ফেরত এলো না যে টাকা,
বুকটা হলো ঝড়।
কুরবানীর ঈদ এলো আবার,
শহরজুড়ে ঢল,
চতুর বন্ধু কিনে আনল
বিশাল দামের বল।
মানুষ দেখে বলাবলি করে—
“কী সম্মান! কী সুখ!”
কেউ দেখেনি সেই হাসির নিচে
কত কান্নার মুখ।
ওদিকে সেই সরল মানুষ
চুপটি করে রয়,
নিজের ঘরের অভাব দেখে
নিভৃতে শুধু ক্ষয়।
একদিন সে ফোনটা করে—
“বন্ধু কোথায় তুমি?”
ওপাশ নীরব… ফোনটা বন্ধ…
বুকের মাঝে ঘুমি।
দেখা করতে বাড়ি গেলে
বন্ধ দরজাখানা,
যে মানুষ একদিন ডাকত
আজ সে অচেনা।
টাকা হারানোর চেয়েও বড়
ভেঙে গেল বিশ্বাস,
রক্ত-মাখা সম্পর্কগুলো
হারাল ভালোবাস।
মানুষ কেন লোভের নেশায়
বিবেকটাকে মারে?
অন্যের হক কেড়ে নিয়ে
নিজে সুখী সাজারে?
হক্কের টাকা আগুন সমান,
জ্বলে অন্তর জুড়ে,
মাজলুমের কান্না গিয়ে
আরশ কাঁপায় দূরে।
দুনিয়ার আদালত হয়তো
সবই দেখে না,
কিন্তু রবের দরবারেতে
লুকায় কোনো না।
যে অসহায় রাত জেগে
চোখের পানি ফেলে,
আল্লাহ তার দীর্ঘশ্বাস
শুনেন নীরব ছলে।
হে দয়াময় মহান আল্লাহ!
ন্যায়ের তুমি রব,
অসহায়ের হারানো হক
ফিরিয়ে দিও সব।
যার সম্পদ গেছে হারিয়ে
প্রতারণার ফাঁদে,
তাকে দিও ধৈর্যের আলো
তোমার রহমত-ছাদে।
আর যে মানুষ লোভের নেশায়
মানবতা ভুলে,
তার অন্তরে হেদায়াত দাও
অন্ধকারটা খুলে।
কারণ একদিন শেষ বিচারে
খুলবে সবই ঠিক,
কার হাতে কত অন্যায় জমে
হবে তারই দিক।
সেদিন কোনো মুখোশ পরে
রক্ষা হবে না,
মাজলুমের চোখের অশ্রু
ব্যর্থ যাবে না।
তাই আজও বলি মানুষকে—
সত্য পথে চলো,
বন্ধুত্বের পবিত্র বাঁধন
মিথ্যা দিয়ে না ঢলো।
মানুষের হক বড় আমানত,
ফেরত দাও ভাই,
অন্যের কান্না বুকে নিয়ে
সুখের জীবন নাই।
লোভের দেয়াল ভেঙে গড়ে
ভালোবাসার ঘর,
মানুষ যেন মানুষকে আর
না দেয় কষ্ট পর।
সততা হোক জীবনের পথ,
মানবতা হোক সাথি,
দয়া-মায়া, ঈমান-আখলাক
ভরুক পৃথিবী মাতি।
হে আল্লাহ!
যেখানে অন্যায়, সেখানে দাও ভয়,
যেখানে মাজলুম, সেখানে দাও জয়।
যেখানে ভেঙে গেছে বিশ্বাসের বাঁধন,
সেখানে ফিরিয়ে দাও ভালোবাসার জীবন।
যেন ভাইয়ের হাতে ভাই না কাঁদে,
বন্ধু না হয় প্রতারক,
মানুষ যেন মানুষ থাকে—
এই হোক পৃথিবীর শপথ।
***
বিশ্বাসের দেয়াল ও মানবতার কান্না
একই পথে চলত দু’জন,
একই গ্রামের মানুষ,
একজন ছিল সহজ-সরল,
অন্যজনের ভেতর ফানুস।
একজন কম বলত কথা,
মনে ছিল বিশ্বাস,
অন্যজনের মিষ্টি হাসি
ছিল অভিনয়ের সুবাস।
চায়ের দোকান, সন্ধ্যা বেলা,
গল্প জমত রোজ,
বন্ধুত্বের নামে যেন
বুকের ভেতর খোঁজ।
একদিন সে দীর্ঘশ্বাসে
বন্ধুর পাশে কয়—
“বন্ধু আমার ব্যবসাটা
ডুবতে বসে ভয়।
তুমি ছাড়া আপন বলতে
নাই তো আর কেউ,
কিছু টাকা পেলে বন্ধু
বাঁচবে আমার নৌ।”
সরল মানুষ ভাবল মনে—
“বন্ধু কি হয় পর?
বন্ধুর দুঃখে পাশে থাকাই
মানবতার ঘর।”
একবার দিল, দুইবার দিল,
বিশ্বাস রেখে প্রাণ,
দুই বারে লাখ তিন টাকার
খুলল দানের দান।
দিন পেরিয়ে মাস চলে যায়,
বছর ঘুরে কাল,
টাকার কথা উঠলেই শুধু
মিষ্টি কথার জাল।
“আগামী মাসে দেবো ভাই,”
“ব্যবসাটা দাঁড়াক,”
“এই জমিটার কাজটা হলেই
সব হিসাবটা মিটাক।”
বৈঠক বসে, কাগজ লেখে,
সই-স্বাক্ষর হয়,
আশার আলো বুকের মাঝে
এখনো জেগে রয়।
সরল বন্ধু কাগজগুলো
যতনে বুকে রাখে,
ভাবত— “মানুষ ভুল করতে পারে,
তবু কি মিথ্যা শেখে?”
কিন্তু শুধু আশার পাহাড়
উঁচু হতে থাকে,
ফেরত আসে না যে টাকা
বুকের ব্যথা ডাকে।
কুরবানীর ঈদ এলো আবার,
হাটে মানুষের ঢল,
চতুর বন্ধু কিনে আনল
দামি গরুর দল।
লোকজন দেখে মুগ্ধ হয়ে
বলল— “বাহ! কী মান!”
কেউ বুঝেনি ওই সুখের নিচে
কত লুকায় টান।
ওদিকে সেই সরল মানুষ
নীরব হয়ে রয়,
নিজের ঘরের অভাব দেখে
চোখের ঘুমও ক্ষয়।
একদিন সে ফোনটা করে—
“বন্ধু কোথায় আজ?”
ওপাশ নীরব… ফোনটা বন্ধ…
বুকে কষ্টের সাজ।
বাড়ির সামনে গিয়ে দেখে
বন্ধ দরজাখানা,
যে মানুষ একদিন ডাকত
আজ সে অচেনা।
টাকা হারানো বড় নয় গো,
বড় বিশ্বাস ভাঙা,
মায়া-মমতার বন্ধন ছিঁড়ে
বুকের ভেতর রাঙা।
রক্তের মতো পবিত্র ছিল
সম্পর্কের সেই নাম,
লোভের আগুন জ্বালিয়ে দিল
সব ভালোবাসার ঘাম।
মানুষ কেন হকের টাকা
নিজের করে খায়?
অন্যের কান্না শুনেও কেন
বিবেক জাগে নাই?
হক্কের টাকা আগুন হয়ে
জ্বলে ধীরে ধীরে,
মাজলুমের দীর্ঘশ্বাস গিয়ে
কাঁপায় আরশ নীরে।
দুনিয়ার এই আদালতে
ফাঁকি দেওয়া যায়,
কিন্তু রবের বিচারের দিন
কেউ রেহাই না পায়।
যে অসহায় রাত জেগে
হারানো হক চায়,
তার কান্নার প্রতিটি শব্দ
আল্লাহ শুনে যায়।
হে ন্যায়ের মালিক আল্লাহ!
তুমি দেখো সব,
কার অন্তরে কত ছলনা,
কার চোখে কত রব।
যার সম্পদ গেছে হারিয়ে
প্রতারণার ছলে,
তাকে দিও ধৈর্যের আলো
তোমার রহমত তলে।
আর যে মানুষ লোভের নেশায়
মানবতা ভুলে যায়,
তার অন্তরে হেদায়াত দাও
সত্য যেন ফিরে পায়।
কারণ দুনিয়ার সুখের ঘর
চিরদিন থাকে না,
অন্যায়ের দেয়াল কোনোদিন
স্থায়ী হয়ে না।
শেষ বিচারের মাঠে গিয়ে
খুলবে সব হিসাব,
কার হাতে কত অন্যায় জমে
থাকবে না কোনো জবাব।
সেদিন কোনো মিথ্যা হাসি
রক্ষা করতে পারবে না,
মাজলুমের চোখের পানি
ব্যর্থ হয়ে ঝরবে না।
তাই আজও বলি সবাইকে—
সত্য পথে চলো,
বন্ধুত্বের পবিত্র বাঁধন
লোভ দিয়ে না ঢলো।
মানুষের হক বড় আমানত,
ফেরত দাও সময়,
অন্যের কান্না কাঁধে নিয়ে
শান্তি থাকে কয়?
লোভ নয়, ভালোবাসা হোক
সম্পর্কের ভিত্তি,
সততা আর মানবিকতায়
ফিরুক জীবনের সত্যি।
ভাই যেন ভাইয়ের পাশে থাকে,
বন্ধু হয় আশ্রয়,
মানুষ যেন মানুষকে আর
না দেয় হৃদয়ক্ষয়।
হে দয়াময় মহান রব!
যেখানে কান্না, সেখানে শান্তি দাও,
যেখানে অন্যায়, সেখানে ন্যায়ের আলো জ্বালাও।
যেখানে ভেঙে গেছে বিশ্বাসের ঘর,
সেখানে ফিরুক ভালোবাসা,
মানুষ যেন মানুষ হয়ে
মানবতার পথেই ভাসা।
মাজলুম যেন ফিরে পায়
তার হারানো অধিকার,
আর প্রতারকের অন্তরে জাগুক
সত্য, বিবেক ও হুঁশিয়ার।
এই পৃথিবী হোক এমন—
ভাইয়ে ভাইয়ে মায়া,
বন্ধুত্ব হোক সত্যের পথে
মানবতার ছায়া।
৪
৪ মন্তব্য