সহকারী অধ্যাপক
২৭ মে, ২০২৬ ০৭:৫২ পূর্বাহ্ণ
দুই ভাইয়ের হিসাব -মোঃ মুজিবুর রহমান
দুই ভাইয়ের হিসাব
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
এক ভাই সোজা মানুষ,
মুখে কম কথা, মনে বিশ্বাস,
লেখাপড়া তেমন জানে না,
তবু হৃদয়টা ছিল আকাশ।
আরেক ভাই বেজায় চতুর,
কথায় মিষ্টি, মনে হিসাব,
হাসিমুখে কাছে এসে
করত ভালোবাসার অভিনয় সবার সামনে অবিরাম।
“ভাই একটু টাকার দরকার,
ব্যবসাতে হবে উন্নতি,
কয়েকদিনের মধ্যেই দেবো”—
এই ছিল তার প্রতিশ্রুতি।
সরল ভাই বিশ্বাস করে
দুই বারে দিল লাখ তিন,
ভাবলো— “আপন ভাই তো,
ফেরাবে একদিন।”
দিন যায়, মাস যায়,
বছর পেরিয়ে সাল,
মাঝে মাঝে বসত বৈঠক,
চায়ের কাপে চলত চাল।
কাগজ লেখা, সই-স্বাক্ষর,
আশার নতুন আয়োজন,
টাকা ফেরত আজ না হোক,
হবে একদিন পরিশোধন।
কিন্তু শুধু কাগজ বাড়ে,
ফেরত আসে না সম্পদ,
বুকে জমে দীর্ঘশ্বাস,
চোখে নামে নীরব শোক।
কুরবানীর ঈদ এলো আবার,
শহরজুড়ে উৎসব ধ্বনি,
চতুর ভাই কিনলো গরু—
বিশাল দামে, বাহাদুরি গুণি।
মানুষ দেখে অবাক হয়ে,
“বাহ! কী সুখী তার জীবন!”
কেউ জানে না সেই সুখের নিচে
কত ভাইয়ের কান্না গোপন।
সরল ভাই ফোনটা করে—
“ভাই তুমি এখন কোথায়?”
ওপাশ নীরব… ফোনটা বন্ধ…
শব্দ শুধু বুক পোড়ায়।
দেখা করতে বাড়ি গেলে
বন্ধ থাকে দরজাখানা,
যে ভাই একদিন ডাকতো কাছে,
আজ সে যেন অচেনা।
টাকার চেয়েও বড় যে ক্ষতি—
ভেঙে গেছে সম্পর্কটা,
রক্তের ভেতর জন্ম নেওয়া
বিশ্বাস নামের সম্পদটা।
এমন বন্ধু, এমন ভাই,
সততার চায় নবায়ন,
মানুষ হয়ে মানুষ ঠকানো
কখনো নয় মানবধর্ম।
ধনীর গরু মোটা হতে পারে,
কিন্তু মনটা শুকায় ভেতর,
মাজলুমের দীর্ঘশ্বাস গিয়ে
লাগে একদিন আরশের উপর।
হে আল্লাহ! তুমি দেখো সব,
কারো চোখে লুকায় না কিছু,
অসহায়ের কান্নার শব্দ
তোমার দরবারে পৌঁছে পিছু পিছু।
যার টাকা গেছে প্রতারণায়,
তাকে দাও ধৈর্যের আলো,
আর যে মানুষ হক মেরে খায়,
তার অন্তরটা করো ভালো।
কারণ দুনিয়ার সব হিসাব
কাগজে হয় না শেষ,
একদিন হবে চূড়ান্ত বিচার—
থাকবে না কোনো পরিবেশ।
সেদিন ভাইয়ের মুখোশ খুলে
সত্য দাঁড়াবে প্রকাশ হয়ে,
মাজলুমের চোখের অশ্রু
আগুন হবে বিচার বয়ে।
তাই এখনো বলি সবাইকে—
সম্পর্ক রাখো সত্য দিয়ে,
ভাইকে ঠকিয়ে সুখের ঘর
কখনো গড়ে না দুনিয়াতে গিয়ে।
মানুষের হক বড় আমানত,
ফেরত দাও সময় থাকতে,
নইলে কান্না জমবে এমন
ঘুম হারাবে গভীর রাতে।
হে দয়াময় রব!
যাদের সম্পদ গেছে হারিয়ে,
তুমি ফিরিয়ে দাও সম্মানসহ
তোমার রহমতের ছায়া দিয়ে।
আর যাদের মন হয়েছে কঠিন,
লোভে অন্ধ, নিষ্ঠুর প্রাণ,
তাদের অন্তরে জাগিয়ে দাও
মানবতা, ঈমান, বিবেক ও জ্ঞান।
মাজলুম ভাইয়ের আর্তনাদ
একই ঘরে জন্ম দু’ভাই,
একই মায়ের দোয়া,
একজন সরল মাটির মানুষ,
আরেকজন চালাক ছোঁয়া।
এক ভাইয়ের জ্ঞান কম ছিল,
ছিল না বড় ডিগ্রি,
তবু তার বুকের ভেতর ছিল
মানুষত্বের শুদ্ধ নিগূঢ় ভরি।
অন্য ভাইটা হিসাবি বড়,
কথায় মধু ঝরে,
ভালোবাসার মুখোশ পরে
স্বার্থ লুকায় অন্তরে।
একদিন এসে বলল ধীরে—
“ভাই, একটু সাহায্য চাই,
ব্যবসাটা দাঁড় করাতে
আজকে তুমি পাশে নাই?”
সরল ভাই ভাবল মনে—
“রক্ত কি কখনো মিথ্যা হয়?
ভাইয়ের দুঃখে ভাই না দাঁড়ালে
এই জীবনের মূল্য কই?”
প্রথমবার দিল কিছু টাকা,
দ্বিতীয়বার আরও দিল,
দুই বারে লাখ তিন ছাড়ালো,
বিশ্বাস তখন চোখে মিল।
দিন যায়, মাস যায়,
বছর গড়িয়ে সাল,
টাকার কথা উঠলেই শুধু
মিষ্টি কথার জাল।
মাঝে মাঝে বসত বৈঠক,
টেবিলে চায়ের কাপ,
কাগজ লেখা, সই-স্বাক্ষর,
আশা যেন অল্প চাপ।
“এই কোরবানির আগেই দেবো”,
“ওই জমিটার কাজ হলেই”,
“আরেকটু সময় দাও ভাই”—
এভাবেই সময় চলেই।
সরল ভাই সেই কাগজগুলো
বুকের মাঝে রাখে,
ভাবত— “ভাই খারাপ হলেও
একদিন সত্য জাগে।”
কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতি বাড়ে,
ফেরত আসে না টাকা,
চোখের নিচে ঘুম হারিয়ে
বুকের ভিতর ফাঁকা।
কুরবানীর ঈদ এলো আবার,
হাটে মানুষের ঢল,
চতুর ভাই কিনে আনল
বিরাট গরু, দামি বল।
লোকজন দেখে প্রশংসা করে—
“মাশাআল্লাহ! কী বাহার!”
কেউ জানে না ওই হাসির নিচে
কত কান্না অপার।
ওদিকে সেই সরল ভাই
চুপটি করে বসে,
নিজের ঘরের অভাব দেখে
নিঃশব্দ অশ্রু ভাসে।
একদিন ফোন করল কাঁদে—
“ভাই, একটু দেখা দাও।”
ওপাশ নীরব… ফোনটা বন্ধ…
শুধু দীর্ঘশ্বাস পাও।
বাড়ির দরজায় গিয়ে দেখে
দরজাটা বন্ধ পড়ে,
যে ভাই আগে জড়িয়ে ধরত
আজ সে পালায় দূরে।
এমন কি হয় রক্তের সম্পর্কে?
এমন কি হয় ভাই?
টাকার লোভে মানুষ কেমন
নিজেকেই হারায়!
কাগজ আছে, সইও আছে,
প্রমাণ আছে হাতে,
তবু কেন সেই অসহায়ের
রাত কাটে অশ্রু সাথে?
হে আল্লাহ! তুমি ন্যায়ের মালিক,
তুমি দেখো সব,
মাজলুমের কান্না কখনো
ফিরে না নিরব রব।
যে অসহায় হক হারিয়ে
চেয়ে থাকে আকাশ পানে,
তুমি তারই চোখের জলে
রহমতের দরজা টানে।
হে রব! ফিরিয়ে দাও
হারানো সেই সম্পদ,
অন্যায়ের দেয়াল ভেঙে
দাও না ন্যায়ের রৌদ্র।
আর যে ভাই লোভের নেশায়
মানবতা ভুলে যায়,
তার অন্তরে জাগিয়ে দাও
ভয়, বিবেক, হেদায়াতের ছায়।
কারণ দুনিয়ার বিচার ফাঁকি দিলেও
শেষ বিচার এড়ানো নয়,
মানুষ ঠকিয়ে সুখের প্রাসাদ
একদিন ধুলোয় ক্ষয়।
হক্কের টাকা আগুন হয়ে
জ্বালাবে অন্তরখান,
মাজলুমের দীর্ঘশ্বাস গিয়ে
কাঁপাবে আরশ মহান।
তাই বলি—
ভাইয়ের সাথে ভাই হও,
বন্ধুর সাথে সত্য,
বিশ্বাস ভেঙে গড়া সুখ
কখনো থাকে না চিরস্থায়ী যুক্ত।
মানুষের হক বড় আমানত,
ফেরত দাও সময় থাকতে,
নইলে কাঁদবে বিবেক একদিন
নিঃসঙ্গ গভীর রাতে।
লোভ নয়, ভালোবাসা হোক
সম্পর্কের মূল ভিত্তি,
সততা, দয়া, মানবিকতায়
ফিরুক জীবনের সত্যি।
হে আল্লাহ!
যেখানে প্রতারণা, সেখানে দাও ভয়,
যেখানে কান্না, সেখানে দাও শান্তি,
যেখানে মাজলুম, সেখানে দাও জয়।
***
বিশ্বাস ভাঙার কষ্ট
একই মায়ের বুকের দুধে
বড় হয়েছিল দুই ভাই,
একজন ছিল সরল নদী,
অন্যজনের চোখে ধোঁয়াই।
একজন কম জানত দুনিয়া,
তবু মনটা ছিল সাদা,
অন্যজনের মুখে মধু,
ভেতরে ছিল স্বার্থ বাঁধা।
“ভাই, একটু টাকা দরকার,
সময় হলে ফেরত দেবো,”
এই কথাতে বিশ্বাস রেখে
সরল ভাই দিল সবই তো।
একবার নয়, দুই দুই বারে
লাখ তিন গেল হাতছাড়া,
ভাবল সে— “আপন মানুষ,
ভাই কি কখনো হয় পরা?”
দিন চলে যায়, মাসও ফুরায়,
বছর ঘুরে আসে সাল,
টাকার কথা উঠলেই শুধু
মিষ্টি কথার জালের চাল।
মাঝে মাঝে বসত বৈঠক,
চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়ে,
কাগজ লেখা, সই-স্বাক্ষর,
আশা তখন বুকে ঘুরে।
“আগামী মাসে দেবো ভাই,”
“ব্যবসাটা একটু দাঁড়াক,”
“ঈদের পরেই সব মিটাবো”—
এভাবেই সময়টা হারাক।
সরল ভাই কাগজ দেখে
স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখে,
ভাবত— “ভাই ভুল করতে পারে,
তবু কি সে প্রতারণা শেখে?”
হঠাৎ আবার কুরবানীর ঈদ,
হাটে মানুষের ঢল,
চতুর ভাই কিনে আনল
বিরাট গরু, দামি বল।
লোকজন বলে— “কী সম্মান!
কী উন্নতি! কী বাহার!”
কেউ দেখেনি ওই হাসির নিচে
মাজলুম চোখের অশ্রুধার।
ওদিকে সেই সরল ভাইটা
রাতে বসে হিসাব কষে,
নিজের ঘরে অভাব নেমে
নিঃশব্দ কান্না বুকেই বসে।
একদিন ফোন দিল কাঁপা গলায়—
“ভাই, তুমি এখন কোথায়?”
ওপাশ নীরব… ফোনটা বন্ধ…
বুকের ভেতর আগুন জ্বলায়।
দেখা করতে বাড়ি গেলে
দরজাটা বন্ধ শক্ত,
যে ভাই আগে ডাকত কাছে
আজ সে যেন পাষাণ কঠিন রক্ত।
টাকা হারানোর চেয়েও বড়
ভেঙে গেছে বিশ্বাস,
রক্তের সম্পর্ক হারিয়েছে
মায়া-মমতার সুবাস।
এমন বন্ধু, এমন ভাই,
সততার নবায়ন চাই,
মানুষ হয়ে মানুষ ঠকানো
মানবতার কাজ তো নাই।
হক্কের টাকা আগুন সমান,
জ্বলে অন্তর ধীরে ধীরে,
মাজলুমের কান্না উঠে
আরশ কাঁপায় নীরব নীড়ে।
হে আল্লাহ! তুমি ন্যায়ের মালিক,
তুমি জানো সব হিসাব,
কার হাতে কত অন্যায় জমে,
কার বুকে কত অভাব।
যে অসহায় কাঁদে রাতে
হারানো সম্পদের তরে,
তুমি তারই চোখের জলে
রহমতের দরজা খোলো করে।
ফিরিয়ে দাও হক্কের সম্পদ,
ফিরিয়ে দাও শান্তির ঘুম,
যে প্রতারণায় সুখ খোঁজে
তার বিবেকে জাগাও ধুম।
কারণ দুনিয়ার আদালত ফাঁকি
দেওয়া গেলেও একদিন,
রবের দরবারে খুলে যাবে
সব প্রতারণার রঙিন ঋণ।
তাই আজও বলি মানুষকে—
সম্পর্ক মানে দায়িত্ব,
ভাইয়ের সাথে সত্য থাকো,
সততাই হোক শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
লোভের দেয়াল ভেঙে গড়ে উঠুক
ভালোবাসার নতুন ঘর,
মানুষ মানুষকে আঁকড়ে ধরুক,
ফিরে আসুক মানবতার ডর।
হে দয়াময় আল্লাহ!
মাজলুমের ফরিয়াদ কবুল করো,
অসহায়ের হারানো হক
রহমতের আলোয় ফিরিয়ে দাও।
***
৪
৪ মন্তব্য