ফাতেমা ও কুলসুমের দাওয়াতের কাহিনী | হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর জীবনী |

দাওয়াতের আলৌকিক শিক্ষা: ফাতেমার দারিদ্র্য ও কুলসুমের প্রায়শ্চিত্ত

সে সময়কাল ছিল নবী পরিবারে অত্যন্ত কষ্টের। প্রিয় নবী কন্যা হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর ঘরে সেদিন সামান্য পরিমাণ খাবারও ছিল না। ছোট্ট হাসান (রাঃ) এবং হোসেন (রাঃ) ক্ষুধার জ্বালায় মায়ের আঁচল ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন: “মা, আমাদের খাবার দাও! আমরা খুব ক্ষুধার্ত।”
উপায় না পেয়ে হযরত ফাতেমা (রাঃ) চুলাতে কেবল গরম পানি ফোটাতে লাগলেন। তিনি অশ্রুসজল চোখে সন্তানদের সান্ত্বনা দিলেন: “এই তো বাবা, একটু পরে খাবার হয়ে যাবে। তোমরা যাও, বাইরে খেলা করো। রান্না হলেই তোমাদের ডাকব।” আসলে চুলায় কোনো খাবার ছিল না; ফাতেমা (রাঃ) শুধু পানি ফুটিয়ে সন্তানদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছিল।
জমকালো দাওয়াত ও অহংকারের ফল
অন্যদিকে, তাঁর আপন বোন কুলসুম (রাঃ)-এর বাড়িতে সেই মুহূর্তে চলছিল এক জমকালো আনন্দ উৎসব। কুলসুম ধন-সম্পদের দিক থেকে স্বাবলম্বী হওয়ায়, তাঁর দাওয়াতে বিপুল পরিমাণ ভালো ভালো খাবার—কোরমা, পোলাও সহ নানা পদের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শহরের সকল প্রভাবশালী, ধনী এবং জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। স্বয়ং প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-ও সেই মেজবানে উপস্থিত ছিলেন।
নবী করীম (সাঃ) যখন কুলসুমের কাছে জানতে চাইলেন যে, কেন তিনি তাঁর আপন বোন ফাতেমাকে আমন্ত্রণ করেননি, তখন কুলসুম দ্বিধাহীনভাবে বললেন: “আব্বাজান, ফাতেমা গরিব এবং তার পোশাক ভালো নয়। সে এই অনুষ্ঠানে এলে আমার মান-সম্মানে হানি ঘটবে, তাই তাকে ইচ্ছা করেই আমন্ত্রণ করিনি।”
নবী করীম (সাঃ) দুঃখভারাক্রান্ত মনে নীরব হয়ে রইলেন। তিনি জানতেন, তাঁর আদরের মেয়েটি ক্ষুধায় কাতর, অথচ তার বোন তাকে সম্পদ ও পোশাকের কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আল্লাহর কুদরত: খাবার পরিণত হলো পাথরে
নবীজির নীরব বেদনা বুকে নিয়ে কুলসুম যখন সবাইকে খাবার পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল। তিনি খাবারের পাত্রের ঢাকনা একে একে তুললেন। যা ছিল সুস্বাদু ও প্রস্তুত খাবার, তা মুহূর্তে কয়লা ও পাথরে পরিণত হয়ে গেছে!
কুলসুম চিৎকার করে উঠলেন: “হায় আল্লাহ! এ কী করে সম্ভব? কার অভিশাপে সব খাবার পাথর হয়ে গেল? এখন আমি এই আমন্ত্রিত অতিথিদের কী খেতে দেব? আমার মান-সম্মান কিছুই থাকবে না!”
আতঙ্কিত কুলসুম দৌঁড়ে নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে বললেন: “হে আমার পিতা! আমার সব খাবার কয়লা হয়ে গেছে! আমি এখন এই অতিথিদের কী দেব? আমার মান-সম্মান রক্ষা করুন!”
নবী করীম (সাঃ) সব কিছু বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন:
“কুলসুম! তুমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছো। তোমার ভুলের কারণে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছে! আল্লাহ তোমার উপর নারাজ হয়েছেন। তোমার আপন বোন ফাতেমা গরিব বলে তুমি তাকে এই মেজবানে আমন্ত্রণ করোনি, অথচ তার মাসুম সন্তানরা ক্ষুধার জ্বালায় কাতরাচ্ছিল। এই ঘটনা আল্লাহর দরবারে পৌঁছে গেছে। তাই তোমার সকল খাবার কয়লায় পরিণত হয়েছে।”
কুলসুম অনুতাপে ভেঙে পড়লেন। তিনি বললেন, “হায় আল্লাহ! আমি তো এতটা ভাবিনি! হে আল্লাহর নবী! আপনিই এর সমাধান দিন।”
নবী করীম (সাঃ) বললেন: “এর একটাই উপায় আছে। তোমার বোনের কাছে যাও। একমাত্র ফাতেমা পারে এই সমস্যার সমাধান করতে। নিশ্চয়ই তার ইচ্ছায় আল্লাহ সবকিছু ঠিক করে দেবেন।”
কুলসুম আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর বাড়িতে গেলেন। সেখানে গিয়ে ফাতেমা (রাঃ)-কে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং বললেন: “হে আমার বোন! আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি আমার মেজবানে শুধু তোমাকে আমন্ত্রণ করিনি, আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি!”
হযরত ফাতেমা (রাঃ) শান্ত কণ্ঠে বললেন: “না না, ঠিক আছে। আমি নিতান্ত গরিব মানুষ। শহরের ধনী মানুষেরা তোমার আমন্ত্রণে এসেছেন। আমি সেখানে গেলে তোমার মান-সম্মানে হানি হতে পারে, এটা আমি বুঝতে পেরেছি। তোমার উপর আমার কোনো রাগ নেই।”
কুলসুম তাঁর অবস্থা জানালেন: “আমার সব খাবার কয়লা হয়ে গেছে! তুমি যদি সেখানে উপস্থিত না হও, তবে এই সমস্যা সমাধান হবে না এবং আমার কোনো মান-সম্মান থাকবে না।”
হযরত ফাতেমা (রাঃ) বোনের কষ্ট বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন: “ঠিক আছে, চলো আমি ওইখানে যাচ্ছি।”
এই বলে হযরত ফাতেমা (রাঃ) তাঁর ক্ষুধার্ত হাসান ও হোসেন (রাঃ)-কে নিয়ে কুলসুমের বাড়ির দিকে গেলেন। কুলসুমের বাড়িতে পৌঁছে তিনি দেখলেন, তাঁর পিতা নবী করীম (সাঃ) তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হযরত ফাতেমা (রাঃ) সেখানে গিয়ে আল্লাহ্র নবীকে বিনয়ের সাথে সালাম দিলেন: “হে আমার পিতা! আমার সালাম গ্রহণ করুন।”
শিক্ষা:
আল্লাহর কাছে সম্পদের প্রাচুর্য নয়, বরং ঈমান, বিনয় এবং রক্তের সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। অহংকারবশত আত্মীয়কে অবজ্ঞা করলে আল্লাহর রহমত উঠে যায়।
২
২ মন্তব্য