প্রভাষক
২৩ মে, ২০২৬ ০৮:০৭ অপরাহ্ণ
মশা দূর করতে বিভিন্ন এসেনশল অয়েলের কার্যকারিতা
মশা দূর করতে বিভিন্ন এসেনশল অয়েলের কার্যকারিতা, বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, ব্যবহারের সঠিক অনুপাত এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিচে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো:
১. প্রধান এসেনশল অয়েলসমূহের বিস্তারিত কার্যকারিতালেমন ইউক্যালিপটাস (Lemon Eucalyptus Oil):বৈজ্ঞানিক নাম ও উপাদান: এর প্রধান সক্রিয় উপাদান হলো ওল-মেনথোগ্লাইকল (PMD)।
কার্যকারিতা: এটি প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০% ঘনত্বের পিএমডি (PMD) মশার কামড় থেকে প্রায় ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ৯৫% সুরক্ষা দিতে সক্ষম। এটি ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়ার মশা তাড়াতে সমানভাবে কার্যকর।
সিট্রোনেলা (Citronella Oil):উৎস: এটি এক ধরণের ঘাস (Citronella grass) থেকে তৈরি হয়।
কার্যকারিতা: মশা তাড়ানোর বাণিজ্যিক কয়েল বা লোশনে এটি বহুল ব্যবহৃত উপাদান। তবে এটি খুব দ্রুত বাতাসে উবে যায়। ত্বকে লাগালে এটি সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ ঘণ্টা মশাকে দূরে রাখতে পারে। বাতাসে স্প্রে করলে বা সিট্রোনেলা মোমবাতি জ্বালালে খোলা জায়গার মশা দ্রুত পালায়।
লবঙ্গ ও দারুচিনি তেল (Clove & Cinnamon Oil):
কার্যকারিতা: এই তেলগুলোর ঝাঁঝালো গন্ধ মশার স্নায়ুতন্ত্রকে বিভ্রান্ত করে দেয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, লবঙ্গ তেল লার্ভা বা মশার ডিম ধ্বংস করতেও বেশ কার্যকর। ত্বকে সঠিক নিয়মে লাগালে এটি প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা মশার কামড় প্রতিরোধ করে।
পেপারমিন্ট বা পুদিনা তেল (Peppermint Oil):
কার্যকারিতা: পেপারমিন্ট তেলের প্রধান উপাদান মেনথল। এর তীব্র ও শীতল গন্ধ মশা একদম সহ্য করতে পারে না। এটি মশা তাড়ানোর পাশাপাশি ঘরের মাছি ও অন্যান্য ছোট পোকা দূর করতেও সাহায্য করে। এর কার্যকারিতা সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট স্থায়ী হয়।
ল্যাভেন্ডার ও টি ট্রি অয়েল (Lavender & Tea Tree Oil):
কার্যকারিতা: ল্যাভেন্ডার তেল মশা তাড়ানোর পাশাপাশি ত্বকের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক। মশা কামড়ানোর পর চুলকানি বা লালচে ভাব কমাতেও ল্যাভেন্ডার ও টি ট্রি অয়েল দারুণ কাজ করে। এর স্থায়িত্বকাল প্রায় ১ ঘণ্টার মতো।
২. এসেনশল অয়েল মশা তাড়াতে যেভাবে কাজ করে (Mechanism)স্ত্রী মশা সাধারণত ডিম পাড়ার জন্য প্রোটিনের খোঁজে মানুষ বা প্রাণীকে কামড়ায়। মশা মানুষকে খুঁজে পাওয়ার জন্য মূলত তিনটি বিষয় ব্যবহার করে:
১. মানুষের নিঃশ্বাসের সাথে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)।২. মানুষের শরীরের ঘাম ও ত্বকে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিডের গন্ধ।
৩. শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা।এসেনশল অয়েলে থাকা উদ্বায়ী উপাদানগুলো (Volatile compounds) বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের শরীরের এই স্বাভাবিক গন্ধগুলোকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়। ফলে মশার ঘ্রাণেন্দ্রিয় অবশ বা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং তারা মানুষের উপস্থিতি টের পায় না।
৩. ব্যবহারের সঠিক রেসিপি ও অনুপাতযেহেতু এসেনশল অয়েল সরাসরি ত্বকে লাগানো বিপজ্জনক, তাই নিচে ঘরে বসে ব্যবহারের দুটি সহজ ও নিরাপদ রেসিপি দেওয়া হলো:
ক) ত্বকে লাগানোর জন্য (বডি লোশন/তেল)উপাদান:১০ থেকে ১২ ফোঁটা এসেনশল অয়েল (যেমন: লেমন ইউক্যালিপটাস বা সিট্রোনেলা)।২ টেবিল চামচ ক্যারিয়ার অয়েল (যেমন: নারকেল তেল, অলিভ অয়েল বা জোজোবা অয়েল)।প্রস্তুত প্রণালী: একটি পরিষ্কার পাত্রে দুটি তেল ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এরপর হাত, পা বা শরীরের উন্মুক্ত স্থানে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। প্রতি ২ ঘণ্টা পর পর এটি পুনরায় ব্যবহার করতে হবে।
খ) ঘরে স্প্রে করার জন্য (রুম স্প্রে)উপাদান:২০ থেকে ২৫ ফোঁটা এসেনশল অয়েল।২ টেবিল চামচ রাবিং অ্যালকোহল (বা ভদকা/উইচ হ্যাজেল - এটি তেল ও পানিকে মিশতে সাহায্য করে)।আধা কাপ ডিস্টিল্ড বা ফোটানো পানি।
প্রস্তুত প্রণালী: একটি স্প্রে বোতলে প্রথমে অ্যালকোহল ও এসেনশল অয়েল নিয়ে ভালো করে ঝাঁকিয়ে নিন। এরপর পানি মিশিয়ে পুনরায় ঝাঁকান। ঘরের কোণে, পর্দার নিচে বা দরজার চারপাশে প্রতি ৩-৪ ঘণ্টা পর পর স্প্রে করুন।
৪. বিশেষ সতর্কতা ও সীমাবদ্ধতাত্বকের সংবেদনশীলতা: যেকোনো এসেনশল অয়েল ব্যবহারের আগে হাতের ত্বকে এক ফোঁটা লাগিয়ে প্যাচ টেস্ট (Patch Test) করে নিন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুলকানি বা লালচে ভাব না হলে এটি নিরাপদ।
শিশু ও গর্ভবতী নারী: ৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ত্বকে লেমন ইউক্যালিপটাস বা তীব্র এসেনশল অয়েল ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়।
চোখ ও মুখমণ্ডল: এই তেল ভুলেও চোখ, নাক বা মুখের ভেতরে যেন না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
পোষা প্রাণী: বিড়াল বা কুকুরের জন্য অনেক এসেনশল অয়েল (যেমন: টি ট্রি বা ইউক্যালিপটাস) বিষাক্ত হতে পারে। তাই পোষা প্রাণী থাকলে ঘরে এগুলো স্প্রে করার সময় সাবধান থাকুন।
৪
৪ মন্তব্য