প্রভাষক
২৩ মে, ২০২৬ ০৭:৫৪ অপরাহ্ণ
যেভাবে সম্পন্ন হয় হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর বিদায় হজ
১০ হিজরি সনের জিলকদ ও জিলহজ মাসে (মার্চ ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম এবং শেষ পূর্ণাঙ্গ 'বিদায় হজ' সফলভাবে সম্পন্ন হয়। মক্কা বিজয়ের পর এটিই ছিল সমগ্র আরব ভূখণ্ডের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা, যেখানে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৪ হাজার সাহাবি অংশ নিয়েছিলেন।
নবীজি (সা.) যেভাবে ধাপে ধাপে এই হজের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মদিনা থেকে যাত্রা ও ইহরাম গ্রহণ (২৫ জিলকদ)প্রস্তুতি ও যাত্রা: জিলকদ মাসের ২৫ তারিখ শনিবারে জোহরের নামাজ আদায়ের পর নবীজি (সা.) মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁর সাথে তাঁর সকল স্ত্রী এবং বিশাল সাহাবি দল ছিল।
মিকাতে অবস্থান: মদিনা থেকে কিছু দূর যাওয়ার পর 'জুল-হুলাইফা' (বর্তমান আবিয়ারে আলী) নামক মিকাতে তিনি রাত্রিযাপন করেন।
পরদিন গোসল করে সুগন্ধি মেখে তিনি হজের উদ্দেশ্যে ইহরামের দুটি সাদা চাদর পরিধান করেন।
তালবিয়া পাঠ: ইহরাম বাঁধার পর তিনি তাঁর বিখ্যাত উট 'কাসওয়া'-র পিঠে চড়েন এবং উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ শুরু করেন: "লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক..."
সাহাবিরাও তাঁর সাথে তালবিয়া পাঠ করতে করতে মক্কার দিকে অগ্রসর হন।
২. মক্কায় প্রবেশ ও প্রাথমিক তওয়াফ (৪ জিলহজ)মক্কায় আগমন: টানা ৯ দিন সফর শেষে ৪ জিলহজ রবিবারে নবীজি (সা.) মক্কায় প্রবেশ করেন
উমরাহ ও সায়ি: কাবা শরিফে পৌঁছে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশে হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) চুম্বন করেন এবং কাবার চারপাশে সাতবার 'তাওয়াফে কুদুম' (আগমনী তাওয়াফ) সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার সায়ি (দৌড়ানো) করেন। নবীজি (সা.) 'হজ্জে কিরান' (একই ইহরামে উমরাহ ও হজ একত্রে) করেছিলেন বলে তিনি ইহরাম না খুলে মক্কার উপকণ্ঠে অবস্থান করেন।
৩. মিনায় অবস্থান (৮ জিলহজ)মিনায় যাত্রা: হজের মূল পর্ব শুরু হয় ৮ জিলহজ বৃহস্পতিবারে, যাকে 'ইয়াওমুত তারবিয়াহ' বলা হয়।
এই দিন সকালে নবীজি (সা.) সাহাবিদের সাথে নিয়ে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন নামাজ ও রাত্রিযাপন: মিনায় পৌঁছে তিনি জোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং পরদিন অর্থাৎ ৯ জিলহজের ফজরের নামাজ আদায় করেন।
চার রাকাতের নামাজগুলোকে তিনি কসর (সংক্ষিপ্ত করে দুই রাকাত) করে পড়েছিলেন। মিনার তাঁবুতে তিনি রাতটি অতিবাহিত করেন।
৪. আরাফাতের ময়দান ও ঐতিহাসিক ভাষণ (৯ জিলহজ)আরাফাতে যাত্রা: ৯ জিলহজ (শুক্রবার) সূর্যোদয়ের পর নবীজি (সা.) মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হন।
আরাফাতের নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য একটি তাঁবু খাটানো হয়েছিল, তিনি সেখানে বিশ্রাম নেন।ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ: দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার পর তিনি উরানা উপত্যকায় আসেন। উট 'কাসওয়া'-র পিঠে চড়ে তিনি সমবেত লাখো মানুষের উদ্দেশ্যে তাঁর জীবনের শেষ ঐতিহাসিক ভাষণ (খুতবাতুল বিদা) প্রদান করেন।
ভাষণের মূল বাণী: এই ভাষণে তিনি মানুষের জান-মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা, বর্ণবাদের অবসান (আরবদের ওপর অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই), সুদের সম্পূর্ণ বিলোপ, নারীর অধিকার ও সম্মান রক্ষা, এবং দাস-দাসীদের প্রতি মানবিক আচরণের কড়া নির্দেশ দেন। ভাষণ শেষে তিনি আসমানের দিকে তাকিয়ে বলেন, "হে আল্লাহ! আমি কি তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি?" উপস্থিত জনতা সমস্বরে বলে ওঠে, "হ্যাঁ, অবশ্যই।" তখন তিনি বলেন, "হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো।"
দ্বীনের পূর্ণতা ও উকুফ: ভাষণ শেষ হতেই সূরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াত নাজিল হয়, যার অর্থ—"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম"
এরপর বেলাল (রা.)-এর আজানের পর নবীজি একসাথে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে দীর্ঘ সময় আল্লাহর দরবারে মোনাজাত (উকুফ) করেন।
৫. মুজদালিফায় রাত্রিযাপন (৯ জিলহজ দিবাগত রাত)সূর্যাস্তের পর শান্ত ও সুশৃঙ্খলভাবে নবীজি (সা.) আরাফাত ত্যাগ করে মুজদালিফার দিকে রওনা হন।
সেখানে পৌঁছে তিনি মাগরিব ও এশার নামাজ এক আজান ও দুই ইকামতে একসাথে আদায় করেন।তিনি সেখানে রাতভর বিশ্রাম নেন এবং ফজরের নামাজ শেষে আকাশ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ দোয়া করেন। এখান থেকেই শয়তানকে মারার কঙ্কর সংগ্রহ করা হয়।
৬. বড় শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ ও কোরবানি (১০ জিলহজ)মিনায় প্রত্যাবর্তন: ১০ জিলহজ শনিবার সকালে সূর্যোদয়ের ঠিক আগে তিনি মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরে আসেন।
কঙ্কর নিক্ষেপ: মিনায় পৌঁছে তিনি সর্বপ্রথম বড় শয়তানকে (জামরাতুল আকাবা) লক্ষ্য করে একে একে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন এবং প্রতিটি নিক্ষেপের সময় 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দেন।
ঐতিহাসিক কোরবানি: কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে তিনি কোরবানির স্থানে যান। তিনি নিজ হাতে মোট ৬৩টি উট কোরবানি করেন (যা ছিল তাঁর পবিত্র জীবনকালের ৬৩ বছরের প্রতীক) এবং বাকি ৩৭টি উট হযরত আলী (রা.)-কে কোরবানি করতে বলেন—সব মিলিয়ে মোট ১০০টি উট কোরবানি করা হয়।
মাথা মুণ্ডন ও ইহরাম ত্যাগ: কোরবানি শেষে নবীজি (সা.) মাথা মুণ্ডন করেন এবং সুগন্ধি মেখে ইহরামের চাদর খুলে সাধারণ পোশাক পরিধান করেন, যার মাধ্যমে তিনি 'হালাল' হন।
৪
৪ মন্তব্য