সিনিয়র শিক্ষক
২৩ মে, ২০২৬ ০৬:০৪ অপরাহ্ণ
ভারতে জেন জি: চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি
বর্তমানে ভারতজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিষয় নিয়ে শোরগোল চলছে। সেটি হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। নাম শুনে মনে হবে এটি কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল। তবে আসলে এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এর জন্ম। আর প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় দুই কোটি অনুসারী পেয়েছে। আর বিজেপির অনুসারী প্রায় ৮৭ লাখ।
চলমান এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে গত ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। একটি মামলার শুনানির সময় তিনি দেশের বেকার তরুণদের 'তেলাপোকা'র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের কোনো কর্মসংস্থান নেই। পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সিজেপির বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে অখিলেশ যাদব, মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ থেকে শুরু করে প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের মতো বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতারাও একে সমর্থন দিচ্ছেন। অখিলেশ যাদব তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি পোস্টই করেছেন, বিজেপি বনাম সিজেপি।
জানা যায়, বিচারপতির এই তীর্যক মন্তব্যে অপমানিত হয়ে প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বানিয়ে বোস্টন ইউনিভার্সিটির পাবলিক রিলেশনসের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট ৩০ বছর বয়সি অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন ‘যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে হয়, তাহলে কী হবে?’ ব্যস, এই এক ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
প্যারোডি বা মজার ছলে তৈরি হলেও সিজেপির ৫ দফা ইশতেহারে লুকিয়ে আছে ভারতের গভীর রাজনৈতিক সংকট ও দাবি। দুর্নীতি দমন, ঘনঘন দলবদল ঠেকানো, নির্বাচনী স্বচ্ছতা, সংবাদ মাধ্যমের সংস্কার এবং ভারতের পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিসভায় নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের মতো গুরুগম্ভীর বিষয়গুলো উঠে এসেছে তাদের ডিজিটাল কন্টেন্টে। সেইসঙ্গে সাম্প্রতিক ২৩ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা মেডিক্যাল পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়েও সরব তারা।
ডিজিটাল দুনিয়ায় বিজেপির রাজনীতিকে বিপাকে ফেলা ককরোচ জনতা পার্টিকে সামলাতে মোদি সরকারও বসে নেই। ‘আইনি নোটিশের’ অজুহাতে এরমধ্যেই ভারতে সিজেপির দেড় কোটি ফলোয়ারের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টটি ব্লক করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দমে যাবার পাত্র নন। মাত্র কয়েক মিনিটেই নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে পোস্ট করেছেন ‘ককরোচ আবার ফিরেছে’। এমনকি ককরোচ পার্টির হাত থেকে রেহাই মিলবে না বলেও হুমকি দেন।
অনলাইনে সিজেপির আত্মপ্রকাশকে সমালোচকরা বিরোধী দলের আইটি সেলের সাজানো নাটক বা ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, ডেলয়েট গ্লোবালের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। ভারতের জেন-জিরা বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক ও আবাসন সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কায় জেনজিদের হাত ধরে যেভাবে সরকার পতন হয়েছে, ভারতের তরুণদের এই ক্ষোভের আগুনও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে কিনা তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তুমুল বিশ্লেষণ চলছে। দীপকে অবশ্য বলছেন, তারা যা করবেন শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক উপায়েই করবেন।
অতীতে তরুণদের রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকে জন্ম নিত বড় বড় দীর্ঘ ইশতেহার কিংবা রাজপথের আন্দোলন। আর ২০২৬ সালে এসে ভারতের জেন-জিরা তৈরি করল তেলাপোকা মার্কার এক অদম্য মিম-পার্টি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমের দেয়াল ভেঙে এই তেলাপোকার ঝাঁক যদি সত্যি সত্যিই ব্যালট বাক্সে হানা দেয়, তবে মোদি সরকারের জন্য এই উপদ্রব সামলানো যে বেশ কঠিন হবে তা বলাই যায়।
১
১ মন্তব্য