সহকারী অধ্যাপক
২৩ মে, ২০২৬ ০৪:১৭ অপরাহ্ণ
তিন বন্ধুর কবিতা - মোঃ মুজিবুর রহমান
তিন বন্ধুর কবিতা
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
তিন বন্ধুর ছিল স্বপ্নভরা
একসাথে পথ চলা,
একজন বলে—“ব্যবসা করব,
হবে সুখের দোলা।”
দ্বিতীয় জন হিসাবি খুব,
চোখে ছিলো হিসাব,
তৃতীয় জন সরল প্রাণের,
বিশ্বাসেই অভাব।
মাটির ঘ্রাণে বড় হয়েছিল
গ্রামের সাদা মন,
বন্ধুত্বকে সোনা ভেবে
দিত প্রাণের পণ।
একদিন সেই চতুর বন্ধু
মিষ্টি হেসে কয়—
“দোস্ত আমার টাকার টানাটানি,
বাঁচার উপায় নয়।
তুই যে দোস্ত জমি বেচে
টাকা রাখছিস ব্যাংকে,
ওতে কি আর লাভটা হবে?
পড়বে শুধু ফাঁকে।
আমার সাথে ব্যবসা কর,
দেখবি সুখের দিন,
অল্প ক’দিন কষ্ট করলে
ভরে যাবে ঋণ।”
সরল বন্ধু চুপটি করে
ভাবল কিছুক্ষণ,
বন্ধুত্বের মায়ার কাছে
হার মানিল মন।
বলল শেষে—“ঠিক আছে দোস্ত,
তুই যদি ভাল থাকিস,
আমার টাকা তোরই হাতে,
সুখে যেন দিন কাটিস।”
সেই যে টাকা গেলো হাতে,
বদলে গেল রূপ,
বৈঠক শুধু, কাগজ শুধু,
মিথ্যা কথার ধূপ।
আজকে হবে, কালকে হবে,
এই বলে যায় বছর,
সরল বন্ধু দাঁড়িয়ে থাকে
আশার ভাঙা ঘর।
একটা কাগজ, দুইটা সই,
তিনটা নতুন ফাইল,
টাকার কথা উঠলেই যেন
চতুর বন্ধুর স্টাইল—
“দোস্ত একটু সময় দে না,
ব্যবসাটা দাঁড়াক,
এই তো সামনে বড় লাভের
দুয়ার খুলে যাক।”
বছর ঘুরে বছর আসে,
চোখে জমে ধূলি,
বন্ধুত্বের রঙিন ছবিটা
হয়ে যায় আজ ভুলই।
যে মানুষটা বিশ্বাস করে
দিয়েছিল সবটুকু,
আজ সে শুধু হিসাব কষে
নিঃশব্দে বুক চেপে।
বাড়ির কোণে স্ত্রীর চোখে
অভিমানের ঢেউ,
সন্তান বলে—“আব্বু কেন
এত চুপচাপ নেউ?”
রাতে যখন ঘুম আসে না
বুকটা কাঁদে চুপে,
সরল মানুষ ভাবে শুধু—
“কেন গেলাম রূপে?”
বন্ধু যদি বন্ধু হতো
ফিরত না কি হক?
কেন তবে বিশ্বাস আজ
হয়ে গেল শোক?
লোভের আগুন ধীরে ধীরে
পুড়ায় মানবতা,
কাগজ-সই ঢেকে রাখে
অন্যায়ের বারতা।
মুখে হাসি, অন্তরে বিষ,
এ কেমন সম্পর্ক!
বন্ধুত্বের নাম ভাঙিয়ে
করে স্বার্থের রপ্ত।
হিসাব কষে দুনিয়া জিতে
কি হবে শেষমেশ?
হাশরের দিন দাঁড়াতে হবে
রবের দরবার দেশ।
সেদিন কিন্তু কাগজ-কলম
কোনো কাজে নাই,
হকের বোঝা কাঁধে নিয়ে
কেউ পালাতে নাই।
যার টাকা তুই খেয়েছিস
তার চোখের জল,
আরশ কাঁপায় নিঃশব্দে
দেয় অভিশাপ চল।
সরল মানুষ হার মানে না,
রবের উপর ভর,
রাতের শেষে সুবহ আসে,
মুছে অন্ধকার।
সে বলে—
“হে মহান রব! তুমি জানো
আমার বুকের ক্ষত,
আমি শুধু ন্যায়টা চাই,
দাও না হকের রত্ন।
আমি ক্ষুদ্র, আমি দুর্বল,
তুমিই ভরসা মোর,
অন্যায়ের এই আঁধার রাতে
তুমিই নূরের ঘোর।”
সময়ের চাকা ঘুরবেই একদিন,
সত্য হবে জয়,
মিথ্যার প্রাসাদ ভেঙে পড়ে
ধুলায় মিশে রয়।
বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস শুধু
ভাঙার খেলা নয়,
বন্ধুত্ব মানে বিপদে পাশে
নিঃস্বার্থ পরিচয়।
যে বন্ধু আজ লোভে পড়ে
করছে প্রতারণা,
কাল সে দেখবে শূন্য হাতে
হারিয়েছে মাননা।
তাই হে মানুষ, টাকার আগে
মানবতাকে রাখ,
হকের পথে দৃঢ় থেকো,
সত্যের প্রদীপ আঁক।
অন্ধ বিশ্বাস নয় জীবনে,
সতর্ক থেকো ভাই,
বন্ধু হলেও হিসাব রাখো,
ভুলে যেও নাই।
কারণ টাকা হারালে শুধু
ফিরে পেতে পারো,
ভাঙা মন আর ভাঙা বিশ্বাস
সহজে কি আর জোড়ো?
তিন বন্ধুর এই গল্পটা
শুধু গল্প নয়,
এ সমাজের হাজার মানুষের
নীরব হৃদয়ক্ষয়।
কেউ আজও বৈঠকে বসে,
কেউ কাগজে সই,
কেউবা শুধু আকাশ দেখে
চোখের জল লই।
তবু আশা মরে না কখনো,
সত্য বাঁচে শেষে,
মহান আল্লাহ ন্যায় করেন
নিজ রহমতের দেশে।
তিন বন্ধুর সেই কাহিনি
আজও বয়ে যায়,
গ্রামের পথে, শহরজুড়ে
নিঃশব্দ হাহাকার গায়।
চায়ের দোকান, হাটের মোড়ে
আড্ডা জমে রোজ,
বন্ধুত্বের রঙিন গল্প
শুনে সরল খোঁজ।
কেউ বলে—“দোস্ত মানুষ ভালো”,
কেউ বলে—“বিশ্বাস”,
কেউ বা মনে স্বপ্ন আঁকে
সুখের নতুন আশ।
একজন ছিল চালাক ভীষণ,
মুখে মধুর বাণী,
ভেতর জুড়ে হিসাব-নিকাশ,
চোখে টাকার পানি।
আরেক বন্ধু সরল এত,
মনটা নদীর জল,
মানুষ দেখে মানুষ ভাবত,
বুঝত না ছলচাতুরীর ছল।
জমি বেচে হাতে এলো
জীবনভরা দাম,
সেই টাকাতে গড়বে ঘর আর
সন্তানদের নাম।
হঠাৎ একদিন বন্ধু এসে
কাঁধে রাখে হাত,
“দোস্ত আমার একটু বিপদ,
কঠিন এখন রাত।
টাকা যদি দিস কিছুদিন,
ঘুরে দাঁড়াই ভাই,
ব্যবসাটা বড় হলে পরে
তোকে ভুলব নাই।”
সরল মানুষ ভাবল মনে—
“বন্ধু তো আপন,
দুঃসময়ে পাশে থাকা
এটাই তো জীবন।”
ব্যাংকের কথা উঠতেই তখন
চতুর বন্ধুর হাসি—
“ডিপোজিটে কি লাভ আছে?
ওটা তো এক ফাঁসি!
আমার সাথে টাকা রাখ,
লাভ দিবো দ্বিগুণ,
দেখবি দোস্ত, ক’দিন পরেই
ভাগ্য হবে গুণ।”
বিশ্বাসেরই সাদা কাগজ
হলো কালো দাগ,
সরল মানুষ বুঝল না যে
লুকিয়ে আছে ফাঁক।
সইয়ের পরে সই চলিল,
বৈঠকের পর বৈঠক,
টাকার কথা উঠলেই শুধু
নতুন কথার ঠেক।
“আজকে না দোস্ত, কালকে নিস”,
“ফাইল গেছে ঢাকায়”,
“একটু শুধু সময় দে না”,
এই বলে সে ফাঁকায়।
বছর গেল, সালও গেল,
বাড়ল শুধু ঋণ,
বন্ধুত্বের মধুর ভাষা
হয়ে গেল ক্ষীণ।
ঘরের ভেতর নীরবতা আর
দীর্ঘশ্বাসের ঢেউ,
স্ত্রীর চোখে প্রশ্ন জমে—
“টাকাগুলো কই রে নেউ?”
সন্তান যখন বই কিনিতে
লজ্জা পেয়ে চায়,
বাবার চোখে জল নেমে
আকাশ ভেঙে যায়।
রাতের শেষে ফজর আসে,
তবু ঘুম আর নাই,
হিসাব কষে বুকের ভেতর
শুধুই দীর্ঘশ্বাস ভাই।
একসময় যে বন্ধুটারে
ভাইয়ের মতো মানে,
আজ সে শুধু ফোনটা কেটে
মিথ্যা কথা টানে।
দেখা হলে ব্যস্ত ভান আর
মুখে অজুহাত,
“ব্যবসাতে লস হইছে দোস্ত,
কি করবো এই রাত!”
কিন্তু শহরে খবর উড়ে—
ফ্ল্যাট কিনেছে সে,
নতুন গাড়ি, নতুন অফিস
হাসছে সুখের বেশে।
সরল বন্ধু দূরে দাঁড়িয়ে
চোখের পানি লুকায়,
নিজের ভুলের আগুন যেন
নিজেকেই আজ পোড়ায়।
মানুষ চিনা কঠিন ভীষণ,
চেনা যায় না মুখে,
কেউবা হাসে বুকে ছুরি
লুকিয়ে রাখে সুখে।
কাগজ যদি সত্য হতো
মিটত কত ক্ষতি,
মিথ্যা সইয়ের আড়ালেতে
ডুবে গেছে গতি।
বন্ধুত্বের নাম ভাঙিয়ে
কত মানুষ খায়,
হকের টাকা মেরে দিয়ে
ভদ্রতার মুখ চায়।
কিন্তু তারা ভুলে যায় এক—
আছেন একজন রব,
নিঃশব্দ কান্না, ভাঙা হৃদয়
সবই রাখেন সব।
মজলুমের সেই চোখের পানি
অকারণে ঝরে না,
হকের দাবি আরশ ছুঁয়ে
কখনো নষ্ট হয় না।
যে প্রতারণা করে আজ
হাসছে বুক ফুলায়ে,
কাল সে হয়তো দাঁড়াবে একা
নিজ পাপের ছায়ায়।
কারণ দুনিয়া ক্ষণিক মেলা,
চিরস্থায়ী নয়,
আজকে যার হাতে ক্ষমতা
কাল সে মাটির সয়।
হাশরের সেই বিশাল মাঠে
থাকবে না পরিচয়,
সেখানে শুধু আমল আর হক
মানুষ চিনে লয়।
সেদিন কোনো দলিল-দস্তাবেজ
বাঁচাতে পারবে না,
অন্যায়ের সব অন্ধকার
ঢেকে রাখতে পারবে না।
যার টাকা তুই আটকে রাখিস
তার দীর্ঘশ্বাস ভার,
নিঃশব্দে তা পৌঁছে যায়
আরশের দরবার।
সরল বন্ধু তাই এখনো
রবের দিকেই চায়,
“হে আল্লাহ! তুমি ন্যায়বিচার
একদিন ফিরায়।”
সে বলে—
“আমি কাউরে অভিশাপ দেই না,
তুমি বিচার কর,
আমার হকের প্রতিটি কণা
ফিরিয়ে দিও পর।
আমি শুধু শান্তি চাই,
সত্যের একটু আলো,
অন্যায়ের এই কালো পথে
তুমি থেকো ভালো।”
সময়ের চাকা থেমে থাকে না,
ঘুরবেই অবিরাম,
মিথ্যার প্রাসাদ একদিন হয়
ধূলিমাখা নাম।
তাই হে মানুষ, শিক্ষা নাও
এই কাহিনির ভেতর,
টাকার আগে সততা রাখো
মানবতার অন্তর।
বন্ধু হলেও হিসাব রেখো,
কাগজ রেখো ঠিক,
অন্ধ বিশ্বাস জীবনজুড়ে
ডেকে আনে দুঃখের দিক।
কারণ বিশ্বাস ভাঙার ব্যথা
নীরব আগুন সম,
বুকের ভেতর জ্বলে জ্বলে
করে মানুষ ক্ষণ।
তবু যারা সত্য পথে
ধৈর্য ধরে রয়,
মহান আল্লাহ তাদের সাথে
রহমতেরই স্রোত বই।
তিন বন্ধুর এই উপাখ্যান
শুধু ছন্দ নয়,
এ সমাজের লুকিয়ে থাকা
হাজার কষ্টময়।
কোথাও এখন বৈঠক বসে,
কোথাও সই চলে,
কোথাও আবার সরল মানুষ
নীরবে চোখ তোলে।
তবু সত্য হারায় না কভু,
যতই আসুক ক্ষয়,
রবের আদালতে একদিন
ন্যায়েরই হবে জয়।
***
বন্ধুত্ব ছিল বটগাছ যেন
ছায়া দিত প্রাণে,
তিনটি বন্ধু স্বপ্ন বুনত
একই সুখের টানে।
একজন খুব চতুর ধাঁচের,
কথায় মধুর রঙ,
হাসির আড়াল লুকিয়ে রাখে
স্বার্থের বিষদংশ।
আরেকজন মাঝামাঝি,
হিসাব জানে ঠিক,
তৃতীয় জন সরল ভীষণ,
মানুষ চিনত দিক।
মাটির মানুষ, সাদা মন তার,
চোখে বিশ্বাস ভরা,
বন্ধু মানেই আপন মানুষ—
এই ছিল ধ্যানধরা।
জমি বেচে হাতে এলো
জীবন গড়ার মূল,
সন্তানদের ভবিষ্যতের
আশা রঙিন ফুল।
ভাবল সে—
“একটা ঘর আর শান্তি নিয়ে
বাঁচব সারা জীবন,
কষ্টগুলো দূরে যাবে,
হাসবে আপনজন।”
এমন সময় চতুর বন্ধু
এলো কাছে ধীরে,
মুখে হাসি, চোখে মায়া,
কথা মাখা নীরে।
“দোস্ত রে ভাই! একটু বিপদ,
টাকা লাগে খুব,
তুই না দিলে ডুবে যাবো,
নাই যে কোনো সুব।”
সরল বন্ধু কাঁপা গলায়
বলল তখন চুপে—
“ব্যাংকে রাখছি জমির টাকা,
সেইটা আছে রূপে।”
চতুর তখন হেসে বলে—
“ব্যাংকে লাভটা কি?
ডিপোজিটে কয়টা টাকা?
তুই তো বুঝিস নি!
আমার সাথে ব্যবসা কর,
লাভ দিবো বেশী,
এক বছরেই দেখবি দোস্ত
টাকা হবে রাশি।”
বন্ধুত্বের মায়ার কাছে
হার মানিল মন,
না করারও শক্তি ছিল না,
জিতে গেল পণ।
টাকা গেল বন্ধুর হাতে,
স্বপ্ন গেল ভেসে,
বিশ্বাস নামের সাদা পাখি
হারাল অচিন দেশে।
প্রথম প্রথম বৈঠক বসে,
চা আর কথার ঢেউ,
“এই তো হবে”, “ওই তো হবে”—
মিষ্টি কথার নেউ।
কাগজ লেখা, সই চলিল,
ফাইল বাড়ে রোজ,
টাকার কথা উঠলেই শুধু
নতুন অজুহাত খোঁজ।
“ব্যবসাটা দাঁড়াক আগে”,
“মাল গেছে বাজার”,
“ঢাকা থেকে টাকা এলেই
শোধ করব আবার।”
বছর যায় আর সালও ফুরায়,
ফিরে আসে না হক,
সরল মানুষ বুকের ভেতর
লুকিয়ে রাখে শোক।
স্ত্রীর চোখে নীরব প্রশ্ন—
“কি হলো সেই টাকা?”
সন্তান বলে—“আব্বু কেন
মনটা থাকে ফাঁকা?”
রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ,
ঘুম আসে না আর,
নিঃশব্দে সে আকাশ দেখে
ফেলে দীর্ঘশ্বাস ভার।
মনে পড়ে সেই বিকেলের
বন্ধুত্বের হাত,
যে হাত ধরে স্বপ্ন দেখত
আজ সে দিল ঘাত।
বন্ধু যদি বন্ধু হতো
করত না প্রতার,
হকের টাকা মেরে খেয়ে
হাসত না বারবার।
মানুষ কত রঙ বদলায়
টাকার মোহে পড়ে,
চেনা মুখও অচেনা হয়
লোভের আগুন ঝড়ে।
আজ যে বন্ধু ফোনটা ধরে
মিষ্টি করে কয়,
কাল সে শুধু ব্যস্ত মানুষ
চেনার সময় নয়।
বৈঠক শুধু বাড়তেই থাকে,
শেষ হয় না কথা,
সরল মানুষ বুঝতে পারে
এ এক নীরব ব্যথা।
কাগজ যেন জালের মতো
জড়িয়ে ধরে প্রাণ,
স্বাক্ষরেরই আড়ালেতে
হারিয়ে গেছে মান।
যে মানুষটা বিশ্বাস করে
দিয়েছিল সবটুকু,
আজ সে শুধু স্মৃতি কাঁদে
বুকের ভেতর চুপু।
তবু সে তো অভিশাপের
ভাষা জানে না,
মহান রবের দরবার ছাড়া
আর পথ মানে না।
ফজর রাতে হাত তোলে সে—
“হে দয়াময় রব!
তুমি ছাড়া দুঃখ আমার
শোনার কেউই নব।
আমি কাউরে ক্ষতি চাই না,
চাই না কোনো বদ,
শুধু আমার হকের অংশ
ফিরিয়ে দিও সদ।
যে আমায় ঠকিয়েছে আজ
তাকেও দিও হিদায়াত,
অন্যায়ের এই অন্ধ পথে
জাগুক সত্যের আয়াত।”
কারণ দুনিয়া ক্ষণিকেরই
মায়াভরা ঘর,
আজকে যারে রাজা লাগে
কাল সে মাটির পর।
হাশরের সেই ময়দানে আর
চলবে না চালাকি,
সেখানে সব প্রকাশ হবে
লুকাবে না ফাঁকি।
সেদিন কোনো সই-কাগজ
বাঁচাতে পারবে না,
মজলুমের চোখের পানির
হিসাব মুছবে না।
যার হক তুই আটকে রাখিস
ভাবিস নিজের জয়,
জেনে রাখিস নিঃশব্দ কান্না
আরশ ছুঁয়ে রয়।
লোভের আগুন যতই জ্বলে
শেষে ছাই হয় সব,
সত্যের আলো নিভে না কভু
দেখেন মহান রব।
তাই হে মানুষ! শিক্ষা নাও
এই কাহিনির তলে,
বন্ধুত্ব আর টাকার মাঝে
সতর্ক থেকো চলে।
হিসাব ছাড়া টাকা দিও না,
যত আপন হোক,
অন্ধ বিশ্বাস অনেক সময়
ডেকে আনে শোক।
মানবতা আর সত্যটাকে
সবসময় দিও স্থান,
হকের উপর দাঁড়িয়ে থাকাই
মুমিনের পরিচয় জ্ঞান।
কারণ টাকা হারালে হয়তো
আবার ফিরে পাই,
ভাঙা মন আর ভাঙা বিশ্বাস
সহজে জোড়া নাই।
আজও কত সরল মানুষ
বৈঠকে বসে রয়,
কেউবা শুধু কাগজ ধরে
নিঃশব্দ অশ্রু বই।
কেউবা ভাবে—
“হয়তো বন্ধু ফিরবে আবার,
দেবে আমার হক”,
এই আশাতেই কেটে যায় দিন
বুকের ভেতর শোক।
তবু আশা মরেনা কভু,
সত্য থাকে বেঁচে,
মহান আল্লাহ ন্যায় করেন
নিজ রহমত মেখে।
একদিন সব হিসাব হবে
রবের আদালতে,
সত্য তখন মাথা তুলে
হাসবে নূরের পথে।
***
জীবনের এই মেলায় কত
চেনা মুখের ভিড়,
কেউবা বন্ধু হৃদয় জুড়ে,
কেউবা বিষের নীড়।
তিনটি বন্ধু পাশাপাশি
হাঁটত দিনের পর,
স্বপ্নগুলো রঙিন ছিল
নীল আকাশের ঘর।
একজনের চোখে শুধু
টাকার হিসাব কষা,
আরেকজন মাঝপথেতে
চুপটি থাকা ভাষা।
তৃতীয় জন সরল ভীষণ,
মনটা শিশুর মতো,
মানুষ দেখলেই বিশ্বাস করত
ভাবত আপন কত।
গ্রামের পথে কাদামাটি,
ধানের শিষের গান,
সেই মাটিতেই বড় হয়েছিল
তাদের তিন প্রাণ।
চায়ের দোকান, সন্ধ্যার আড্ডা,
হাসির কলতান,
বন্ধুত্বের গল্প শুনে
মুগ্ধ হতো প্রাণ।
একদিন সেই সরল মানুষ
জমি বিক্রি করে,
স্বপ্নভরা কিছু টাকা
রাখল বুকের তরে।
ভাবল মনে—
“এ টাকাতে ঘর বানাবো,
সন্তান হবে সুখী,
স্ত্রীর চোখের দীর্ঘশ্বাস
যাবে একদিন মুছি।”
হঠাৎ তখন চতুর বন্ধু
এলো কাছে ধীরে,
মুখে হাসি, অন্তরে ঝড়,
কথা মাখা নীরে।
“দোস্ত রে ভাই! একটু বিপদ,
টাকা লাগবে খুব,
তুই না দিলে ব্যবসাটা
ডুবে যাবে ডুব।
তুই যে দোস্ত জমি বেচে
টাকা রাখছিস ব্যাংকে,
ডিপোজিটে কি আর লাভ?
পড়বি শুধু ফাঁকে।
আমার সাথে ব্যবসা কর,
লাভ হবে দ্বিগুণ,
একটু শুধু ভরসা রাখ,
ঘুরে যাবে গুণ।”
সরল বন্ধু চুপটি করে
তাকায় আকাশ পানে,
বন্ধুত্বের মায়ার কাছে
হার মানে অজানেই।
বলল শেষে—
“তুই তো আমার আপন মানুষ,
কেমনে করি না?
তোর দুঃখে পাশে থাকাই
বন্ধুত্বের চিহ্ন না?”
সেই যে টাকা গেলো হাতে
বদলে গেল রূপ,
বন্ধুত্বের সাদা পাতায়
জমল কালো ধূপ।
প্রথম প্রথম বৈঠক বসে,
হাসির রঙিন ঢেউ,
চা আর কথার ফাঁকে ফাঁকে
মিষ্টি প্রতিশ্রুতি নেউ।
“আজকে না ভাই, কালকে হবে”,
“ফাইল গেছে ঢাকায়”,
“একটু শুধু সময় দে না”,
এই বলে সে ফাঁকায়।
কাগজ লেখা, সই চলিল,
ফাইল বাড়ে রোজ,
টাকার কথা উঠলেই শুধু
নতুন অজুহাত খোঁজ।
বছর ঘুরে সালও ফুরায়,
ফিরে আসে না হক,
সরল মানুষ বুকের ভেতর
চেপে রাখে শোক।
স্ত্রীর চোখে জমে থাকে
নিঃশব্দ অভিমান,
সন্তান বলে—
“আব্বু কেন চুপচাপ আজ?
কি হারালো প্রাণ?”
রাতের শেষে ঘুম ভেঙে যায়
ফজরের আজানে,
চোখের পানি ঝরে নীরব
অন্ধকারের টানে।
মনে পড়ে সেই বিকেলের
বন্ধুত্বের হাত,
যে হাত ধরে স্বপ্ন দেখত
আজ সে দিল ঘাত।
বন্ধু যদি বন্ধু হতো
করত না প্রতার,
হকের টাকা মেরে খেয়ে
হাসত না বারবার।
মানুষ কত রঙ বদলায়
টাকার মোহে পড়ে,
চেনা মুখও অচেনা হয়
স্বার্থের আগুন ঝড়ে।
আজ যে বন্ধু ফোনে বলে—
“দোস্ত! একটু পরে”,
কাল সে শুধু ব্যস্ত মানুষ
অচেনা শহরে।
বৈঠক শুধু বাড়তেই থাকে,
শেষ হয় না কিছু,
সরল মানুষ বুঝতে পারে
শূন্য হলো পিছু।
কাগজ যেন জালের মতো
জড়িয়ে ধরে প্রাণ,
স্বাক্ষরেরই আড়ালেতে
হারিয়ে গেছে মান।
যে মানুষটা বিশ্বাস করে
দিয়েছিল সবটুকু,
আজ সে শুধু নীরব বসে
বুকের ব্যথা ঢাকে।
তবু সে তো অভিশাপের
ভাষা জানে না,
মহান রবের দরবার ছাড়া
আর পথ মানে না।
রাতের শেষে হাত তোলে সে
নিভৃত অশ্রু ভরে—
“হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া আর
কেউ নাই এ ঘরে।
আমি কাউরে ক্ষতি চাই না,
চাই না কোনো বদ,
শুধু আমার হকের অংশ
ফিরিয়ে দিও সদ।
যে আমায় আজ ঠকিয়েছে
তাকেও দিও হিদায়াত,
অন্যায়ের এ আঁধার পথে
জাগুক নূরের আয়াত।”
কারণ দুনিয়া ক্ষণিক মেলা,
স্থায়ী কিছু নয়,
আজকে যার হাতে ক্ষমতা
কাল সে মাটির সয়।
হাশরের সেই বিশাল মাঠে
চলবে না চালাকি,
সেখানে সব প্রকাশ হবে,
লুকাবে না ফাঁকি।
সেদিন কোনো সই-কাগজ
বাঁচাতে পারবে না,
মজলুমের চোখের পানির
হিসাব মুছবে না।
যার হক তুই আটকে রাখিস
ভাবিস নিজের জয়,
জেনে রাখিস নিঃশব্দ কান্না
আরশ ছুঁয়ে রয়।
লোভের আগুন যতই জ্বলে
শেষে ছাই হয় সব,
সত্যের আলো নিভে না কভু,
দেখেন মহান রব।
তাই হে মানুষ! শিক্ষা নাও
এই কাহিনির তলে,
বন্ধুত্ব আর টাকার মাঝে
সতর্ক থেকো চলে।
হিসাব ছাড়া টাকা দিও না,
যত আপন হোক,
অন্ধ বিশ্বাস অনেক সময়
ডেকে আনে শোক।
মানবতা আর সত্যটাকে
সবসময় দিও স্থান,
হকের উপর দাঁড়িয়ে থাকাই
মুমিনের পরিচয় জ্ঞান।
কারণ টাকা হারালে হয়তো
আবার ফিরে পাই,
ভাঙা মন আর ভাঙা বিশ্বাস
সহজে জোড়া নাই।
আজও কত সরল মানুষ
বৈঠকে বসে রয়,
কেউবা শুধু কাগজ ধরে
নিঃশব্দ অশ্রু বই।
কেউবা ভাবে—
“হয়তো বন্ধু ফিরবে আবার,
দেবে আমার হক”,
এই আশাতেই কেটে যায় দিন
বুকের ভেতর শোক।
তবু আশা মরে না কভু,
সত্য থাকে বেঁচে,
মহান আল্লাহ ন্যায় করেন
নিজ রহমত মেখে।
একদিন সব হিসাব হবে
রবের আদালতে,
সত্য তখন মাথা তুলে
হাসবে নূরের পথে।
৪
৪ মন্তব্য