প্রভাষক
২০ মে, ২০২৬ ১১:০০ পূর্বাহ্ণ
রাগ নিয়ন্ত্রণ করার ফজিলত
ইসলামে রাগ বা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করাকে ঈমানের একটি অন্যতম পূর্ণতা এবং জান্নাতি বান্দাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। নিচে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে রাগ নিয়ন্ত্রণের ফজিলত এবং এটি দমনের বাস্তবসম্মত ও সুন্নাহসম্মত উপায়গুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
১. কুরআন ও হাদিসের আলোকে রাগ নিয়ন্ত্রণের বিস্তারিত ফজিলত কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিশেষ সম্মান ও পুরস্কার পছন্দ মতো হুর বেছে নেওয়ার সুযোগ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি নিজের রাগ প্রয়োগ করার পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা চেপে রাখে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে পুরো সৃষ্টির সামনে ডেকে এনে বলবেন, তুমি নিজের পছন্দমতো যেকোনো হুর বেছে নাও" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৭৭)।
ঈমান ও প্রশান্তিতে অন্তর পূর্ণ হওয়া: অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রাগ দমনের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা হজম করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার অন্তরকে ঈমান, নিরাপত্তা ও পরম সন্তুষ্টি দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন।
আল্লাহর ক্রোধ থেকে মুক্তি: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোন আমলটি আমাকে আল্লাহর গজব বা ক্রোধ থেকে দূরে রাখবে? নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, "তুমি নিজের রাগকে সংবরণ করো" (মুসনাদে আহমাদ)।জান্নাতের সুনিশ্চিত গ্যারান্টিনবীজির সংক্ষিপ্ত কিন্তু শ্রেষ্ঠ উপদেশ: হযরত আবু দর্দা (রা.) নবীজিকে বলেছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমল শিখিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে"। নবীজি (সা.) ছোট একটি বাক্যে উত্তর দিলেন, "রাগ করো না, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত" (আল-মুজামুল কাবীর, তবারানী)।
আল্লাহর মহব্বত ও ভালোবাসা লাভমুহসিন বা সৎকর্মশীলদের কাতারভুক্ত হওয়া: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:"যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায়ই (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; নিশ্চয়ই আল্লাহ এ ধরনের সৎকর্মশীলদের অত্যন্ত ভালোবাসেন।" (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)প্রকৃত বীর ও শক্তিশালী হওয়ার স্বীকৃতিমানসিক শক্তির পরিচয়: ইসলামে বীরত্বের সংজ্ঞা শারীরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সেই ব্যক্তি শক্তিশালী বা প্রকৃত বীর নয় যে কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে আছাড় দিয়ে হারিয়ে দেয়; বরং প্রকৃত বীর তো সেই ব্যক্তি, যে রাগের চরম মুহূর্তেও নিজেকে সংবরণ করতে পারে" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)।
২. রাগ নিয়ন্ত্রণের সুন্নাহসম্মত ও মনস্তাত্ত্বিক উপায়ইসলাম রাগ পুরোপুরি দূর করতে বলে না, কারণ রাগ মানুষের একটি স্বাভাবিক আবেগ। তবে রাগ যাতে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সেজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু দারুণ কৌশল শিখিয়েছেন:
ইস্তিগফার বা শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া: রাগ সরাসরি শয়তানের পক্ষ থেকে আসে।
রাগের আভাস পেলেই মুখে উচ্চারণ করতে হবে:‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজিম’ (অর্থ: আমি বিতাড়িত শয়তানের কু-মন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই)।শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন করা: নবীজি (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়, তবে সে যেন বসে পড়ে। যদি বসে থাকার পরও রাগ না কমে, তবে সে যেন শুয়ে পড়ে" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৪)। এটি বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত যে শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন করলে রক্তচাপ ও মস্তিষ্কের উত্তেজনা কমে যায়।
অজু করা: হাদিসে এসেছে, "রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে এবং শয়তানকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে। আর আগুন নেভানো হয় পানি দিয়ে। তাই তোমাদের কারো যখন প্রচণ্ড রাগ উঠবে, সে যেন সুন্দরভাবে অজু করে নেয়" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৪)।
চুপ থাকা (মৌনতা অবলম্বন): রাগের মাথায় মানুষ এমন সব কথা বা সিদ্ধান্ত নেয় যা পরবর্তীতে অনুশোচনার কারণ হয়। তাই নবীজি (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, "যখন তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয়, সে যেন চুপ হয়ে যায়" (সহিহ আল-বুখারি, আদাবুল মুফরাদ)।
৩. অতিরিক্ত রাগের ইহকালীন অপকারিতাবিবেক ও স্মৃতিশক্তি লোপ পায়: অতিরিক্ত রাগ মানুষের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং হিতাহিত জ্ঞানকে সাময়িকভাবে নষ্ট করে দেয়।
সম্পর্ক ধ্বংস হয়: রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো ছিন্ন করে ফেলে, যার পরিণতিতে পরবর্তী সময়ে একাকীত্ব ও মানসিক কষ্ট গ্রাস করে।
শারীরিক ক্ষতি: চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, অতিরিক্ত রাগের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ (Heart Attack) এবং ব্রেন স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
৪
৪ মন্তব্য