Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ মে, ২০২৬ ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ

প্রাথমিকে শিখন ঘণ্টার ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’: রিপোর্ট, বাস্তবতা ও অস্বস্তিকর সত্য

প্রাথমিকে শিখন ঘণ্টার ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’: রিপোর্ট, বাস্তবতা ও অস্বস্তিকর সত্য

কাগজে-কলমে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বছরে শিশু থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৫৪০ ঘণ্টা এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে প্রায় ৭২০ ঘণ্টা শিখন সময় নির্ধারিত। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই এই সময়টুকু কার্যকরভাবে পাচ্ছে? নাকি শিখন ঘণ্টার বড় একটি অংশ নানামুখী কার্যক্রম, প্রশাসনিক চাপ ও কাঠামোগত দুর্বলতার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে?

সাম্প্রতিক UNICEF প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত রিডিং দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না এবং কার্যকর শিখন সময় বাস্তবে ২০০ থেকে ২৫০ ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রথম দেখায় এ তথ্য অতিরঞ্জিত মনে হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ পাওয়া যায়।

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে শিখন সময়?

সরকারি হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রায় ১৮৫ দিন শ্রেণি কার্যক্রম চলে। কিন্তু এর ভেতরে জাতীয় দিবস, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ফুটবল টুর্নামেন্ট, প্রশাসনিক সভা, প্রশিক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিক্ষক ছুটি ও বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে বড় অংশের সময় পাঠদানের বাইরে চলে যায়।

একটি আনুমানিক হিসাব বলছে—

সময় নষ্টের খাত

সম্ভাব্য ক্ষতি

ক্রীড়া ও টুর্নামেন্ট

১৫ দিন

জাতীয় দিবস ও অনুষ্ঠান

৬ দিন

প্রশাসনিক কাজ ও প্রশিক্ষণ

১০ দিন

শিক্ষক ছুটি ও অন্যান্য

১২ দিন

প্রাকৃতিক দুর্যোগ

৫ দিন

সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৪২ দিন কার্যকর পাঠদান ব্যাহত হয়। অর্থাৎ মোট শিখন সময়ের প্রায় ৩০ শতাংশ হারিয়ে যাচ্ছে।

পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতা

শ্রেণি

নির্ধারিত সময়

সম্ভাব্য ক্ষতি

বাস্তব শিখন সময়

প্রাক-প্রাথমিক – ২য়

৫৪০ ঘণ্টা

১২৬ ঘণ্টা

প্রায় ৪১৪ ঘণ্টা

৩য় – ৫ম

৭২০ ঘণ্টা

১৬৮ ঘণ্টা

প্রায় ৫৫২ ঘণ্টা

তবে এখানেই প্রশ্ন শেষ নয়। কারণ “বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা” আর “কার্যকর শিখন” এক জিনিস নয়। একটি শ্রেণিকক্ষে যদি শিক্ষককে একইসঙ্গে একাধিক শ্রেণি সামলাতে হয়, প্রশাসনিক কাজ করতে হয়, মিড-ডে মিল বিতরণ তদারকি করতে হয় কিংবা মূল্যায়নের কাগজপত্র প্রস্তুত করতে হয়, তাহলে প্রকৃত শিক্ষণ-শেখানো সময় আরও কমে আসে।

শিক্ষক সংকট: নীরব বাস্তবতা

দেশের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ৫ থেকে ৭টি শিক্ষক পদ রয়েছে। অথচ শিক্ষার্থী সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে শিক্ষককে প্রায় বিরতিহীনভাবে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ক্লাস নিতে হয়। একইসঙ্গে পাঠ পরিকল্পনা, উপকরণ তৈরি, ধারাবাহিক মূল্যায়ন, তথ্য সংরক্ষণ, অনলাইন রিপোর্টিং এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হয়।

একজন শিক্ষক ছুটিতে গেলে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে বিকল্প শিক্ষক থাকে না। ফলে সেই শ্রেণির পাঠদান কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এই কাঠামোগত সংকটের দায় শুধু শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালেই থেকে যায়।

শিক্ষা উপকরণ ও বাজেট সংকট

মানসম্মত শিখন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, শিশু-বান্ধব শ্রেণিকক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ। বাস্তবে বিদ্যালয়গুলোতে বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত। ধারাবাহিক মূল্যায়ন, সামষ্টিক মূল্যায়ন ও শিখন উপকরণ তৈরিতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, বাস্তবে তার খুব সামান্য অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে “সহজলভ্য ও বিনামূল্যের উপকরণ” ব্যবহারের নির্দেশনা বাস্তবতার সঙ্গে অনেকাংশেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে অধিকাংশ উপকরণ কিনতেই হয়, যা অনেক শিক্ষককে ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়।

পুষ্টিহীনতা ও করোনাকালীন শিখন ঘাটতি

শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু না খেয়ে বা অপর্যাপ্ত খাবার খেয়ে বিদ্যালয়ে আসে। এতে তাদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মিড-ডে মিল কর্মসূচি সীমিত এলাকায় চালু থাকলেও তা এখনো সারা দেশে বিস্তৃত হয়নি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাকালীন দীর্ঘ শিখন ঘাটতি। বর্তমানে মাধ্যমিকে পড়া অনেক শিক্ষার্থী কোভিড সময়ে প্রাথমিক স্তরে ছিল। দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তাদের ভিত্তিগত দক্ষতায় বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব এখনো বহমান।

ইউনিসেফের রিপোর্ট: অতিরঞ্জন নাকি সতর্কবার্তা?

ইউনিসেফের ২০০-২৫০ ঘণ্টার হিসাব হয়তো অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে যদি “কার্যকর শিখন সময়” অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি, মনোযোগী ও ফলপ্রসূ মিথস্ক্রিয়ার সময় হিসাব করা হয়, তাহলে বাস্তবতা হয়তো আরও উদ্বেগজনক।

তাই এই রিপোর্টকে কেবল সমালোচনার চোখে না দেখে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা ও মৌলিক শিখন ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো জাতিকেই বহন করতে হবে।

এখন কী প্রয়োজন?

শুধু দায়ারোপ নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সমাধান—

  • পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ

  • প্রশাসনিক চাপ কমানো

  • শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিখন সময় বৃদ্ধি

  • শিশু-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা

  • শিক্ষা উপকরণে বাস্তবসম্মত বরাদ্দ বৃদ্ধি

  • পুষ্টি সহায়তা সম্প্রসারণ

  • করোনাকালীন শিখন ঘাটতি পূরণে বিশেষ কর্মসূচি

  • শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও প্রণোদনা বৃদ্ধি

কারণ শিক্ষা খাতে যেখানে ১০০ টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে যদি ১০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে ফলাফলও ১০ ভাগের বেশি হওয়ার আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রাথমিক শিক্ষার এই “শুভঙ্করের ফাঁকি” দূর করতে হলে কাগজের হিসাব নয়, বাস্তব শ্রেণিকক্ষের সত্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।

উপসংহার

প্রাথমিক শিক্ষা হলো একটি জাতির ভিত্তি। এই ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়, তবে উচ্চশিক্ষার যত আধুনিক ভবনই আমরা নির্মাণ করি না কেন, তা ভেঙে পড়তে বাধ্য। ইউনিসেফের প্রতিবেদনটি আমাদের জন্য কোনো শাস্তির দলিল নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। ১০ শতাংশ বিনিয়োগ করে ১০০ শতাংশ ফলাফল পাওয়ার অলীক কল্পনা ছেড়ে আমাদের বাস্তবমুখী হতে হবে। শিক্ষকদের হাতে প্রয়োজনীয় রসদ, সম্মান এবং সঠিক পরিবেশ তুলে দিলে তবেই তারা আগামীর দক্ষ নাগরিক গড়ে তুলতে পারবেন। দায় কেবল শিক্ষকের নয়, দায় আমাদের সবার—পুরো ব্যবস্থার। এই ব্যবস্থার সংস্কারই এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ