Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ মে, ২০২৬ ০৬:২৪ অপরাহ্ণ

কৃষি বিজ্ঞান অর্থনী‌তি বাংলাদেশের অস্তিত্বের মেরুদণ্ড

কৃষি বিজ্ঞান অর্থনী‌তি বাংলাদেশের অস্তিত্বের মেরুদণ্ড 




যুক্তরাস্ট্র,চীন,জামা‌নি,ব্রা‌জিল,নেদারল‌্যান্ডস দেশগু‌লির নাম সবাই জা‌নি! এক‌টি ঝাঁকু‌নি দি‌তেই  উপ‌রের দেশ‌ের নাম এ‌সেছে প্রথ‌মে কেন? এই দেশসমুহই পৃ‌থিবীর প্রধান কৃষিপন‌্য রপ্তা‌নিকারক দেশ, বছ‌রে এক যুক্তরাষ্ট্রই প্রায় ২০০ বি‌লিয়ন এর অ‌ধিক কৃ‌ষিপন‌্য রপ্তা‌নি ক‌রে, তাদের গ‌বেষণা খাত,আই‌টিখাত,কৃ‌ষিখাত, সব ক্ষে‌ত্রেই প‌লি‌সি করা র‌য়ে‌ছে সে অনুপা‌তে তারা চল‌ছে, কৃ‌ষিতে তাদের এত ম‌নো‌যোগ হওয়ার প্রধান কারণ এ‌টির প্রয়োজনীয়তা কখনই ক‌মে যা‌বে না বরং বাড়‌বেই থাক‌বে। 


বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার মূলে রয়েছে কৃষি। বর্তমান আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এসএস‌সি বা মাধ্যমিক পর্যায়ে কৃষি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা যেমন বাড়ছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা তেমনই উদ্বেগজনক। 

 ১. এসএসসি পর্যায়ে কৃষি শিক্ষার গুরুত্ব

মাধ্যমিক পর্যায় হলো একজন শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ার সময়। বাংলাদেশের মোট জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১২-১৩% এবং জনশক্তির একটি বড় অংশ কৃষিতে নিয়োজিত। শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, শস্য পর্যায় এবং মাটির উর্বরতা সম্পর্কে ধারণা দিলে ভবিষ্যতে তারা দক্ষ কৃষি উদ্যোক্তা হতে পারবে। যে ট্রনিং যুব উন্নয়ন অ‌ধিদপ্তর/কৃ‌ষি অ‌ফিস উপ‌জেলা পযা‌য়ে  দেয় তা মাধ‌্যমিক স্ত‌রে পাঠবই‌য়ের সং‌যোজন ক‌রে প্রদান কর‌লে তোন কস্ট ছাড়াই প্রশিক্ষণ প্রদান সম্পন্ন হত, অ‌নেক ঝ‌ড়ে প‌ড়ে অদক্ষ হি‌সেবেই কম‌ে নিযুক্ত হয় কৃ‌ষি‌কে এক‌টি বিজ্ঞান টেক‌নিক‌্যাল সাব‌জেক্ট হি‌সে‌বে উন্নীত করা উচিত।।

 উদ্যোক্তা তৈরি, বর্তমানে শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের হার বাড়ছে। এসএসসি পর্যায়ে কৃষি শিক্ষা থাকলে একজন শিক্ষার্থী কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং হাতে-কলমে মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগি পালন বা নার্সারি করার প্রাথমিক জ্ঞান পায়, যা তাকে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করে।

 জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। লবণাক্ততা সহনশীল ফসল বা খরাপ্রবণ এলাকায় চাষাবাদের আধুনিক পদ্ধতিগুলো পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে ভবিষ্যতের খাদ্য সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত করা সম্ভব।GAP (Good Agricultural Practices): নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে 'Farm to Fork' (খামার থেকে ভোক্তা) প্রক্রিয়ায় কীভাবে উত্তম কৃষি চর্চা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর বিশেষ অধ‌্যায় থাক‌তে পা‌রে,জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM),কৃ‌ষি‌তে এআই ব‌্যবহার,কৃ‌ষি অ‌্যাপ,ইত‌্যা‌দি বিষ‌য়ে বিশদ আকা‌রে পাঠ‌্য রাখা যায়।



প্রযুক্তির ব্যবহার:ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা এবং স্মার্ট এগ্রিকালচার সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান এই পর্যায়েই দেওয়া জরুরি, যাতে কৃষি কেবল 'লাঙল-জোয়ালের' পেশা হিসেবে নয়, বরং একটি সম্মানজনক 'বিজ্ঞান' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও বর্তমান সংকট

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কৃষি শিক্ষার বর্তমান অবস্থা বেশ অব‌হে‌লিত বলা যায়। এই অবহেলার কয়েকটি দিক হলো:

 ঐচ্ছিক বিষয়ের সীমাবদ্ধতা: দীর্ঘ সময় ধরে কৃষি শিক্ষাকে কেবল একটি 'ঐচ্ছিক' বা 'অতিরিক্ত' বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই বিষয়ের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ের প্রতি অনাগ্রহী করে তুলছে। বি‌শেষ ক‌রে ৬ষ্ঠ হ‌তে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ধারাবা‌হিক মূল‌্যায়ন হি‌সে‌বে রাখা হ‌য়ে‌ছে এ‌তে‌ ক‌রে শিক্ষাথীরা বিষয়‌টি গুরুত্ব দি‌য়ে পড়‌তে;যেমন চায়না তেম‌নি অ‌নেক প্রতিষ্ঠা‌নে গুরুত্ব দি‌য়ে ধারাবা‌হিক মুল‌্যায়ন ও করা হয়না।।  

 ব্যবহারিক ক্লাসের অভাব: কৃষি একটি সম্পূর্ণ প্রায়োগিক বিষয়। কিন্তু অধিকাংশ স্কুলে পর্যাপ্ত জমি, ল্যাবরেটরি বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। 

পাঠ্যক্রমের সেকেলে ধরণ:বিশ্বজুড়ে যখন 'স্মার্ট ফার্মিং' এবং 'অ্যাকুয়াপনিক্স' নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আমাদের কৃ‌ষি পাঠ‌্যক্রম সেই তত্ত্বে আটকে আছে। এই আধুনিকায়নের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব পরিলক্ষিত হয়।

৩. করণীয় ও উত্তরণের পথ

কৃষি শিক্ষার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

 1. আবশ্যিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা: কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে অন্তত মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত কৃষি শিক্ষাকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং এর  পাঠ‌্যবই ,পাঠদান‌কৌশল,মূল্যায়ন পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা।

 2.অবকাঠামো উন্নয়ন:প্রতিটি স্কুলে একটি ছোট হলেও 'কৃষি কর্নার' বা 'মডেল গার্ডেন' বাধ্যতামূলক করা।

 3. প্রযুক্তিগত সংযোগ:সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে স্কুলগুলোর সমন্বয় ঘটানো, যাতে শিক্ষার্থীরা আধুনিক গবেষণার সাথে পরিচিত হতে পারে।

 কৃষিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন অসম্ভব। তাই এসএসসি পর্যায়ে কৃষি শিক্ষাকে কেবল একটি পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি প্রযু‌ক্তি‌নির্ভর আধু‌নিক দক্ষতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কর্তৃপক্ষের নীরবতা ভেঙে কৃষি বিজ্ঞান অর্থনী‌তি বাংলাদেশের অস্তিত্বের মেরুদণ্ড হি‌সে‌বে আ‌বিভূত হোক এটাই আমা‌দের প্রত‌্যাশা।।



মোঃ শামীমুল ইসলাম

সহকারী শিক্ষক ( কৃষি )

জগতপুর উচ্চ বিদ‌্যালয়।।

মন্তব্য করুন

ব্লগ