সহকারী শিক্ষক
১২ মে, ২০২৬ ১১:৩০ অপরাহ্ণ
বাহ! প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬
বাহ! প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬
সময়টা তখন করোনা শুরু হওয়ার আগে। ব্যাংক অফিসার থেকে প্রাইমারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করা-২০২০ ইং এ।
যোগদানের আগে শ্রেণি কক্ষে কীভাবে পাঠদান করবো তার চিত্র তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা। কীভাবে পড়াবো, কীভাবে সময় কাটবে শিশুদের সাথে। নানান কল্পনায় কেটে যেত দিন। ইন্টারনেটে খুঁজতে লাগলাম কীভাবে পড়াতে হয়। দেখতে লাগলান বিভিন্ন দেশের শিক্ষা পদ্ধতি। পড়ানোর ধরণ। শিশুদের বই পড়ানোর থেকে কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পড়ানো যায় ভালো করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্কুলের ভিডিও দেখে ক্লাস পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করতে লাগলাম।
শিশুদের পড়াতে পারবো কিনা এই ভয় থাকতো মনে। প্রস্তুত করে রাখলাম ক্লাসের জন্য। বিভিন্ন গান বা কবিতা প্র্যাকটিস করে রাখলাম।
অবশেষে বিদ্যালয় যাওয়ার দিন আসলো। এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে বিদ্যালয় পথে। সবুজ মাঠ পেরিয়ে ৭ মাইল দূরের স্কুলে পৌঁছে আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো। শিশুদের স্বপ্ন দেখে অবাক। তাদের আগ্রহ দেখে আমি বিস্মিত। তাদের জানার প্রতি তীব্র বাসনায় আমি বিমোহিত।
আমার সব স্বপ্ন পুরন হলো ছোট্ট শিশুদের ছোঁয়া পেয়ে।
গ্রামের কাদাময় রাস্তা আমার প্রিয় হয়ে উঠলো শিশুদের ভালোবাসা পেয়ে।
হোম ভিজিটের মাধ্যমে খুলে গেলো সম্ভাবনার আরেক দুয়ার। তৈরি হলো এলাকাবাসীর সাথে নিবিড় সম্পর্ক।
কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে কাদা পেরিয়ে দেখতে যেতাম। শুনতাম পরিবারের কাছ থেকে নানান কাহিনি।
বাড়তে লাগলো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা।
আইসিটির ব্যবহার করতে লাগলাম ক্লাস রুমে। পড়াশুনার পাশাপাশি কো-কারিকুলাম একটিভিটিস করতে লাগলাম। শিশুদের যখন এটা করবো, ওটা করবো বলতাম। বলতে না বলতেই তাদের নরম হাতে অসম্ভব জিনিসগুলো সম্ভব হয়ে যায়। ফিরে পেতে লাগলাম আত্মবিশ্বাস। কাজ করতে লাগলাম শিশুদের নিয়ে।
ইংরেজি রিডিং-এর জন্য ফনিটিক্স নিয়ে আসলাম।
যেমন : M এর বাংলা, ম এর উচ্চারণ দিয়ে ইংরেজি পড়তেই তারা রিডিং পারতে শুরু করলো।
গণিতে আদিম যুগের গণিতের প্রাকটিকাল ধারণা দিয়ে শিখাতে লাগলাম। গনিত হয়ে উঠলো আনন্দের।
জীবনের লক্ষ্য হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করা। পাঠ পরিকল্পনায় সাজতাম নানাবিধ কৌশল। তৈরি করতে লাগলাম উপকরণ। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস দিয়ে নানান উপকরণ হয়ে উঠলো শিক্ষার্থীদের প্রিয় শেখার উপকরণ।
লিখতে শুরু করলাম হোম ভিজিটের গল্প। পেলাম নানার নিত্যনতুন কাহিনি।
আমি হয়ে গেলাম তাদের খেলার সাথি।
সময়টা জুলাই বিপ্লবের পর।
উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের ভাইভা দিলাম।
হঠাৎ খবর আসলো উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হয়েছি। খবরটা বিশ্বাস করতে পারিনি।
এই অর্জন আমার নয়। এটা কচিকাঁচা শিক্ষার্থীদের। তাদের উৎসাহ উদ্দীপনায় এই পাওয়া। জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের ভাইভা দিতে গিয়ে নতুন অনেক অভিজ্ঞতা হলো। অনেক ভালো শিক্ষকের সাথে পরিচয় হলো। তাদের কাজ, শিক্ষা নিয়ে পরিকল্পনা দেখে আমি অবাক। বলতে গেলে তাদের কাছ থেকে অনেক শিখেছি অল্প সময়ে।
নতুন করে ভাবতে লাগলাম প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে।
পরবর্তী বছরের জন্য নিজেকে তৈরি করতে লাগলাম।
তিনটা বই-এর পাণ্ডুলিপি তৈরি করলাম।
রাত দিন পরিশ্রম করে আইসিটি বিভিন্ন সার্টিফিকেট অর্জন, কোর্স করতে লাগলাম। শিক্ষক বাতায়নে কন্টেন্ট আপলোড দিলাম। শিক্ষা নিয়ে লিখতে লাগলাম।
দেশে দেশে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে গবেষনাধর্মি বই লিখতে লাগলাম।
সহজলভ্য উপকরণ তৈরি করতে লাগলাম।
বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অবস্থানের জন্য অ্যাপস তৈরির কাঠামো তৈরি করলাম।
ক্লাস্টার পর্যায়ে আইসিটির কাজ করতে লাগলাম।
শিক্ষক বাতায় ডিজিটাল কন্টেন্ট আপলোড, ইউটিউবে শিক্ষা নিয়ে ভিডিও দিতে লাগলাম। অবশেষে একদিন খবর পেলাম আমি জেলা আইসিটি অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ পেলাম।
প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে নতুন করে কাজ করার সুযোগ পেলাম।
শিক্ষার্থী উন্নয়নে নানান কাজ করা শুরু করে দিলাম। তাদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, বনভোজন করা, বা কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের জ্ঞান বিকশিত করার জন্য নাননা পদক্ষেপ হাতে নিলাম।
একবার স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী যোগেন মাস্টার, বিদ্যালয় আসলো অনেক বছর পর। সদরে থাকে। তার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নানান পরামর্শ পেলাম। লিখে রাখলাম। শিক্ষা দিতে গিয়ে সেই পরামর্শগুলো কাজে লাগলো।
লিখতে শুরু করলাম "শিক্ষা গুরুর কথা" নামে বই।
বিভিন্ন অবসর প্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছ থেকে চাকরির গল্প সংগ্রহ করতে লাগলাম।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন সরকার আসলো। ঘোষণা দিলো, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক-২০২৬ বাছাই করা হবে। নিজেকে গুছিয়ে নিতে লাগলাম। সব মানদণ্ডগুলো পুরন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম।
গতকাল ক্লাস্টার পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বাঁচাই করেছে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার সমন্বয় মিটিং এ। সেখানে আমাকে বাছাই করে নাই। আমি জানতাম না বাছাই প্রক্রিয়া। অন্য একজন সহকারী শিক্ষকের নাম উপজেলায় প্রেরণ করছে। প্রধান শিক্ষকরা আমার নাম পর্যন্ত নেইনি।
আমাকে বাছাই করেনি বা নিজের নানান কর্মকাণ্ডগুলো উপস্থাপনের সুযোগ পায়নি, তাতে কোনো কষ্ট নেই। শুধু এটুকু বিশ্বাস করি, জুলাইয়ে ছাত্ররা জীবন দিয়েছে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশে তৈরিতে।
আমার কাজ, আমার কথা, লেখা, আমার শিক্ষার্থীদের ভালো লাগলেই হলো। তাদের মনে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে স্থান করে নিতে পারলেই হলো। তাদের সাদা মনে জায়গা পাওয়াই আমার বাসনা। পরিশেষে এটাই বলি, ছোট্ট শিশুদের আগ্রহের কারণে আমার লেখা, আমার কথাগুলো, তাদের কল্পনার শুভ্র মেঘের ভেলায় এগিয়ে চলছি অজানা আকাশে।
ফেরদাউস রুমেল
উপজেলা সহকারী শ্রেষ্ঠ শিক্ষক-২০২৪
জেলা আইসিটি অ্যাম্বাসেডর
বাদল রতনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
মেহেন্দিগঞ্জ, বরিশাল।
৪
৪ মন্তব্য