Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ মে, ২০২৬ ১০:৩৪ অপরাহ্ণ

নিয়োগ-বিভ্রাট ও ‘ঘোলাপানির মৎস্যকূল’

নিয়োগ-বিভ্রাট ও ‘ঘোলাপানির মৎস্যকূল’


একটি নাতিদীর্ঘ রম্যপুরাণ


বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ-অঙ্গন আজকাল যেন এক অদ্ভুত নাট্যমঞ্চ। এখানে প্রার্থীরা কেবল পরীক্ষার্থী নন, বরং দীর্ঘসূত্রতা, অনিশ্চয়তা ও প্রহসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা একেকজন ক্লান্ত যোদ্ধা। পুরো ঘটনাপ্রবাহ কখনো ওয়ানডে ম্যাচের উত্তেজনা নয়; বরং বৃষ্টিতে বারবার থেমে যাওয়া এক অনির্ধারিত টেস্ট ম্যাচ— যেখানে ফলাফলের চেয়ে অপেক্ষার দৈর্ঘ্যই বেশি আলোচিত।


নাটকের সূচনা হয়েছিল এক রাজকীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে। আবেদন সম্পন্ন, স্বপ্নগুলো তখন ধীরে ধীরে ডানা মেলছে— এমন সময় হঠাৎ বেজে উঠল প্রশাসনিক সাইরেন:

“বিজ্ঞপ্তি বাতিল!”


কারণ? অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও কিছু ওজন যোগ করতে হবে।

ঠিক আছে, ভাবলাম— নিয়োগের রান্নায় হয়তো অভিজ্ঞতার নুন-মরিচ একটু কম ছিল। নতুন করে বিজ্ঞপ্তি এলো, আমরাও নবউদ্যমে মাঠে নামলাম। কিন্তু বিধিবাম! এবার মঞ্চে প্রবেশ করল ‘মামলা-যোদ্ধা’ ও ‘আন্দোলন-বিশারদ’ বাহিনী। তাদের ঘোষিত কিংবা অঘোষিত মূলমন্ত্র যেন একটাই—


> “পরীক্ষা দেব না, দিতেও দেব না!”




এর সঙ্গে যুক্ত হলো অভিজ্ঞতার চালুনি থেকে ঝরে পড়া ক্ষুব্ধ এক দল। ফলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া ধীরে ধীরে পরীক্ষার ময়দান থেকে রূপ নিল আদালত, মিছিল ও সংবাদ সম্মেলনের ত্রিমুখী নাটকে।


১৬ তারিখের রায়ের অপেক্ষায় তখন প্রার্থীদের হৃদস্পন্দন ডিজিটাল ঘড়ির সেকেন্ডকেও হার মানাচ্ছে। এমন সময় শোনা গেল— পরীক্ষা বাতিলের জয়ধ্বনি। কেউ কেউ তো আনন্দে প্রায় বিজয়-মিছিলের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু তারা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন, সরকারের তূণীরে তখনও ‘আপিল’ নামক এক ব্রহ্মাস্ত্র অবশিষ্ট আছে।


সন্ধ্যার পর রায়ের মোড় ঘুরতেই শুরু হলো আসল অভিযান—

“ঢাকা চলো!”


প্রান্তিক জেলা থেকে কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে, কেউবা রাতজাগা উৎকণ্ঠা নিয়ে রাজধানীমুখী। দৃশ্যটা এমন, যেন আমরা সবাই কোনো মহারণের সৈনিক; পার্থক্য শুধু হাতে তরবারি নেই, আছে প্রবেশপত্র।


অবশেষে ১৮ এপ্রিল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। প্রশ্নপত্র দেখে মনে হলো— এবার অন্তত ‘সহজে পার’ হওয়ার সংস্কৃতির সঙ্গে আপস করা হয়নি। মেধাবীদের চোখে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক ফুটল, আর শর্টকাটনির্ভর কৌশলবিদদের কপালে দেখা দিল চিন্তার ভাঁজ।


ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল, প্রায় ৩১ শতাংশ প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু আসল নাটক যেন শুরু হলো এরপরই।


‘ফেলুদা’ বাহিনীর সংবাদ সম্মেলন


যারা উত্তীর্ণ হতে পারেননি, তাদের একাংশের মূল প্রশ্ন এখন—

“NTRCA পরীক্ষা নিল কেন?”


তাদের অপ্রকাশিত প্রত্যাশা যেন অনেকটা এরকম—

“মেধা দিয়ে কী হবে? নিয়োগটা কমিটির হাতে দিন, বাকিটা আমরা ‘সামাজিক যোগাযোগ’ দিয়েই সামলে নেব!”


এখানেই এসে জন্ম নেয় সেই চিরচেনা প্রবাদ—

“ঘোলাপানিতে মাছ শিকার।”


স্বচ্ছ জলে জাল ফেললে যেখানে যোগ্যতার মাছ ধরা পড়ে, সেখানে সুবিধাবাদীরা বরাবরই চায় পানিটাকে একটু কাদাময় করতে। কারণ অস্বচ্ছতার অন্ধকারেই সুপারিশ, পক্ষপাত আর ‘চেনাজানা’র পোয়া মাছ সহজে বগলদাবা করা যায়।


এদিকে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা ব্যস্ত— “ভাইভা কবে?” এই উৎকণ্ঠায়। আর অন্যপক্ষ দিবাস্বপ্ন দেখছে পুরোনো সেই কমিটি-নির্ভর নিয়োগব্যবস্থার পুনর্জন্মের। তারা হয়তো এখনও বিশ্বাস করে, ডিজিটাল যুগেও যোগ্যতার চেয়ে ‘যোগাযোগ’ বেশি কার্যকর।


কিন্তু সময় বদলেছে। অন্তত বর্তমান বাস্তবতা এটুকু স্পষ্ট করেছে যে, শিক্ষকতার মতো পেশায় এখন কেবল পরিচয়ের জোরে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ শ্রেণিকক্ষে শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা নয়, দক্ষতাই কথা বলে।


যারা ১৮ এপ্রিলের বৈতরণী মেধার জোরে পার হয়েছেন, তাদের অতিরিক্ত অস্থির হওয়ার কারণ নেই। সংবাদ সম্মেলনের মাইক্রোফোনে অনেক শব্দ তোলা যায়, কিন্তু মেধার বিপক্ষে স্থায়ী দেয়াল তোলা যায় না। কৃত্রিম কুয়াশা কিছু সময়ের জন্য দৃশ্য আড়াল করতে পারে, সূর্যকে নয়।


উপসংহার


তাই হে উত্তীর্ণ শিক্ষকবৃন্দ, অস্থিরতা ঝেড়ে ফেলুন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসটুকু আরেকবার ঝালিয়ে নিন। কারণ ইতিহাস বলে— ঘোলা পানির জাল যত বিস্তৃতই হোক, স্বচ্ছ জলের মাছ শেষ পর্যন্ত আলো চিনেই সাঁতার কাটে।


আর যারা এখনও অস্বচ্ছতার পুরোনো জাল বুনতে ব্যস্ত, তাদের জন্য সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—

যোগ্যতার দরজায় পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু একবার দরজা খুলে গেলে সুপারিশের কাগজ সেখানে খুব বেশি মূল্য পায় না।


মুফিদুল আলম

শিক্ষক

রামু,কক্সবাজার


  কাউকে ব্যক্তিগত আঘাত দেয়ার উদ্দেশ্যে রচিত নয়। 

মন্তব্য করুন

ব্লগ