Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ মে, ২০২৬ ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ

মা, জীবন আর সংগ্রামের মন্ত্র যার কাছে

যে মা কখনো নিজের কথা বলেননি, আজ তার কথা বলার সময় এসেছে। কারণ এই গল্প না জানলে, আমরা বুঝব না, আমরা কীভাবে এলাম। আমরা কত ভালো আছি। নাতি-নাতনিরা, আজ তোমাদের একটা গল্প বলব। এটা রাজা-রানির গল্প নয়, পরীর গল্পও নয়। এটা তোমাদের দাদির গল্প। মিরগাং গ্রামের এক সাধারণ মায়ের অসাধারণ জীবনের কথা। যে গল্প কোনো বইয়ে লেখা নেই, কোনো পুরস্কার পায়নি, কিন্তু এই গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তোমাদের শিকড়।

সুন্দরবনের একদম কোলঘেঁষে আমাদের মিরগাং গ্রাম। এখানে জীবন মানে প্রকৃতির সাথে প্রতিদিনের সন্ধি। নদী আছে, বন আছে, কাদামাটির পথ আছে। আর আছে কিছু নিয়ম নীতির বেড়াজাল, এখানে যারা বাস করে, তারা জানে কীভাবে কষ্ট বুকে চেপে হাসতে হয়। তোমাদের দাদিকে দেখো একটু। এখন বয়স হয়েছে। পিঠ একটু বাঁকা। হাঁটতে গেলে ব্যথা লাগে। চোখে ঝাপসা দেখেন। কিন্তু এই মানুষটাই একসময় মাথায় কলস নিয়ে তিন কিলোমিটার হাঁটতেন পানির জন্য। এই মানুষটাই বাঘের ভয়ে না থেমে বনে গেছেন সংসারের প্রয়োজনে। আজ সেই গল্প শোনার সময় এসেছে। ‘দাদিকে যখন জিজ্ঞেস করি, দাদি, তুমি কষ্ট পাওনি?’ তিনি একটু হাসেন। বলেন, ‘পেয়েছি তো। কিন্তু কষ্টকে ভয় পেলে সংসার চলে না বাপ।’ এই কথাটুকু আমার সারাজীবনের শিক্ষা।

তোমাদের দাদি এই গ্রামে এসেছিলেন বারো বছর বয়সে। সেই সময়ের কথা বলতে গেলে তাঁর চোখ একটু ভিজে ওঠে। বলেন, তখন নদীর জল মিষ্টি ছিল। মাঠে ধান ছিল। বনে মাছ ছিল। কিন্তু সেই দিনগুলো আস্তে আস্তে বদলে গেছে এবং সেই বদলের নাম হলো জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রের পানি বাড়ছে প্রতি বছর। নদী ভাঙছে। মাটির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে লবণ। যে জমিতে একসময় ধান ফলত, সেই জমিতে এখন কিছুই জন্মায় না। লবণাক্ততায় নষ্ট হয়ে গেছে মিরগাং-এর বেশিরভাগ কৃষিজমি। শতকরা ৬০ ভাগ কৃষিজমি লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩ কি.মি. সুপেয় পানির জন্য প্রতিদিনের হাঁটা ৪০ বছর ধরে সমুদ্র ক্রমশ উঁচু হচ্ছে।

দাদি বলেন, সেই সকালের কথা, যেদিন প্রথম বুঝলেন কুয়ার জল নোনতা হয়ে গেছে। সেদিন ভাত রেঁধেছিলেন। কিন্তু খেতে বসে সবাই থেমে গেল। ভাত নোনতা। শুধু লবণ বেশি হয়েছে ভেবেছিলেন প্রথমে। কিন্তু পরের দিনও। তার পরের দিনও। তখন বুঝলেন জলটাই পাল্টে গেছে। ‘সেইদিন বুঝলাম ,ঝড় আসে, চলে যায়। কিন্তু লবণটা থেকে যায়। মাটিতে ঢুকে যায়, পানিতে মিশে যায়। এই লবণের সাথেই আমাদের বাকি জীবন পার করতে হবে।’ তোমরা এখন নলকূপ থেকে পানি নাও। ট্যাপ খুললেই পানি আসে। কিন্তু তোমাদের দাদির জীবনে এটা ছিল না। সুপেয় পানি পাওয়ার জন্য তাঁকে প্রতিদিন হাঁটতে হতো তিন কিলোমিটার। মাথায় মাটির কলস নিয়ে। খালি পায়ে।

শীতের কুয়াশায় ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়তেন। বর্ষায় হাঁটু সমান কাদা ভেঙে। গরমে মাথার উপর সূর্য যখন আগুনের মতো। এই যাওয়া-আসায় লাগত দুই থেকে তিন ঘণ্টা। দিনে একবার নয়, কখনো দুবারও যেতে হতো। লবণ পানি পান করলে কী হয়, জানো? শুধু তৃষ্ণা মেটে না। শরীর আরও বেশি পানি চায়। দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানি খেলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়, চামড়া রুক্ষ হয়ে যায়। দাদির শরীরে আজ যে রোগগুলো তার অনেকটার পেছনে আছে এই লবণজলের বছরের পর বছরের সঙ্গ। ‘একবার পেটে ব্যথা নিয়েও পানি আনতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। কলসটা ভেঙে গেল, পানি মাটিতে মিশে গেল। বসে কাঁদলাম না, উঠলাম, আবার গেলাম। কারণ বাড়িতে তোমাদের বাবা আর চাচারা অপেক্ষা করছে।’

মিরগাং গ্রামের মানুষ ঝড় চেনে। শুধু চেনে না, ঝড়ের সাথে বাঁচতে জানে। কারণ এই উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আসে বারবার। আর প্রতিটা ঝড় শুধু ঘর ভাঙে না, ভেঙে দেয় সংসারের ভীত, কেড়ে নেয় বছরের ফসল, মুছে দেয় আগামীর স্বপ্ন।

সিডর- ২০০৭, সেই রাতটার কথা দাদি কখনো ভুলতে পারেন না। ঘর উড়ে গেল, গরু গেল, গোলার ধান গেল। পাঁচটি সন্তান নিয়ে তিন দিন সাইক্লোন শেল্টারে ছিলেন। ফিরে এসে দেখলেন, সব শেষ। কিন্তু তিনি থামেননি। আবার শুরু করেছিলেন।

আইলা– ২০০৯, আইলার পর নদীর বাঁধ ভেঙে গেল। সমুদ্রের জল ঢুকে গেল মাঠে মাঠে। সেই লবণ মাটিতে এখনো পুরোপুরি মেলেনি। ফসল কমে গেল। সংসারে দেখা দিল চরম সংকট।

২০১০ থেকে ২০১৫, তোমাদের দাদা মাছ ধরতে বের হতেন সুন্দরবনে। কখনো সপ্তাহ, কখনো মাসখানেক। সেই সময়ে পুরো সংসার একাই সামলাতেন দাদি। অন্যের জমিতে কাজ করেছেন। ধান কেটেছেন মজুরি নিয়ে।

২০১৫ পরবর্তী, উপার্জন কমতে থাকল। মাছ কমেছে নদীতে, ফসল কমেছে মাঠে। তোমাদের বাবা-কাকারা কাজ খুঁজতে শহরে গেলেন। দাদি একা রইলেন গ্রামে। জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বড় বড় সম্মেলনে হয়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন মূল্য দেন মিরগাং-এর মতো গ্রামের মানুষ। সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, এসবের সরাসরি শিকার হন উপকূলের দরিদ্র মানুষ। বিশেষত নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ পানি সংগ্রহ, রান্না, সংসার পরিচালনা, এই দায়িত্বগুলো মূলত তাদের। যখন পানি দূরে চলে যায়, যখন ফসল নষ্ট হয়, যখন আয় কমে, তখন তাঁদের কষ্ট দ্বিগুণ হয়।

দাদির মতো লক্ষ মা এই লবণজলের সাথে প্রতিদিন যুদ্ধ করে যাচ্ছেন নীরবে। তাঁদের এই যুদ্ধের কথা লেখা হয় না, বলা হয় না।

সুন্দরবনের পাশে থাকার মানে কী জানো? মানে প্রতিদিন একটু ভয় নিয়ে বাঁচা। বাঘ আসে। কুমির আসে। বিষাক্ত সাপ আসে। কিন্তু আসে বলেই তো থামা যায় না, কারণ থামলে সংসার থামে। উপার্জন কমে যাওয়ার পর বনই ছিল একমাত্র ভরসা। দাদি গেছেন বনের কিনারায় কাঠ কুড়াতে। গোলপাতা সংগ্রহ করেছেন। মৌয়ালদের সাথে মধু আনতে গেছেন। প্রতিবারই জানতেন , বিপদ হতে পারে। তবু গেছেন।

‘একদিন গোলপাতা কাটতে গিয়ে ঝোপের মধ্যে শব্দ শুনলাম। বুঝলাম বাঘ কাছে। দৌড়াইনি, দৌড়ালে বিপদ। বুকের ভেতরটা কাঁপছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে হেঁটে সরে এলাম। বাড়ি ফিরে কাউকে বললাম না। বললে আর যেতে দিত না। পরদিনও যেতে হতো।’ এই সাহস কোথা থেকে আসে? আসে ভালোবাসা থেকে। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য মানুষ অসাধ্য সাধন করে। বাঘের ভয়ও তখন ছোট হয়ে যায়। দাদির এই সাহস ছিল না নিজের জন্য, ছিল সংসারের জন্য, সন্তানদের জন্য।

নাতি-নাতনিরা, একটা প্রশ্ন করো নিজেকে, তোমরা কি কখনো দাদিকে জিজ্ঞেস করেছ, ‘দাদি, তোমার কী খেতে ভালো লাগে?’, ‘দাদি, তোমার কী ইচ্ছে করে?’ বেশিরভাগ সময়ে আমরা করিনি। কারণ দাদির নিজস্ব ইচ্ছা আছে, এটা ভাবতেই আমরা অভ্যস্ত নই।

একদিন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি অনেকক্ষণ চুপ থাকলেন। যেন প্রশ্নটাই অপরিচিত লাগছে তার কাছে। তারপর আস্তে বললেন, ‘ছোটবেলায় পড়তে চেয়েছিলাম। আমাদের গ্রামে একটা স্কুল ছিল। কিন্তু মেয়েদের পড়তে দেওয়া হতো না। বিয়ে হয়ে গেল। তারপর সংসার, তারপর ছেলেমেয়ে, তারপর নাতি-নাতনি।’

তারপর একটু থামলেন। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। বললেন, ‘স্বপ্ন কি, ভালোবাসা কি, জানতাম না। তবে এটুকু জানি, আমাকে বাচতে হবে আমাদের সন্তানের জন্য তাদের ভবিষ্যতের জন্য। সেই পড়ার কথাটা মাঝে মাঝে মনে পড়ে।’

দাদিকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদি, জীবনে কখনো কাঁদোনি? তিনি বললেন, ‘কেঁদেছি। কিন্তু একা। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে। কারণ কাঁদতে দেখলে ওরা ভেঙে পড়ত।’ সেইদিন বুঝলাম, দাদি শুধু আমাদের মা না, আমাদের শক্তির উৎস। দাদির পায়ের দিকে তাকাও একবার। সেই পা দিয়ে তিনি হাজার হাজার কিলোমিটার হেঁটেছেন, পানির জন্য, কাজের জন্য, সংসারের জন্য। সেই পায়ে এখন ব্যথা। হাঁটু ভাঁজ করতে কষ্ট হয়। কিন্তু কতদিন এই ব্যথার কথা তিনি বলেননি, কতদিন লুকিয়ে রেখেছেন।

দাদির শরীরের রোগগুলো দেখো, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসব, হাঁটুর ব্যথা, চোখের ছানি। এগুলো বয়সের কারণে এসেছে, হ্যাঁ। কিন্তু শুধু বয়সের কারণে নয়। এসেছে বছরের পর বছর লবণ পানি পান করে, পুষ্টিকর খাবার না পেয়ে, বিশ্রাম না নিয়ে, নিজের চিকিৎসা না করিয়ে। একবার পায়ে ঘা হয়েছিল। ছোট্ট একটা কাটা থেকে। ডায়াবেটিস থাকায় শুকাচ্ছিল না। কিন্তু তিনি কাউকে বলেননি দুই মাস। শাড়ির আঁচলে ঢেকে রেখেছিলেন। বলেননি কারণ, ‘বললে সবার কষ্ট হবে।’ এই মানুষটা সারাজীবন এভাবেই নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছেন। ‘ডাক্তারের কাছে যেতে হলে টাকা লাগে। টাকা খরচ করলে সংসারে টানাটানি হয়। তাই ভাবতাম, একটু পরে ঠিক হয়ে যাবে। ‘একটু পরে’ করতে করতে অনেক কিছু আর ঠিক হয়নি।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছগুলো দেখেছ কি? এই গাছগুলো বৃদ্ধি পায় লবণ পানিতে। সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে যায় না। ঘূর্ণিঝড়েও শিকড় আঁকড়ে থাকে। কারণ এই গাছের শিকড় গভীর, মাটির অনেক নিচে।

তোমাদের দাদিও ঠিক এমন। লবণজল তার জীবনকে তিক্ত করেছে কিন্তু শেষ করতে পারেনি। ঝড় তার ঘর নিয়েছে কিন্তু মনোবল নিতে পারেনি। দারিদ্র্য তাকে নুইয়ে দিয়েছে কিন্তু ভেঙে দিতে পারেনি। কারণ তারও শিকড় গভীর, সেই শিকড়ের নাম ভালোবাসা, দায়িত্ব, মাতৃত্ব। এই মানুষটা যখন হাঁটতে কষ্ট পেয়েও রান্নাঘরে যেতে চান, যখন চোখে ঝাপসা দেখেও তোমাদের জন্য কাঁথা সেলাই করতে বসেন , তখন বুঝতে পারো, এই ক্লান্তিটাও তাঁর কাছে সংসারের সামনে ছোট।

নাতি-নাতনিরা, দাদি একদিন ডেকে বলেছিলেন কিছু কথা। সেই কথাগুলো এখানে লিখে রাখছি, যাতে কোনোদিন ভুলে না যাও। ‘তোরা পড়বি, শিখবি, বড় হবি। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, যে মাটিতে জন্মেছিস সেই মাটিকে ভুলিস না। লবণজলের এই গ্রাম, এই বন, এই নদী, এগুলোই তোর পরিচয়। আর যখনই কোনো কষ্ট আসবে, মনে করবি, তোর দাদি বাঘের ভয়ে পিছিয়ে যায়নি, তুইও পিছিয়ে যাবি না।’

আর একটু যোগ করি, দাদি কিছু চাননি কখনো। পুরস্কার চাননি, প্রশংসা চাননি। শুধু চেয়েছেন, তার মানুষগুলো ভালো থাকুক। কিন্তু আজ মা দিবসে একটুখানি সময় দাও। পাশে বসো। হাত ধরো। জিজ্ঞেস করো, ‘দাদি, তুমি কেমন আছ?’ শুধু এটুকুই হয়তো তার সারাজীবনের সব কষ্টের সামান্য প্রতিদান।

মিরগাং গ্রামের এই মা শুধু একজন মা নন, তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের একজন নীরব শিকার, একজন অদেখা যোদ্ধা, একজন অলিখিত বীর। তার গল্প বলা দরকার। কারণ এই গল্পের মধ্যে আছে আমাদের অস্তিত্বের কথা, আমরা কোথা থেকে এসেছি, কীভাবে টিকে আছি। সুন্দরবনের কোলের মিরগাং গ্রামের সেই সংগ্রামী মাকে উৎসর্গ করা হলো এই লেখা। মা দিবসে তাকে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।

লেখক: গুরুদাস ঢালী

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত

মন্তব্য করুন

ব্লগ