প্রভাষক
০৯ মে, ২০২৬ ০৯:০৪ অপরাহ্ণ
বিশুদ্ধ পানি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর!
বহুদিন আগে পড়া হুমায়ূন আহমেদ এর “হিমু রিমান্ডে” উপন্যাসে ডিসটিল্ড ওয়াটার বা পাতিত পানি সম্পর্কিত একটি মজার কথা মনে পড়ছে যেখানে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে ক্রিমিন্যালদের জীবনকে আনন্দময় রঙিন জীবন ও মহাপুরুষদের কর্মজীবনকে ডিসটিল্ড ওয়াটারের মতো শুদ্ধ তবে স্বাদহীন বলা হয়েছে। আমাদের দেহের প্রায় ৭০% পানি থাকে। MRI এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত শরীরের পানি (H2O) অনুতে বিদ্যমান হাইড্রোজেন পরমাণু অর্থাৎ প্রোটনের স্পিনের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। রসায়নাগারে বিশুদ্ধ পানি বলতে মূলত সেই পানিকে বোঝায় যাতে শুধুমাত্র পানি অর্থাৎ H2O ছাড়া অন্য কোনো দ্রবীভূত খনিজ লবণ,ধাতু,আয়ন ও অপদ্রব্য থাকবে না কারণ, খনিজ উপাদান বা মিনারেলস থাকলে ল্যাবে পরীক্ষার ফল পরিবর্তিত হতে পারে। উদাহরণস্বরুপ-ধরা যাক, ল্যাবে সল্ট অ্যানালাইসিসে একটি নির্দিষ্ট নমুনা লবণ দেয়া হয়েছে; এখন আমরা যদি সাধারণ পানি ব্যবহার করি যে পানিতে আগে থেকেই খনিজ উপাদান বিদ্যমান তবে পরীক্ষায় ভুল আসার সম্ভাবনা বেশি।পাতিত পানি তৈরির জন্য পাতন প্রনালী বহুল ব্যবহৃত। এটি ফুটানো পদ্ধতি হলেও সাধারণ বাসা-বাড়ির ফুটানোর পদ্ধতি থেকে আলাদা। শুধু ফুটানো হলে পানি হয়তো জীবাণুমুক্ত হবে কিন্তু খনিজ উপাদানগুলো থেকে যাবে। পাতিত পানি তৈরিতে বাষ্পীভবন ও ঘনীভবন উভয়ই দরকার। এক্ষেত্রে পাতন ফ্লাস্কে তাপ দিলে পানি স্ফুটনাঙ্কে অর্থাৎ ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উপনীত হলে ফুটতে শুরু করবে ও বাষ্পে পরিণত হবে যা পরে লিবিগ শীতক এর মাধ্যমে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে গ্রাহক পাত্রে জমা হয় এবং পাতন ফ্লাস্কে খনিজ লবণ, ধাতু ও অন্যান্য অপদ্রব্য পড়ে থাকে।ফলে এ পাতিত পানি ল্যাবে ব্যবহারের জন্য উপযোগী হয়।
তবে নিয়মিত পানের জন্য এ বিশুদ্ধ পাতিত পানি গ্রহণ করা যায় না। কারণ হলো,এই পানি অত্যন্ত বিশুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এতে ম্যাগনেসিয়াম,পটাশিয়াম,ক্যালসিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান না থাকায় স্বাদহীন, এছাড়া খনিজের অনুপস্থিতিতে শরীরে খনিজের ঘাটতি তৈরি হবে যা দেহের গঠনের জন্য অপরিহার্য। পানিতে দ্রবীভূত মোট কর্ঠিন পদার্থসমূহকে TDS (Total Dissolved Solid) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক পানীয় জলের আদর্শ TDS মান ৫০০ মিলিগ্রাম/লিটার। পানিতে এ পরিমাণ খনিজের উপস্থিতি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো বলে বিবেচিত হয়। বর্তমানে RO (Reverse Osmosis) Filter এর ব্যবহার বাড়ছে। RO Filter প্রযুক্তি ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে (UCLA-তে) উদ্ভাবিত হয়েছিল যা মূলত সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা ও নাবিকদের কথা মাথায় রেখে যাতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে পানযোগ্য পানি তৈরি করা যায়। এ পদ্ধতিতে পানিতে থাকা আর্সেনিক,সীসার মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতু ছাড়াও অন্যান্য TDS অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খনিজসমূহও দূরীভূত হয়;ফলে পানির স্বাভাবিক পিএইচ (pH) মান কমে যায়। এতে দাঁতের এনামেল ক্ষয়, এসিডিটি, ত্বক ও চুলের সমস্যা ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদি হাঁড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সুতরাং বলা যায়,নিয়মিত পানের জন্য মিনারেল ওয়াটার বা খনিজযুক্ত পানি আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় এবং বিশুদ্ধ পাতিত পানি আমাদের দেহের পানির ঘাটতি পূরণ করতে পারলেও পুষ্টিগুণ বিবেচনার্থে নিয়মিত পানের জন্য উপযোগী নয়।
সোনিয়া আহমেদ
প্রভাষক,রসায়ন
সরকারি হিজলা ডিগ্রি কলেজ
হিজলা,বরিশাল।
৪
৪ মন্তব্য